রাহুল মজুমদার, বাগডোগরা: দ্রৌপদী মুর্মুর শিলিগুড়ি সফর (Droupadi Murmu Siliguri Go to) ঘিরে বিতর্ক দানা বেঁধেছে পরতে পরতে। দেশের রাষ্ট্রপতি যে সম্মেলনে যোগ দেবেন, তার আয়োজনে চরম অব্যবস্থার ছবি ধরা পড়ল শনিবার।
সভাস্থলের কাছেই পড়ে ছিল কুকুরের মৃতদেহ। বিকট দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। গোঁসাইপুরের এয়ারপোর্ট অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার মাঠটি ঠিকমতো পরিষ্কারই করা হয়নি। নবম আন্তর্জাতিক সাঁওতাল কনফারেন্সের জন্যে যে মঞ্চ বাঁধা হয়েছে, বিজেপি কিংবা তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা সম্মেলনেও তার থেকে ভালো মানের তৈরি করা হয়।
সভাস্থলের আশপাশ পুলিশে ছয়লাপ ছিল, প্রতিটি গেটের সামনে মেটাল ডিটেক্টর হাতে দঁাড়িয়ে ছিলেন উর্দিধারীরা। অথচ, সবকিছুই যেন লোকদেখানো মাত্র। যে কেউ তঁাদের সামনে দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ছিলেন। পাসও যাচাই করা হচ্ছিল না সেভাবে।
সভাস্থলের চারপাশ কাপড় দিয়ে ঢাকা হয়েছিল। সেই কাপড়ের বেশ কিছু অংশ ছেঁড়া, কোনওদিকে আবার নীচের অংশ উঁচু করে অনায়াসে প্রবেশ করা যাচ্ছিল। যে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন, সেটাও যথেষ্ট পুরোনো। কোনওরকমে রং করে এনে দাঁড় করানো হয়েছে। সবমিলিয়ে দেশের সাংবিধানিক প্রধানের কর্মসূচিতে ব্যবস্থাপনার এমন হাল দেখে রাজ্যের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
দীর্ঘদিন ধরেই কাজ চলছিল মাঠে। কেন জেলা প্রশাসন পুরো বিষয়টির ওপর নজর রাখল না- সেই প্রশ্নও উঠছে। এদিন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলছেন বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্ট। আগেই কেন তঁার হুঁশ ফিরল না? স্থানীয় বিধায়ক থেকে সাংসদ, সবাই তো কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলেরই। এখন অবশ্য তৃণমূল আর বিজেপি, দুই পক্ষই নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। একে অপরের দিকে কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন নেতারা।
রাজ্যের হয়ে শিলিগুড়িতে মাঠে নেমেছেন শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব। সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, ‘এই অব্যবস্থার জন্য দায়ী উদ্যোক্তা এবং রাষ্ট্রপতি ভবন। রাজ্য সরকার নাকি আগেই জানিয়েছিল, রাষ্ট্রপতির জন্য ঠিকঠাক আয়োজন উদ্যোক্তারা করতে পারবে না।’
গৌতমের দাবি ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। উদ্যোক্তাদের যুক্তি, রাজ্যের মন্ত্রী মলয় ঘটকের সঙ্গে তাঁদের শেষমুহূর্ত পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। রাজ্য তাঁদের সবরকম সহযোগিতা করবে বলে আশ্বস্তও করেছিল। অভিযোগ, একেবারে শেষদিকে রাজ্য বেঁকে বসে। সম্মেলন আয়োজনকারী সংস্থার কার্যনির্বাহী সভাপতি নরেশকুমার মুর্মু বলছিলেন, ‘জেলা প্রশাসন চারবার জায়গা বদল করিয়েছে।’
উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রথমে বিধাননগর সন্তোষিণী বিদ্যাচক্র হাইস্কুলের মাঠটিকে সভাস্থল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। গতবছর ওই মাঠে অনুষ্ঠান করার কথা ছিল এবং রাষ্ট্রপতি আসবেন বলে সম্মতি দিয়েছিলেন। রাজ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত ছাড়পত্র দেয়। কিন্তু শেষমুহূর্তে রাষ্ট্রপতি আসতে পারেননি। গত বছর ওখানে অনুমতি দিলে এবার কেন দিল না?
এরপর সেখান থেকে ৮০০ মিটার দূরে একটি মাঠের কথা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। তাতেও রাজি হন উদ্যোক্তারা। দু’দিন বাদে নাকি ফের জেলা প্রশাসন ওই মাঠ বাতিল করে দেয়। এরপর কাওয়াখালি এবং গোঁসাইপুরের মাঠের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলা হয় উদ্যোক্তাদের। আয়োজকরা গোঁসাইপুরের মাঠটি বেছে নেন।
তখন নাকি মন্ত্রী মলয় তাঁদের কথা দেন, রাজ্য সবরকম সহযোগিতা করবে এবং মুখ্যমন্ত্রীও আসবেন। মুখ্যমন্ত্রীকে তাঁরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বলে দাবি নরেশের। অভিযোগ, ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখ উদ্যোক্তাদের জানানো হয়, জেলা প্রশাসন সহযোগিতা করতে পারবে না। এরপর দোল আর হোলি বাদ দিয়ে মোট সাতদিন সময় পেয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। এই সামান্য সময়ে সাধ্যমতো আয়োজন করতে পেরেছেন, যুক্তি দিলেন নরেশ। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতিকেও সবটা জানানো হয়।
তাঁর বক্তব্য, ‘প্রথম থেকে মন্ত্রী মলয় ঘটক আমাদের বলেছেন, রাজ্য সহযোগিতা করবে। আমরা তাঁদের ওপর ভরসা রাখি। শেষমুহূর্তে এসে জেলা প্রশাসন হাত তুলে নিল। আমাদের বিরুদ্ধে ৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি ভবনে নেতিবাচক রিপোর্ট পাঠানো হয়। এরপরেও রাষ্ট্রপতি এসেছেন। উনি আমাদের কথা ভাবেন, তাই এলেন। বাস্তব পরিস্থিতি বুঝেই বিধাননগর গিয়ে অব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন।’
গৌতমের সাফ কথা, ‘রাষ্ট্রপতি নিজের পদের গরিমা ভুলে গিয়ে এধরনের অভিযোগ করছেন নির্বাচনের আগে। রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে আগে থেকে লেখা চিত্রনাট্যের ওপর নাটক রাস্তায় মঞ্চস্থ করেছে বিজেপি। জেলা প্রশাসন ৪ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি ভবনকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল, উদ্যোক্তারা অনুষ্ঠান করতে পারবেন না। তারপরেও রাষ্ট্রপতি এসেছেন যখন, সেটা রাষ্ট্রপতি ভবনের দায়।’
এদিকে, গোঁসাইপুরের ঘটনার পর বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসনের দাবি তুলেছেন রাজু। রাষ্ট্রপতি চলে যেতেই তিনি সাংবাদিক সম্মেলন ডাকেন। সেখানেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। বলেন, ‘কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার থাকলে এতদিনে এই রাজ্যের সরকারকে দশবার উৎখাত করে দিত। আমাদের সরকার অনেক সংবেদনশীল। তবে এখন এই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জরুরি। তারপরেই নির্বাচন করতে হবে।’
