দিনহাটা: দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালে রাত নামে একটু অন্যভাবে। ওয়ার্ডে নিভু নিভু আলো, কোথাও কাশির শব্দ, কোথাও যন্ত্রের পি-পি আওয়াজ, আর এক কোণে আয়ামাসিদের হাসাহাসি। রোগীরা ব্যথায় কাতরাচ্ছেন, কেউ জল চাইছেন, কেউ চাইছেন ওষুধ- কিন্তু মাসিদের সেসব চিন্তা নেই। কারণ, রাতের ডিউটি মানেই ‘লুডু নাইট’। শুধুমাত্র রাতেই কেন, দিনেও একই চিত্র দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যেক আয়ামাসি একজনের বদলে তিন-চারজন করে রোগীর দায়িত্ব নেন। ফলে কোনও রোগীরই দেখাশোনার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন না। এখানেই শেষ নয়, রোগীর আত্মীয়রা এই ব্যাপারে অভিযোগ করতে গেলেই প্রচণ্ড দুর্ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ। হাসপাতাল সুপার রণজিৎ মণ্ডল বলেন, ‘সেভাবে আমার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। অভিযোগ এলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
রোগীর পরিজনদের কাছ থেকে জানা গেল, ওয়ার্ডের মধ্যেই আয়ামাসিদের জন্য আলাদা করে রাখা রয়েছে শোওয়ার জন্য বেড। রোগীর পাশে থাকার কথা থাকলেও রাতে সেই বেডেই অনেকে আরাম করে ঘুমিয়ে পড়েন। ওষুধের প্রয়োজনে বা ডাক পড়লে উত্তর আসে– ‘এই এখনই আসছি’। কিন্তু রাত পেরিয়ে গেলেও তাঁদের আর দেখা পাওয়া যায় না।
এক রোগীর আত্মীয় সুভাষ দত্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাতের দিকে আয়ামাসিদের পাওয়াই মুশকিল। ডাকলেই বলে একটু পরে আসছি। অথচ সেই পরেটা কবে আসে, কে জানে।’
আরেক রোগীর পরিজন শুক্লা রায়ের কথায়, ‘আমার বাবার অক্সিজেন বদলাতে ডেকেছিলাম কিন্তু তিনবার ডাকার পর মাসি এসে বলেন- একটু লুডু খেলা শেষ করি তারপর।’
দিনহাটা হাসপাতাল কোচবিহার জেলায় মহকুমা হাসপাতালগুলির মধ্যে সবথেকে বড়। ৩০০টি শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতালে প্রতিনিয়ত রোগীর আনাগোনা লেগেই থাকে। বলা যেতে পারে, প্রত্যেকটি বেডে মাঝেমধ্যেই দুজন করে রোগীর দেখা মেলে। এর মধ্যে আয়ামাসির সংখ্যা রয়েছে অন্তত ৮০। রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে আয়ামাসিরা তিন-চারজন করে রোগীর দায়িত্ব নেন বলে অভিযোগ। আর তারপর থেকেই শুরু হয় ঝামেলা।
একতলার এক রোগীর আত্মীয় বিপুল রায় বলেন, ‘আয়ামাসিদের জন্য আলাদা বেড আছে, যেখানে রাত হলেই তাঁরা শুয়ে পড়েন। রোগীর কষ্ট হলেও তাঁরা আসেন না।’
যদিও আয়ামাসিরা অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আয়ামাসি ববিতা পারভিন বলেন, ‘আমরা সারাদিন কাজ করি। রাতেও সময়মতো পরিষেবা দিয়ে একটু চোখ লাগলেই আমাদের কথা শুনতে হচ্ছে।’ আরেক আয়ামাসি ঝর্ণা সূত্রধর বলেন, ‘আমরা তো সবসময় কাজ করি- ওষুধ, পরিষ্কার করা, খাবার খাওয়ানো সবই করি। তার পরেও রোগীর আত্মীয়দের কথা শুনতে হয়।’ তবে লুডু খেলার কথা অস্বীকার করেছেন সকলেই!
আয়ামাসিদের নিজস্ব কোনও সংগঠন নেই। তাঁরা কোচবিহার প্রমীলাবাহিনীর সঙ্গে রয়েছেন। কোচবিহার প্রমীলাবাহিনীর জেলা সম্পাদক পূজা ঘোষ অবশ্য বলেন, ‘দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের মাসিরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। অভিযোগের অনেকটাই অতিরঞ্জিত।’
