শুভঙ্কর চক্রবর্তী, দার্জিলিং: সারাদিন অবিরাম বর্ষণের পর সন্ধ্যায় বৃষ্টি কমেছে। গোটা শহরজুড়ে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। দার্জিলিং (Darjeeling) যেন ভিজে কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে আছে। ম্যাল ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ভিজে বেঞ্চগুলো রুমালে মুছে বসে পড়ছেন পর্যটকেরা। মহাকাল মন্দিরের পেছনের রাস্তাটা বরাবরই একটু নির্জন। সেখানে পথবাতির আবছা হলুদ আলো কুয়াশার ভেতর ঢুকে আরও মলিন। গাছের ডালগুলো দু’দিক থেকে বৃষ্টির ভারে নুইয়ে ছাতার মতো হয়ে গিয়েছে। পাতা থেকে টুপটাপ জল পড়ছে- একফোঁটা, দুইফোঁটা, তারপর আবার নীরবতা। সবমিলিয়ে এক গা ছমছমে অনুভূতি, যেন কেউ খুব কাছে দাঁড়িয়ে শ্বাস নিচ্ছে।
ঘড়ির কাঁটা তখন সওয়া সাতটা পেরিয়েছে৷ মহাকাল মন্দিরের পেছনের রাস্তার ধারে ওপেন জিমের পাশে বেঞ্চে বসে চার অবাঙালি পর্যটক। দুজন ছেলে, দুজন মেয়ে। প্রত্যেকের চোখ স্থির হয়ে আছে পঞ্চম ব্যক্তির দিকে। মাঝবয়সি এক স্থানীয় মানুষ। নীচু কণ্ঠস্বরে ভাঙা ইংরেজিতে কিছু বলছিলেন। কিছুটা দূর থেকে কানে এল, ‘উই হ্যাভ সিন দেম মেনি টাইম। দে আর স্টিল হিয়ার।’ নির্জন রাস্তায় আবছা আলোয় পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেই মুহূর্তের মধ্যে কথার স্রোত থেমে গেল। চারজোড়া চোখ একসঙ্গে আমার দিকে ঘুরল। সেই দৃষ্টিতে এক নিঃশব্দ সতর্কতা, যেন আমি মানুষ নই, তাদের গল্পের হাতেগরম প্রমাণ। হকচকিয়ে কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই বুঝলাম ভূতুড়ে গল্প চলছিল।
দার্জিলিং (Darjeeling Tourism) এমনই। এখানে সন্ধের পর গল্প আর বাস্তবের মাঝের রেখাটা ঝাপসা হয়ে যায়। বাতাসে ইতিহাসের গন্ধ মেশে, কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অশরীরীর ছায়া। কে জানে, ওই চার পর্যটক রাতে হোটেলে ফিরে ঘুমোতে পারবেন কি না। হয়তো তাঁরা বলবেন, সবই বানানো গল্প। আবার হয়তো গভীর রাতে জানলার কাচে টুপটাপ শব্দ শুনে চমকে উঠবেন। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও বহু পর্যটক ওভাবেই চমকে উঠতে চান, সেই ‘অশরীরীদের’ অনুভব করতে চান। আর সেই টানেই ইদানীং দার্জিলিংয়ে ভিড় বাড়াচ্ছেন তাঁরা। রাতের দার্জিলিংয়ে শুরু হয়েছে ‘ঘোস্ট রাইড’। তার জন্য মিলছে গাইডও, যাদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ঘোস্ট গাইড’ (Ghost Trip Journey)।
‘ঘোস্ট রাইড’-এর প্রধান শর্ত গোপনীয়তা। তা বজায় রাখার কথা দিলে তবেই মিলবে ভূতুড়ে ভ্রমণের সুযোগ। এক্ষেত্রে গাইড, পর্যটক বা পর্যটকদলকে শহরের ‘ভূতুড়ে’ জায়গাগুলি ঘুরে ঘুরে দেখান, অশরীরীদের নিয়ে প্রচলিত নানা রোমাঞ্চকর গল্প বলেন। সবসময় রাইড রাতে হয় তা নয়, কতগুলো জায়গায় দিনেরবেলা নিয়ে যাওয়া হয়, কতগুলোতে সন্ধ্যার পর। ২০০০ থেকে ৪০০০ টাকা পর্যন্ত ঘোস্ট রাইডের প্যাকেজ আছে। যার কাছে যেমন নেওয়া যায় আর কী! কিন্তু কেন গোপনীয়তা? নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক গাইড জানান, শহরের বহু হোটেল, হোমস্টে মালিক এটা ভেবে ভয় পান যে, ভূতের গল্প বেশি ছড়িয়ে পড়লে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক কমে যাবে। তাই ভূতুড়ে কারবারে হইচই নেই।
