কোচবিহার ও দিনহাটা: পিউ সাহা কোচবিহারের বাসিন্দা। সোশ্যাল মিডিয়ায় রান্নার গ্যাসের সংকটের কথা জানতে পেরে বধূটি চমকে ওঠেন। বাড়িতে মাত্র একটি সিলিন্ডার আছে। তা দিয়ে বড়জোর আর দশদিন চলবে। কিন্তু এর মধ্যে যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় তাহলে? দুশ্চিন্তা নিয়েই তিনি ইউটিউব খুললেন। সার্চ বাটনে গিয়ে লিখলেন, ‘কম গ্যাস ব্যবহার করে কীভাবে রান্না করা যায়?’ একগাদা ভিডিও চলে এল। এক এক করে বেশ কয়েকটি ভিডিও দেখলেন পিউ। ভিডিওগুলো দেখে তাঁর দুশ্চিন্তা খানিক লাঘব হল। স্বস্তির ছায়া লক্ষ করা করা গেল পিউয়ের চোখেমুখে। তিনি বলেন, ‘জল গরম, চা করার জন্য গ্যাস ব্যবহার করতাম। ইউটিউবে দেখলাম এগুলি যদি ইলেক্ট্রিক কেটলিতে করে নিই তাহলে কিছুটা হলেও গ্যাস বাঁচবে। বাড়িতে ইলেক্ট্রিক কেটলি থাকলেও এতদিন ব্যবহার করতাম না। এবার থেকে করব।’
ঠিকসময়ে গ্যাসের সিলিন্ডার না পৌঁছানোয় বহু মানুষ সমস্যায় পড়েছেন। মোবাইলে গ্যাস বুকিং করা হচ্ছে, মেসেজও আসছে। শুধু বাড়ির দরজায় সিলিন্ডার এসে পৌঁছাচ্ছে না। সবার মুখে এখন একটিই প্রশ্ন, ‘গ্যাস মিলবে কবে?’ গ্যাসের সিলিন্ডার না পেয়ে বধূদের মেজাজ সপ্তমে চড়ছে। সেই ‘ঝাল’ এসে পড়ছে বাড়ির কর্তাদের উপরেও। রান্নার গ্যাস নিয়ে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে এখন হেঁশেল সামলাতে বধূদের নানান পন্থার কথা ভাবতে হচ্ছে।
দিনহাটার গৃহিণীদের কেউ ফিরে যাচ্ছেন পুরোনো দিনের উনুনে। বাড়ির উঠোনে বা রান্নাঘরের এক কোণে মাটি দিয়ে উনুন তৈরি করা হচ্ছে। শুকনো ডালপালা এবং জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে অনেকে রান্না সারছেন। যদিও শহুরে সভ্যতায় অভ্যস্তদের পক্ষে উনুনের ধোঁয়ায় রান্না করা মোটেও সহজ নয়। তবুও নিরুপায় হয়ে সেই পথই বেছে নিতে হচ্ছে। দিনহাটার বধূ প্রিয়া সাহার কথায়, ‘কয়েকদিন আগে গ্যাস বুক করেছি। প্রতিদিন ভাবছি আজ হয়তো আসবে। কিন্তু এখনও এল না। তাই বাধ্য হয়ে উনুনে রান্না করছি।’
অনেকেই আবার গ্যাস বাঁচাতে বদলে ফেলছেন প্রতিদিনকার রান্নার তালিকা। আগে যেখানে এক বেলায় একাধিক পদ রান্না হত, গ্যাসের সিলিন্ডার অমিল হওয়ায় কমেছে পদের সংখ্যা।
বধূ উমা রায় বলেন, ‘আধুনিক রান্নাঘর গ্যাসনির্ভর। গ্যাস ছাড়া আমরা যেন অসহায়। এখন গ্যাস বাঁচাতেই হচ্ছে। সকালে এক পদ দিয়েই খাওয়াদাওয়া সারা হল। যে জিনিস রাঁধতে বেশি সময় লাগে তা এড়িয়ে চলছি।’
গ্যাস ডিলারদের অবশ্য দাবি, হুজুগের মাথায় অনেকেই বেশি করে গ্যাস নিয়ে রাখছেন। সেজন্যই কৃত্রিম অভাব তৈরি হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যেই সমস্যা মিটে যাবে বলে তাঁরা আশ্বাস দিয়েছেন। দিনহাটার এক গ্যাসের ডিলারের কথায়, ‘গাড়ি নামতে নামতেই গ্যাসের সিলিন্ডার শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকের গ্যাস না লাগলেও হজুগের মাথায় নিয়ে রাখছে।’ তবে কোচবিহারে সরবরাহ কম রয়েছে বলে দাবি করেছেন একটি গ্যাস কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটার প্রকাশ কালোয়ার। তাঁর বক্তব্য, ‘প্রতিদিন কমবেশি ১২০০টি সিলিন্ডার বুক হচ্ছে। অথচ আমাদের কাছে সিলিন্ডার আসছে মেরকেটে ৩০০টি। কাকে গ্যাস দেব আর কাকে দেব না তা নিয়েই গ্রাহকদের সঙ্গে ঝামেলা হচ্ছে।’ তবে গ্যাস নিয়ে যাতে কালোবাজারি না হয় সেজন্য প্রশাসনের তরফে নজর রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কোচবিহার সদর মহকুমা শাসক গোবিন্দ নন্দী।
