গরুমারা জঙ্গলের গা ঘেঁষে রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতের চটুয়া বনবস্তিতে মাসখানেক হল এক দাঁতাল ঠাঁই নিয়েছে। আনমনে গ্রামপথ ধরে ধীরে সে হেঁটে বেড়ায়। খিদে পেলে বাঁশ বাগানের কচি বাঁশ খেয়ে নেয়। কোনও ভাঙচুর বা ক্ষয়ক্ষতির নজির নেই। বাসিন্দারা তাকে এলাকার পাহারাদার ধরে নিয়েছেন। মানুষ–বন্যপ্রাণ সহাবস্থানের এক অন্য গল্প লিখলেন শুভদীপ শর্মা
ময়নাগুড়ি: বৈপরীত্য হয়তো একেই বলে। উত্তরবঙ্গের নানা প্রান্তে প্রায় রোজই মানুষ–বন্যপ্রাণ সংঘাত সংবাদ শিরোনামে। গরুমারা জঙ্গলের (Elephant of Gorumara) গা ঘেঁষে রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতের (Ramshai Vary) চটুয়া বনবস্তিতে অবশ্য ঠিক উলটো ছবি। এলাকায় কোনও লাঠিধারী পাহারাদার নেই। জঙ্গলের এক দাঁতালই সেই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। আনমনে গ্রামপথ ধরে ধীরে সে হেঁটে বেড়ায়। খিদে পেলে বাঁশ বাগানের কচি বাঁশ খেয়ে নেয়। কেউ কিচ্ছুটি বলে না। বলবেই না কেন? হাতিটি এলাকায় ভাঙচুর বা কোনও ক্ষয়ক্ষতি করেছে বলে কোনও নজির নেই। আর তাই এলাকাবাসী তাকে বহিরাগত নয়, একান্ত আপন করে নিয়েছেন।
এমন নয় যে, বন দপ্তরের তরফে হাতিটিকে জঙ্গলে ফেরানোর কোনও ব্যবস্থা হয়নি। কখনও শব্দবাজি, কখনও বনকর্মীদের উপস্থিতিতে হাতিটিকে জঙ্গলের দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজে দেয়নি। সেই হাতি ফের লোকালয়ের দিকেই চলে এসেছে। বন দপ্তরের রামশাইয়ের রেঞ্জ অফিসার বাবলু দাস বললেন, ‘বহুবার চেষ্টা করা হলেও হাতিটি যেন কোনওভাবেই লোকালয়ের দিক ছেড়ে যেতে রাজি নয়। তবে সেটি এখনও পর্যন্ত কারও কোনও ক্ষয়ক্ষতি করেনি। এটি সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়।’ পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
মস্ত দাঁত নিয়ে বিশালাকার হাতিটি মাসখানেক হল এই এলাকায় আস্তানা গেড়েছে। হাতিটির আচরণ ও গতিবিধি বুঝতে বন দপ্তরের রামশাই রেঞ্জের বনকর্মীরা কয়েকদিন ধরে গ্রাম ও জঙ্গলের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থান করেন। হাতিটি তাতে পাত্তাই দেয়নি। বনকর্মীদের কড়া নজরদারির মধ্যেই সেটি গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দুলকি চালে হেঁটে বেড়াতে শুরু করে। কখনও বাঁশ বাগানে ঢুকে বাঁশ খেয়ে সে জঙ্গলের দিকে চলে যায়, আবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই এলাকায় ফিরে আসে।
এলাকাবাসী অমল ওরাওঁ বললেন, ‘খড়ি সংগ্রহ বা গবাদিপশু চরাতে গিয়ে অতীতে আমরা বহু হাতির মুখোমুখি হয়েছি। দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আমরা জীবনে এমন শান্ত দাঁতাল দেখিনি।’
দিনকয়েক আগে গ্রামের দুই স্কুল পড়ুয়া খেলার সময় তাদের বল দাঁতালটির সামনে চলে গিয়েছিল। গজরাজ কিচ্ছুটি বলেনি। হাবভাবে যেন মনে হচ্ছিল, বল খেলা দেখে সে খুব খুশি। ওই দুই পড়ুয়া যখন তার সামনে গিয়ে বলটি তুলে নেয়, হাতিটি শুঁড় তুলে যেন তাদের অভিবাদন জানিয়ে বসে। এলাকায় ছোট দোকান চালানো শুভঙ্কর ওরাওঁয়ের উপলব্ধি, ‘হাতিটি যেভাবে দিনভর গ্রামে ঘুরে বেড়ায় তাতে মনে হয়, ও আমাদের গোটা গ্রামটাকে পাহারা দিচ্ছে। আমরা নিশ্চিত।’
কে বলে মানুষ–বন্যপ্রাণ মুখোমুখি হলে শুধু বিপদই আসে? চটুয়া বনবস্তির নতুন অতিথি ঠিক উলটোটা প্রমাণ করে ছেড়েছে। চটুয়ায় এখন অফুরান ভালোবাসা।
