নিউজ ব্যুরো: অপহরণ ও খুনে অভিযুক্ত প্রশান্ত বর্মনের বিরুদ্ধে পুলিশ এখনও কোনও পদক্ষেপ করেনি। সল্টলেকের দত্তাবাদে স্বর্ণ ব্যবসায়ী স্বপন কামিল্যাকে অপহরণ ও খুনে ওই বিডিও’র নাম জড়িয়েছে। ওই ঘটনার পর ইতিমধ্যে প্রায় ৭ দিন কেটে গিয়েছে। কিন্তু মূল অভিযুক্ত সহ কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। অথচ ময়নাতদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট যে, স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে (Gold Dealer Homicide Case)। এখনও কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় নিহতের পরিবার ওই বিডিও’র প্রভাবশালী-যোগের অভিযোগ তুলেছে।
নিহতের আত্মীয় দেবাশিস কামিল্যা বুধবার বলেন, ‘ওই বিডিও’র কলকাতায় অনেক ক্ষমতা আছে বলে শুনেছি। তাই আমরা কলকাতায় গিয়ে পুলিশের কাছে তদ্বির করতে পারছি না। কলকাতায় গেলে আমরাও খুন হয়ে যেতে পারি। সেই ভয়ে যেতে পারছি না।’ রাজ্যের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা দেখতে পেয়েছেন স্থানীয়রাও। অভিযুক্তের বাড়িতে ওই মন্ত্রীর মাঝেমধ্যে যাতায়াত ছিল বলে এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
জলপাইগুড়ি জেলার রাজগঞ্জের বিডিও’র নাম প্রশান্ত বর্মন। কিন্তু তিনিই মূল অভিযুক্ত কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে রাজগঞ্জের বিডিও বুধবার সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছেন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী চলছে বলে বুধবার প্রায় সব বিডিও নিজেদের দপ্তরে উপস্থিত ছিলেন। ব্যতিক্রম প্রশান্ত। তবে তাঁকে পাওয়া যায় শিলিগুড়ির কাছে শিবমন্দিরের ইউনিভার্সিটি অ্যাভিনিউপাড়ায় অনেকটা জমি নিয়ে রঙিন টিনের এক একচালা বাড়িতে। চারদিকে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ঘরগুলিতে এসি লাগানো বাড়ির গেটের ভিতরে গাড়ি রাখার শেড। বড় উঠোন। লোহার গেট ভিতর থেকে বন্ধ। পুলিশ লেখা একটি লাল রঙের বাইক দেখা যায় সেখানে।
বাড়ির উঠোনে খালি গায়ে হাফ প্যান্ট পরে চেয়ারে বসে ছিলেন বিডিও। গেটের বাইরে থেকে কথা বলার জন্য অনুরোধ করতে তিনি রেগেমেগে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এখানে ফাজলামো করতে এসেছ। ফাজলামো চলছে। ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা কোর্টে দেখে নেব।’ পরে বিকেল ৪টা নাগাদ এক সঙ্গীকে নিয়ে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাওয়ার সময় তাঁকে বলা হয়, ‘আপনার বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ উঠেছে।’ ওই কথার কোনও জবাব দেননি প্রশান্ত।
তবে রাজগঞ্জের বিধায়ক খগেশ্বর রায় বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিডিও এবং জেলা শাসকদের বিষয় দেখে নবান্ন। আশা করছি, তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে প্রশাসন।’ রাজগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি রূপালি দে সরকার বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। বিষয়টি প্রশাসনিক লেভেলে দেখছে। তবে এতে নিশ্চয়ই পঞ্চায়েত সমিতির কাজে কিছু ব্যাঘাত হবে। আমরা চাইছি, সুষ্ঠু তদন্ত করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক প্রশাসন।’
সল্টলেকে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্ত বিডিও’র নীলবাতি লাগানো গাড়িতে চলাফেরা করার সময় সঙ্গে সবসময় ৪-৫ জন তরুণ থাকেন। বিধাননগর পুলিশের মুখে অবশ্য কোনও রা নেই। বিধাননগরের ডেপুটি কমিশনার (সদর) অনীশ সরকার ‘ব্যস্ত আছি’ বলে প্রতিক্রিয়া এড়িয়েছেন। স্বপনকে অপহরণ ও খুনের অভিযোগ দায়ের করেছিলেন তাঁর আত্মীয় দেবাশিস। তিনি বলেন, ‘পুলিশের ভূমিকায় আমরা হতাশ।’
স্থানীয় সূত্রে খবর, অভিযুক্ত প্রশান্ত এর আগেও নিউটাউনে তাঁর ফ্ল্যাটের কাছে একাধিক ঝামেলায় জড়িয়েছেন। কিন্তু নীলবাতি গাড়ি নিয়ে ঘোরাফেরা করেন বলে স্থানীয় লোকজন ভয়ে কিছু বলার সাহস পেতেন না। মঙ্গলবার রাজগঞ্জের বিডিওকে বহালতবিয়তে শিলিগুড়ির কাছে শিবমন্দির এলাকায় নীলবাতি লাগানো গাড়িতে ঘুরতে দেখেছেন স্থানীয়রা। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন কলেজের পিছনে ইউনিভার্সিটি অ্যাভিনিউপাড়ার ৩ নম্বর লেনে বুধবার তাঁকে দেখা যায়।
শিবমন্দির এলাকায় আরও একটি বাড়িতে তাঁকে প্রায়ই দেখা যায়। রাজগঞ্জ বিডিও অফিসে বুধবারের পরিবেশ ছিল থমথমে। আধিকারিক এবং কর্মীরা এব্যাপারে মুখ খুলতে চাননি। তাঁদের অনেককে অবশ্য ফিশফাশ করতে দেখা গিয়েছে। একজন আধিকারিক শুধু জানান, ‘এসআইআর ফর্ম নিয়ে বিএলও’রা বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। বিডিও সাহেব ফিল্ড ভিজিটে আছেন।’
রাজগঞ্জের বিডিও থাকাকালীন প্রশান্ত বর্মনের দু’বার বদলির আদেশ হলেও দু’বারই কোনও অজ্ঞাত কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগও কম নয়। বালিবোঝাই এক ডাম্পারের ড্রাইভারকে মারধর, গজলডোবায় হোটেল ভাঙার সময় এক ব্যবসায়ীকে ধমক, বেলাকোবা শিকারপুর এলাকায় রাস্তা অবরোধ করায় মহিলাদের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ভাতা বন্ধের হুমকিতে তাঁর নাম জড়িয়েছিল।
(তথ্য সংগ্রহঃ দীপ্তিমান মুখোপাধ্যায়, খোকন সাহা ও রামপ্রসাদ মোদক)
