নিশিগঞ্জ: রাজনীতির মঞ্চে একসময় যাঁর উপস্থিতি ছিল স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী, সময়ের পালাবদলে আজ তিনি যেন অন্তরালের মানুষ। জাতীয় কংগ্রেসের দাপুটে নেতা হিসেবে পরিচিত কল্যাণ সিংহ পরবর্তীকালে তৃণমূলের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতে থাকায় আশি ঊর্ধ্ব এই বর্ষীয়ান নেতাকে এখন অনেকটাই গুটিয়ে নিতে হয়েছে নিজেকে।
নিশিগঞ্জের রাজ্য সড়কের ধারে এক সময় জমজমাট ছিল ‘সিংহবাড়ি’। রাজনৈতিক আলোচনা, নেতাদের আনাগোনা আর কর্মীদের ভিড়ে মুখর থাকত সেই প্রাঙ্গণ। আজ সেখানে নীরবতা। চাকরির সূত্রে ছেলে ভিনরাজ্যে, স্ত্রী প্রয়াত—রাজনীতি আর জন্মভিটের টানেই একা থাকেন তিনি। স্মৃতির ভাঁড়ার খুলে কল্যাণ বলেন, ‘একসময় জেলার প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা থেকে ফরওয়ার্ড ব্লকের মন্ত্রী কমল গুহ কিংবা রাজ্যের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ফজলে হকের মতো ব্যক্তিত্ব আমার বাড়িতে এসেছেন। যুব কংগ্রেস নেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোচবিহারে এলে সার্কিট হাউসের দেখভালের দায়িত্বও পড়ত আমার কাঁধে।’
স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। নাগরিক সমিতির ব্যানারে কলেজ প্রতিষ্ঠা, দমকলকেন্দ্র, কমিউনিটি হল ও ব্যাংকের শাখা স্থাপনের দাবিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। এলাকার প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে সভাপতির আসনে দেখা যেত তাঁকে। নিশিগঞ্জ-১ গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূল-বিজেপি জোট ক্ষমতায় এলে প্রধান নির্বাচন বা টিকিট বণ্টনের বৈঠকে তাঁকে ‘কিং মেকার’ হিসেবেই ধরা হত। সময় বদলেছে। একসময় এলাকার তৃণমূল নেতাদের অনুরোধে কংগ্রেস পার্টি অফিস তৃণমূলকে ছেড়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সংগঠন মজবুত করার কাজেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। কিন্তু ২০২১ সালের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ অন্তরালে চলে যেতে হয় তাঁকে। জেলার দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ও বিনয়কৃষ্ণ বর্মনের প্রভাব এলাকায় কমতেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর নিশিগঞ্জ কলেজের পরিচালন সমিতির সভাপতির পদ ছাড়তে হয়। তারপর দলের সঙ্গে সেই দূরত্ব আরও প্রকট হয়। আক্ষেপের সুর লুকোন না কল্যাণ সিংহ, ‘দলের মধ্যেই তো আছি, কিন্তু আমার খোঁজ কে রাখে?’—স্মিত হাসির অন্তরালে প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি।
তবে স্থানীয় রাজনীতি তাঁকে আড়াল করলেও সেই রাজনীতির প্রতিটি খুঁটিনাটি খবর থেকে দূরে সরেননি তিনি। কিন্তু সক্রিয় ময়দানে আর দেখা যায় না তাঁকে। অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষক কল্যাণ সিংহ বলেন, ‘রাজনীতি করতে গিয়ে আমার প্রথম গুরুত্ব ছিল শিক্ষার পরিকাঠামোর উন্নয়ন। পদ থেকে নিঃশব্দে সরে দাঁড়িয়েছি কিন্তু নিশিগঞ্জ কলেজটা আজও সরকারপোষিত নয়। আজকাল এই তৎপরতার অভাব বড় কষ্ট দেয়।’
সময়ের সঙ্গে বদলেছে রাজনীতির ভাষাও। বিধানসভা ভোট আসছে তবু হাতে অফুরন্ত সময় এই প্রাক্তন নেতার। নিশিগঞ্জের ‘সিংহবাড়ি’র সামনে দাঁড়িয়ে রাজনীতির ব্যাকরণ মেলাতে পারেন না এই বর্ষীয়ান নেতা। প্রয়াত কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী অজিত পাঁজা একসময় এই কল্যাণের উপরেই ন্যস্ত করেছিলেন মাথাভাঙ্গা বিধানসভায় দলীয় নির্বাচন পরিচালনার গুরুভার।
