শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: এ এক অন্য দুর্গার গল্প। এই দুর্গারা সমাজে ব্রাত্য। সমাজে তাঁদের ‘পুজো’ হয় না। কিন্তু দশভুজার মতোই দশ হাতে মর্ত্যের উমা সুমি দাস অন্য ‘দুর্গা’-দের নিয়ে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন। কোচবিহারের (Cooch Behar) গণ্ডি ছাড়িয়ে তাদের সীমানা ছুঁয়েছে অসমে। শিক্ষার আলো ছড়ানো থেকে কর্মসংস্থানের জোগাড়, সবই সামলাচ্ছেন সুমিরা।
দিনহাটার বলরামপুর রোডে জন্ম সুমি দাসের। তিনি রূপান্তরকামী হওয়ায় ছোট থেকেই প্রতিবেশী ও সহপাঠীদের কটাক্ষ শুনতে হত। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলেও সমাজের চোখরাঙানি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে খুব কষ্ট হয়েছিল। এরপর তাঁর শিলিগুড়িতে পাড়ি দেওয়া। পড়াশোনা ও সংগঠনের কাজ করতে করতে একসময় মনে হয়েছিল কোচবিহারে যে রূপান্তরকামীরা রয়েছেন তাঁদের জন্য কিছু করা প্রয়োজন। ২০০৯-এ ফিরে আসেন কোচবিহারে। ২০১১ সালে তৈরি করেন ‘মৈত্রী সংযোগ’ নামে একটি সংগঠন। বর্তমানে তঁারা ছড়িয়ে পড়েছেন উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায়। এখন পর্যন্ত ১০ হাজারেরও বেশি রূপান্তরকামীর পাশে তাঁরা দাঁড়িয়েছেন বলে দাবি তাঁদের।
তবে সুমির উদ্যোগে দুটি কাজ সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ফেলেছে। তার প্রথমটি রূপান্তরকামীদের নিয়ে তৈরি হওয়া কারখানা। কারও কাছ থেকে হাত পেতে টাকা নেওয়া নয়, নিজেরা পরিশ্রম করে সেই কারখানা থেকে তাঁরা উপার্জন করেন। অপরটি হল মৈত্রী সংযোগ গুরুকুল। যেখানে এলাকার দুঃস্থ ২৮ জন পড়ুয়া প্রতিদিন বিকেলে পড়াশোনা করে। সন্ধ্যার পর নৈশভোজ সেরে বাড়ি ফেরে পড়ুয়ারা। সমস্ত খরচই বহন করেন সুমিরা।
সুমি বলছিলেন, ‘শারীরিক বৈশিষ্ট্যের জন্য ছোটবেলায় আশপাশের মানুষের কাছ থেকে অনেক টিটকিরি শুনতে হয়েছে। একা একা কাঁদতাম। একসময় মনে হয়েছিল সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য কিছু একটা করা প্রয়োজন। সেই তাগিদ থেকেই কাজ করে যাচ্ছি।’ কোচবিহার শহর সংলগ্ন ঘুঘুমারির বসারবাজারে ‘আশ্রম’ নামে একটি আবাসস্থল তৈরি করেছেন সুমিরা। কোনও জায়গায় রূপান্তরকামীরা সমস্যায় পড়লে সেখানে কয়েকদিনের জন্য তঁাদের নিরাপদ আশ্রয় মেলে। কোথাও কেউ নির্যাতনের শিকার হলে সেখানে ঢাল হয়ে দাঁড়ান সুমিরা। তবে শুধু মানসিকভাবে পাশে দাঁড়ালেই তো আর সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন রোজগারের। সাধারণত দেখা যায় রূপান্তরকামীদের অনেকেই ট্রেনের যাত্রীদের থেকে টাকা নেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাড়িতে গিয়ে আশীর্বাদ দেওয়ার নামেও টাকা নেওয়া হয়। তবে এসব না করে কর্মসংস্থানের দিকেই এগিয়েছেন সুমিরা।
বসারবাজারে ২০২০ সালে একটি কারখানা খোলেন তাঁরা। ব্যাংক থেকে ঋণ ও পরিচিতদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নিয়ে কাগজের থালা, বাটি, ফুচকার বাটি তৈরির দুটি মেশিন কেনেন। সেখানে কাজ শুরু করেন তঁাদের মতো কয়েকজন। বর্তমানে সেখানে ২০টি মেশিন রয়েছে। কাজের পরিসরও বেড়েছে। প্রতিবেশীদের কাছে নির্যাতিত হয়ে সুমিদের কাছে ঠাঁই নিয়েছিলেন ঈশ্বর চন্দ নামে এক রূপান্তরকামী। তিনি এখন এই কারখানায় কাজ করে দিব্যি রোজগারের মুখ দেখছেন। তাঁর কথায়, ‘এখানে ১৮ জন কাজ করেন। পাঁচজন ট্রান্সজেন্ডার রয়েছেন। শুধু তাই নয়, গ্রামের কয়েকজন মহিলাও এখানে কাজ করে অর্থ উপার্জন করেন।’
গ্রামের এক মহিলা পম্পা দে’র বক্তব্য, ‘এখানে কারখানা খোলায় আমরা রোজগার করতে পারছি। আমাদের তৈরি থালা, বাটি অনেক দূরে দূরে যাচ্ছে।’ কাঁচামাল কিনে আনার পর কারখানায় তৈরি করা পণ্য উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বাজার তো বটেই, অসমের বাজারেও যায়।’
রূপান্তরকামীদের বিভিন্ন আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়াই শুধু নয়, সমাজে তাঁদের নিপীড়ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে মায়ের মতোই আড়াল করে রাখেন সুমি। ২০১৮ সালে আমেরিকা, চলতি বছরে থাইল্যান্ডে গিয়ে এই সংক্রান্ত সেমিনারে অংশ নিয়েছিলেন সুমি।
সুমি জানেন, তাঁর লড়াইটা অনেক কঠিন। সমাজের গভীরে ঢুকে অন্ধ সংস্কারের অসুরটাকে বধ করে সেটা জিততে হবে।
