সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি: কাগজে-কলমে ‘সন্তান’। অথচ বাবা-মা, ভাই–বোন বা পরবর্তী প্রজন্মের কেউই ‘তাঁকে’ চেনেন না। এসআইআর আবহে এই কাগুজে পরিজনদের হাতে উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তি হারানোর ‘আশঙ্কা’ বাড়ছে। বংশের বিষয়সম্পত্তি রক্ষায় মরিয়া হয়ে ভুয়ো পরিজনদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আকুতি নিয়ে অনেকেই নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হচ্ছেন। অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে কমিশনের আধিকারিকরাও কোমর বেঁধেছেন।
বর্তমান ভোটার তালিকায় ধূপগুড়ি (Dhupguri) ব্লকের মাগুরমারি ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার ১৫/১৪৫ নম্বর পার্টের ৪৪৬ সিরিয়াল নম্বরে জনৈক সেরাজুল হকের নাম রয়েছে। সেখানে তাঁর বাবা হিসেবে আফুরুল হকের নাম রয়েছে। এসআইআর-এর আগ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই চলছিল। এরপর ভোটার তালিকার মূল্যায়ন শুরু হতেই ‘বিশেষ খবর’ চাউর হওয়া শুরু করে। একদিন যাঁরা কাউকে ধরে-পাকড়ে বাবা, মা বানিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছিলেন তাঁরা নিশ্চয়ই সেই নাম ব্যবহার করে পরবর্তীতে আধার ও প্যান কার্ডও বানিয়ে ফেলেছেন বলে ‘খবর’ ছড়াতে শুরু করে। এরপর কোনওদিন যদি তাঁরা এপিক, আধার, প্যানে লেখা বাবা-মায়ের উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পত্তির ভাগ দাবি করে বসেন তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে বলেও আশঙ্কা ছড়ায়।
এসআইআর আবহে সেই ভাবনা এবং আশঙ্কা চরমে পৌঁছানোয় অশীতিপর আফুরুল হক নিজেই ‘এপিকতুতো’ ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগে সরব হয়ে নির্বাচন কমিশনে লিখিত অভিযোগ জানান। সত্তরোর্ধ্ব আফুরুলের বক্তব্য, ‘আমার চার মেয়ে আছে। এক ছেলে থাকলেও সে বহুদিন আগেই মারা যায়। আমি দীর্ঘদিন ধরে স্নায়ুরোগে আক্রান্ত। সেই রোগের সুযোগ নিয়ে সাত-আট বছর আগে এই ছেলেটা আমার নাম বাবা হিসেবে ব্যবহার করে ভোটার তালিকায় নাম তুলে ফেলে। বাবা হিসেবে আমার নাম বাদ দিতে আমি অনেকবার সেরাজুলকে অনুরোধ করেছি। ও উলটে আমাকে হুমকি দিয়েছে। এ কোনওদিনই আমার সন্তান নয়। তাই নাম কাটার আবেদন জানিয়েছি।’
বয়স্ক মানুষটা যেমন নিজেই ভোটার তালিকার সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগে সরব তেমনি মাগুরমারি ১ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত অঞ্চলের ১৫/১২৪ নম্বর পার্টে তিনজনের বিরুদ্ধে পূর্বপুরুষের নাম ভাঙিয়ে ভোটার হওয়ার গুরুতর অভিযোগে অনেকে সরব হয়েছেন। বর্তমানে ধূপগুড়ি বিধানসভার ১২৪ নম্বর বুথটি ২০০২ সালে ৭২ নম্বর বুথ ছিল। সেখানে ২১৮ নম্বর সিরিয়ালে সেবার স্বপন সাহা নামে এক ব্যক্তির নাম উঠেছিল। সাবেক তালিকায় তাঁর মায়ের নাম ঊষারানি সাহা লেখা ছিল। বর্তমান ১৫/১২৪ নম্বর পার্টে ৪৯৩ নম্বর সিরিয়ালে স্বপনের নাম রয়েছে। হালে তাঁর নামের পাশে বাবার নাম হিসেবে ঊষারানি সাহার প্রয়াত স্বামী কালীপদ সাহার নাম রয়েছে। এই পার্টে ৫০১ নম্বর সিরিয়ালে চণ্ডী সাহা এবং ৫২১ নম্বর সিরিয়ালে সঞ্জিত সাহা নামে আরও দুই ব্যক্তির বাবার নাম হিসেবেও কালীপদ সাহার নাম রয়েছে। গুরুতর অভিযোগ নিয়ে সাহা পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্য তাপস সাহার বক্তব্য, ‘কালীপদ সাহা ছিলেন আমার ঠাকুরদার নিজের ভাই এবং ঊষারানি সাহা তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ আমার ছোট ঠাকুমা। তাঁদের পাঁচ সন্তানের তিন ছেলে এবং দুই মেয়ে রয়েছেন। এই স্বপন সাহা, চণ্ডী সাহা এবং সঞ্জিত সাহা আমাদের পরিবারের কেউই নন। এঁরা কীভাবে কার সাহায্যে আমাদের পূর্বপুরুষের নাম ভাঙিয়ে এসব করেছেন জানা নেই। এঁদের নিয়ে উপযুক্ত তদন্ত এবং নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।’
সূত্রে খবর, যাঁদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ এলাকায় চাউর হয়েছে বা উঠতে শুরু করেছে তাঁদের বেশিরভাগই বিএলও-কে শারীরিকভাবে এড়িয়ে শেষমুহূর্তে অনলাইনেই এসআইআর ফর্ম জমা করেছেন। এদিকে, তথ্যতালাশ করে অনেকেই কমিশনের আধিকারিকদের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা করতে শুরু করেছেন। অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাঁরা কোনওভাবেই মুখ খুলতে চাননি।
