গৌরহরি দাস, কোচবিহার : কোচবিহার-২ ব্লক তথা কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে অঞ্চল রয়েছে মোট ১৩টি। অথচ সেখানে তৃণমূলের ২৫ জন অঞ্চল সভাপতি ও চেয়ারম্যান রয়েছেন ২৬ জন। সৌজন্যে তৃণমূলের জেলা সভাপতি অভিজিৎ দে ভৌমিক (হিপ্পি) ও কোচবিহার-২ ব্লক সভাপতি সজল সরকারের মধ্যে দ্বন্দ্ব। ১৩টির মধ্যে শুধুমাত্র পাতলাখাওয়া অঞ্চল বাদে ব্লকের বাকি ১২টি অঞ্চলেই হিপ্পি ও সজলের ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী আলাদা অঞ্চল সভাপতি রয়েছেন। দুজনের তালিকায় চেয়ারম্যান প্রতিটি অঞ্চলেই আলাদা। দলের জেলা ও ব্লক সভাপতির মধ্যে এই দ্বন্দ্বে চরম বিভ্রান্তিতে পড়েছেন ব্লকে দলের নীচুতলার নেতা-কর্মীরা। দুই নেতার ডাকা দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তাঁরা কোথায় যাবেন আর কোথায় যাবেন না, কোথায় গেলে কে গোসা করবে, এনিয়ে তাঁরা নাজেহাল হচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, দুই নেতার বিরোধে বিধানসভা কেন্দ্রে আখেরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দল, যা বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলের পক্ষে কোনওভাবেই ভালো বিজ্ঞাপন নয়।
সজল অবশ্য বলছেন, ‘কিছুদিন অপেক্ষা করুন। খুব শীঘ্রই এই সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে।’ তাহলে কি জেলা সভাপতির সঙ্গে তাঁর কোনও বোঝাপড়ার রাস্তা খুলছে? এনিয়ে সজল স্পষ্ট করে আর কিছু বলতে চাননি। দলের জেলা সভাপতিকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন না ধরায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তৃণমূলের জেলা চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন বলেন, ‘বিষয়টি রাজ্য নেতৃত্বের নজরে রয়েছে। আশা করছি খুব শীঘ্রই তারা এই সমস্যার সমাধান করবে।’
তৃণমূলের কোচবিহার-২ ব্লক সভাপতি ও জেলা সভাপতির মধ্যে বরাবরই সাপে-নেউলে সম্পর্ক। সম্প্রতি কোচবিহার-২ ব্লক কমিটি ও অঞ্চল কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দুজনের বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। সেই বিরোধের জেরেই ব্লকে জেলা সভাপতি ও ব্লক সভাপতি আলাদা আলাদা ব্লক ও অঞ্চল কমিটি গঠন করেছেন। চলতি মাসের গত ১৫ দিনে ব্লক সভাপতি ও জেলা সভাপতির অনুগামীরা ব্লকে একাধিক কর্মসূচি আয়োজন করেছে। কিন্তু দুই শিবিরের ডাকা কর্মসূচিগুলিতেই দেখা গিয়েছে, ব্লকের হাতেগোনা দু’-চারজন প্রধান, উপপ্রধান উপস্থিত রয়েছেন। এই বিভ্রান্তির ফলে কর্মসূচিগুলিতে দলের সাধারণ কর্মীদের উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে অনেকটা কম ছিল। এছাড়া ব্লকে দলের কোনও অঞ্চল সভাপতি কোনও কর্মসূচির ডাক দিলে সেই অঞ্চলের আরেক অঞ্চল সভাপতি কটাক্ষ করছেন, সেই কর্মসূচিকে অবৈধ বলছেন।
ব্লকের এক গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান বলেন, ‘আমরা কোথায় যাব? কারণ ব্লক সভাপতির ডাকা কর্মসূচিতে গেলে জেলা সভাপতির অনুগামীদের কোপে পড়তে হবে। আবার জেলা সভাপতির অনুগামীদের ডাকা কর্মসূচিতে গেলে ব্লক সভাপতি ও তাঁর অনুগামীদের কোপে পড়তে হবে। আমরা দলের সাধারণ নেতা-কর্মীরা কী করব? কোথায় যাব? ব্লক সভাপতি ও জেলা সভাপতি দুজনেই আমাদের নেতা। আমরা কার কথা শুনব?’
শুধু ওই উপপ্রধান নন, ব্লকের অধিকাংশ প্রধান, উপপ্রধান সহ দলের নীচুতলার প্রায় সমস্ত নেতা-কর্মী চান এই সমস্যার সমাধান হোক।
বামেদের হাত থেকে বর্তমানে কোচবিহার-২ ব্লকটি বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। ২০১৬ সালে জেলার ৯টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে তৃণমূল ৮টিতে জিতলেও শুধুমাত্র এই কেন্দ্রটিতে জিততে পারেনি। এমনকি ২০২৪ সালে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে হারিয়ে তৃণমূলের প্রার্থী জয় পেলেও কোচবিহার-২ ব্লকটিতে তৃণমূল ১৮ হাজার ভোটে পিছিয়ে ছিল। তবে তৃণমূল ব্লকে কিছুটা গোছাতে শুরু করেছিল। এই অবস্থায় নির্বাচনের আগে ব্লকে জেলা সভাপতি ও ব্লক সভাপতির দ্বন্দ্বে রাজ্য নেতৃত্ব অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না করলে আগামী নির্বাচনে তৃণমূল যে এখানে ফের মুখ থুবড়ে পড়বে, তা স্পষ্ট।
