কোচবিহার: পড়ন্ত বিকেল। দুপুরের গরমের দাপট তখন খানিকটা কমেছে। তোর্ষার জলের উপর দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়া শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে। কিছুটা দূরে গাছের সারি হাওয়ার তালে সমানভাবে দুলে চলেছে। চরে থাকা তরমুজখেতগুলিতে ছোটাছুটি করছে স্থানীয় কয়েকজন কিশোর-কিশোরী। ছোট নৌকায় যাত্রীদের পারাপার করাতে ব্যস্ত মাঝি হয়তো গুনগুন করে কিছু একটা গাইছিলেন। তোর্ষা আর রাস্তার মাঝে যে গার্ডওয়াল রয়েছে, সেখানে বসে রয়েছেন অন্তত জনাপঞ্চাশেক লোক। কেউ গল্প করছেন পাশে বসে থাকা প্রিয়জনের সঙ্গে। আবার কেউ উদাস চোখে চেয়ে রয়েছেন তোর্ষার দিকে। তোর্ষার এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখন নিয়মিত ভিড় হচ্ছে কোচবিহার শহর লাগোয়া ১ নম্বর কালীঘাট রোডে। এই জায়গাটিই এখন কোচবিহারের নতুন আড্ডাস্থল হয়ে উঠেছে।
কোচবিহার শহরকে তোর্ষা কার্যত ঘিরে রেখেছে। কিন্তু শহরবাসীর আক্ষেপ তোর্ষাকে কেন্দ্র করে সরকারিভাবে এখানে কোনও ‘ভিউপয়েন্ট’ তৈরি করা নেই। খাগড়াবাড়ি থেকে হরিণচওড়া পর্যন্ত তোর্ষার বাঁধের রাস্তা তৈরির পর ফাঁসিরঘাট ও বিসর্জনঘাটে বহু মানুষ ভিড় করেন। বিকেলের দিকে সেখানে আড্ডায় মেতে ওঠেন অনেকেই। তবে সেখানে আবর্জনা ফেলার অভিযোগ উঠেছে। বিসর্জনঘাটে আবর্জনা থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। ১ নম্বর কালীঘাট রোডে তোর্ষাতীরবর্তী এলাকায় আগে বাইরের মানুষজনের খুব একটা যাতায়াত ছিল না। তবে কয়েক মাসে সেই ছবি বদলেছে। এখন প্রতিদিনই সেখানে মানুষের আনাগোনা হয়।
হঠাৎ ছবিটা বদলে গেল কেন?
খোলসা করলেন স্থানীয় বাসিন্দা জলিল মিয়াঁ। তাঁর সেখানে একটি পানের দোকান রয়েছে। আগে এলাকার লোকজনই তাঁর ক্রেতা ছিলেন। তবে এখন বিক্রি বেড়েছে। জলিল মিয়াঁ বললেন, ‘কয়েক মাস আগে এখানে প্রথম একটি রেস্তোরাঁ খোলা হয়। তারপর সেখানে লোকজন আসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে এখানে তোর্ষার সৌন্দর্য দেখতে বহু মানুষ আসেন। আমাদের বিক্রিও বেড়েছে।’ তাঁর আরও সংযোজন, ‘এখন এলাকায় আরও একটি ভালো জিনিস হয়েছে। আগে তোর্ষার এখানে মদের আসর বসত। এখন লোকজনের ভিড় থাকায় মদের আসর বন্ধ হয়েছে।’
সাধারণ মানুষের আড্ডায় ভিড় হওয়ায় গত দুর্গাপুজো থেকে সেখানে রেস্তোরাঁ খুলেছেন দীপক দত্ত নামে সেখানকারই এক বাসিন্দা। তাঁর কথা, ‘রাস্তার পাশেই আমার বাড়ি। এখানে এখন বহু মানুষ বেড়াতে আসেন। সেই সুযোগে একটি রেস্তোরাঁ খুলেছি। ব্যবসা ভালোই হয়।’ এদিন বিকেলের দিকে তোর্ষার পাড়ে কয়েকজন বন্ধুরা মিলে এসেছিলেন কোচবিহার শহরের বাসিন্দা শুভম রায়। গার্ডওয়ালের উপর বসে পুরো বিকেলটাই আড্ডায় কাটিয়ে দিলেন। বললেন, ‘এখানে বসে তোর্ষার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে তোর্ষার চর অনেকটাই পরিষ্কার। সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে তোর্ষার সৌন্দর্য দেখার জন্য একটি ভালো ভিউপয়েন্ট তৈরি করলে ভালোই হবে।’
