শিবশংকর সূত্রধর, কোচবিহার: অপারেশন থিয়েটারে তখন জ্বলছে ছায়াহীন আলো। চিকিৎসক ও তাঁর সহকারীরা মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস ও গায়ে অস্ত্রোপচারের পোশাক পরে প্রস্তুত। চারদিকে ছড়িয়ে রাখা কাটাছেঁড়া করার যন্ত্রপাতি। মনিটরে গ্রাফ ওঠানামা করছে। অপারেশন থিয়েটারের বেডে শুয়ে তখন অজানা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে মৌসুমি গুহ মজুমদার। যে সন্তানকে তিনি এতদিন ধরে গর্ভে একটু একটু করে বড় করে তুলেছেন, তার কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাবে কিছুক্ষণ পরই। চিকিৎসকরা তারই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যে কোনও অন্তঃসত্ত্বারই রক্তচাপ বাড়ে। মাথার ভিতর পাক খেতে থাকে হাজারো দুশ্চিন্তা। তবে ছোটবেলায় মা-বাবা হারানো মৌসুমি অন্য ধাতুতে গড়া। তাই চিন্তা সরিয়ে অপারেশন টেবিলে শুয়েই তিনি গেয়ে উঠলেন, ‘এই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায়, একি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু…।’
গান গাইতে গাইতেই অপারেশন থিয়েটারের ভিতরে সেই গানের সুর ছাপিয়ে গেল নবাগত ফুটফুটে এক কন্যাসন্তানের কান্নার আওয়াজে। মৌসুমির গলায় তখনও গানের সুর, ঠোঁটে হালকা হাসি। সোমবার এক সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যা সে গানের মাধ্যমেই আপন করে নিল তাঁর সন্তানকে। কোচবিহারের (Cooch Behar) একটি নার্সিংহোমের এই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন চিকিৎসক পরীক্ষিৎ ভট্টাচার্য। মুহূর্তেই তা ভাইরাল (Viral Video)।
নারীশিক্ষার প্রবণতা ও মহিলাদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির কারণেই অপারেশন থিয়েটারে এখন ভয়ের বদলে এরকম পরিবেশ দেখা সম্ভব হচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন। মৌসুমির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার (C-Part) করেছেন ডাঃ অলোক সাঁতরা। তিনি বললেন, ‘ওঁর শক্ত মানসিকতা দেখে রীতিমতো অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এক-দুই দশক আগেও আমরা দেখেছি স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নারীশিক্ষার অভাবের জন্য সন্তান জন্মের সময় বিভিন্নরকম জটিলতা দেখা যেত। এখন সচেতনতা বেড়েছে। সমাজের এই ছবি পরবর্তনের বিষয়টিই ধরা পড়েছে এদিনের ঘটনায়।’ একই সুরে শিশুবিশেষজ্ঞ পরীক্ষিৎ ভট্টাচার্যের বক্তব্য, ‘একজন মহিলার কাছে মা হওয়াটা কতটা ভালো লাগার তা একমাত্র তাঁরাই বোঝেন। তবে সেই পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে স্বাভাবিক থাকা সহজ কথা নয়। সেটাই করে দেখিয়েছেন মৌসুমি। বিষয়টি এতটাই ভালো লেগেছিল যে দৃশ্যটি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি। তাতে ওঁকে দেখে অনেক মহিলাই মনে সাহস পাবেন।’
মৌসুমি যখন অপারেশন থিয়েটারের ভিতরে গান গেয়ে তাঁর সন্তানকে স্বাগত জানাচ্ছেন তখন একরাশ উদ্বেগ নিয়ে থিয়েটারের বাইরে পায়চারি করছিলেন তাঁর স্বামী শুভময় সরকার। দুজনেই পেশায় শিক্ষক। কোচবিহারের ২ নম্বর কালীঘাট রোডের বাসিন্দা। শুভময় বললেন, ‘মৌসুমি ছোট থেকে মা-বাবা হারা। তাই মানসিকভাবে অনেক শক্ত। দাদা, দিদিদের কাছেই মানুষ হয়েছে। এটি আমাদের প্রথম সন্তান। স্বাভাবিকভাবেই বেশ উদ্বেগ ছিল। সবকিছু ভালোভাবে উতরে যাওয়ায় আমরা খুব খুশি।’ নার্সিংহোমের বেডে শুয়েই মৌসুমি বলছিলেন, ‘সবকিছু সম্ভব হয়েছে চিকিৎসকদের জন্যই। তঁাদের তৈরি করা সুন্দর পরিবেশই আমাকে সাহস জুগিয়েছে।’
বর্তমানে মা ও সন্তান দুজনেই সুস্থ রয়েছেন। মেয়ে কবে ‘মা’ বলে ডাকবে বলে এখন থেকেই মৌসুমি প্রহর গোনা শুরু করেছেন। সন্তান যখন রাতে ঘুমোতে চাইবে না বা দুষ্টুমি করবে তখন তিনি গান গেয়েই তাকে শান্ত করবেন বলে পরিকল্পনা করে রেখেছেন। মায়ের গলায় গান শুনতে শুনতে মেয়েও ঘুমিয়ে পড়বে। জন্মের সময় মায়ের গান গাওয়ার সাক্ষী থেকে যাবে ওই অপারেশন থিয়েটার আর সোশ্যাল মিডিয়া।