ফলে সমস্যা একটা অবশ্য আছে। চাইলেই ঘোস্ট রাইডের সুযোগ মিলবে না। তারজন্য ঘোস্ট গাইডের দেখা পাওয়াটা জরুরি। এই গাইডরা কোনও বিজ্ঞাপন দেন না, ম্যাল বা আশপাশের কোথাও তাদের কোনও ব্যানারও টাঙানো নেই। এই গাইডরাও অনেকটা ভূতের মতো। দিনের আলোয় তাঁরা খুব সাধারণ মানুষ- কেউ হোটেলের রিসেপশন সামলান, কেউ ট্যাক্সি চালান, কেউ আবার গরম পোশাক বিক্রি করেন। রাত নামলেই তাঁরা হয়ে ওঠে অদৃশ্যের গল্পকার। তাঁদের কাছে আছে ব্রিটিশ আমলের বাংলোর কাহিনী, আছে পরিত্যক্ত বোর্ডিং স্কুলের নিঃশব্দ করিডরের ফিশফাশ, আছে পাহাড়ি পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা ছায়ার উপাখ্যান।
বিভিন্ন হোটেলে, ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে, ম্যালের আশপাশে ঘোস্ট গাইডদের সোর্স থাকে। পর্যটকদের কথাবার্তা শুনে তাঁরা আগ্রহীদের খুঁজে নেন। সেইমতো যোগাযোগ হয়। সোমবার সন্ধ্যা থেকে খুঁজতে খুঁজতে মঙ্গলবার দুপুরে ম্যালের কাছে দেখা মিলল এক ঘোস্ট গাইডের। পর্যটক সেজে গিয়ে খুঁটিনাটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতেই সন্দেহ হল গাইডের। উলটো পথে হাঁটা দিলেন। নাছোড়বান্দা হয়ে তাঁর পিছু নিতেই ডজনখানেক শর্তে কথা বলতে রাজি হলেন। গরম কফিতে চুমুক দিয়ে শোনালেন ঘোস্ট রাইডের নানা গল্প। বললেন, ‘ঘোস্ট রাইড আসলে মানুষের মনস্তত্ত্বের এক খেলা। আমরা ভয় পেতে ভালোবাসি, তবে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে। অন্ধকারে একটু কাঁপতে চাই, কিন্তু হাতের মুঠোয় টর্চ রাখতে চাই। আমরা সেই চাহিদাকে গল্পের মোড়কে বেঁধে দিয়ে কিছু আয় করছি, এই যা।’
বিশ্বের নানা শহরে এমন রাতের সফর বহুদিন ধরেই জনপ্রিয়। স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গের অন্ধকার গলিতে প্লেগ–পীড়িত আত্মার গল্প শোনানো হয়। ইংল্যান্ড বা আয়ারল্যান্ডেও এই জাতীয় ভূতুড়ে পর্যটন চালু আছে। ভারতেও রাজস্থানের ভানগড় কেল্লাতে এমন রোমাঞ্চের ছোঁয়া মেলে। সেই তালিকায় নিঃশব্দে নাম লেখাচ্ছে দার্জিলিং। কিন্তু শৈলরানির ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে হাড়কাঁপানো ঠান্ডার সঙ্গে মিশে থাকে পাইন বন আর পাহাড়ি কুয়াশা, তার মধ্যে যখন গাইড ফিশফিশ করে শোনান কোনও এক অতৃপ্ত আত্মার করুণ কাহিনী, তখন বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। ভূতের গুজবেই এই পর্যটনের জনপ্রিয়তা।
বিদেশি পর্যটকদের এক অংশ এখন আর কেবল শৈলশহরের প্রাকৃতিক শোভা দেখতে আসেন না, তাঁরা আসেন এই নিষিদ্ধ ছায়াময় হাতছানির সন্ধানে। যুক্তি আর বাস্তবের দেওয়াল ভেঙে দার্জিলিং এখন অশরীরীকে অনুভব করার এক মায়াবী কুহক। হয়তো কয়েক বছর পর এই সফর আর গোপন থাকবে না। হয়তো ওয়েবসাইট খুলবে, টিকিট কাটা হবে, রিভিউ লেখা হবে। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, দার্জিলিংয়ের কুয়াশায় যে ফিশফিশানি ভাসছে, তা যেন এক নতুন আবিষ্কার।
