নারী দিবস মানেই কেবল ক্যালেন্ডারের একটি বিশেষ দিন নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের এক নিরন্তর লড়াই। সেই লড়াইয়েই এবার এক অসামান্য রূপকথা তৈরি করলেন ফালাকাটার একশোজন নারী। হেঁশেলের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা আজ শুধু স্বনির্ভর নন বরং কৃষিকাজে বিপ্লব এনে সমাজের প্রকৃত ‘অন্নদাত্রী’ হয়ে উঠেছেন।
সুভাষ বর্মন, ফালাকাটা: মাটির সোঁদা গন্ধ আর ফসলের বিস্তীর্ণ মাঠ বরাবরই কৃষকের ঘামের গল্প বলে। তবে সেই ঘাম যে কেবল পুরুষের নয়, ফালাকাটায় কান পাতলে এখন সেই সত্যিটাই শোনা যায়। রাষ্ট্রসংঘ ২০২৬ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে (Girl Farmers)। আর সেই ঘোষণাকে যেন আক্ষরিক অর্থেই সত্যি করে তুলেছেন এই ব্লকের একশোজন নারী।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রাক্কালে, শনিবার কৃষি দপ্তরের উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁদের এই সাফল্যের আখ্যানই উঠে এল সকলের সামনে। একসময় যাঁদের জীবন বাঁধা ছিল সংসারের চার দেওয়ালে, আজ তাঁরাই কেউ মাশরুম চাষ করছেন, কেউবা মৌমাছি পালনে ব্যস্ত। জটেশ্বরের সুনীতা তিরকি, মনীষা বরা বা বিনীতা মুন্ডারা এখন মাশরুম চাষে রীতিমতো সাবলীল। সাফল্যের হাসি হেসে সুনীতা বলছেন, ‘কৃষি দপ্তরের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ আমরা বাড়িতেই মাশরুম চাষ করছি, এতে ভালো লাভও হচ্ছে।’
হিসাব বলছে, মাত্র ৭০ টাকা খরচে এক সিলিন্ডার মাশরুম ৩৫ দিন পর ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, অর্থাৎ লাভ প্রায় তিনগুণ।
অন্যদিকে, হেদায়েতনগর গ্রামের মহিলারা মেতেছেন মৌমাছি পালনে। কৃষি দপ্তরের দেওয়া বাক্স থেকে মাসে প্রায় দশ কেজি করে মধু মিলছে। লতিকা রায় ডাকুয়ার কথায়, ‘এখন প্রতি কেজি মধু আমরা চারশো টাকা দরে বিক্রি করে লাভের মুখ দেখছি।’
শুধু মাশরুম বা মধু নয়, আনোয়ারা বেগম কিংবা মৌসুমি দাসরা দপ্তরের পঞ্চাশ শতাংশ ভরতুকিতে ধান কাটার মেশিন পেয়ে তা ভাড়া খাটাচ্ছেন। ময়রাডাঙ্গার নির্মলা মণ্ডল বা গৌরী সরকারের মতো মহিলারা পেয়েছেন জলসেচের পাইপ। কেউ বিনামূল্যে বীজ পেয়ে শুরু করেছেন মশুর ডালের চাষ।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল, ধনীরামপুর ও তালুকেরটারির মতো গ্রামে মহিলারা একত্রিত হয়ে গড়ে তুলেছেন ‘ফার্মার্স প্রোডিউসার কোম্পানি’ (এফপিসি), যা এতদিন কেবল পুরুষদেরই একচেটিয়া অধিকার ছিল।
ফালাকাটা ব্লকের সহ কৃষি অধিকর্তা সুপ্রিয় বিশ্বাসের গলায় এদিন ঝরে পড়ল তৃপ্তি। তিনি বলছেন, ‘কে কোন ক্ষেত্রে উপকৃত হয়েছেন, তা সকলের সামনে তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য, যাতে আরও বেশি নারী এই কাজে উৎসাহিত হন।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সুভাষচন্দ্র রায়। উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা মৌলিতা চট্টোপাধ্যায় ও নৃপা বিশ্বাস নারীদের চাষাবাদ নিয়ে নানা মূল্যবান পরামর্শ দেন। আর ধানবীজ বাছাইয়ের সহজ পাঠ দেন কৃষি প্রযুক্তি সহায়ক তানিয়া বক্সী। সবশেষে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে এই অদম্য নারীশক্তিকে কুর্নিশ জানানো হয়। এই নারীরা প্রমাণ করে দিলেন, সুযোগ পেলে তাঁরাও মাটির বুকে অনায়াসে সোনা ফলাতে পারেন।
