কোচবিহার: একসময় কোচবিহারকে সিটি অফ বিউটি বলা হত। রাজ আমলের অনেক নিদর্শন, বহু স্থাপত্য ছড়িয়ে ছিল শহরজুড়ে। কালের করাল থাবায় আস্তে আস্তে এই শহর থেকে হারিয়ে গিয়েছে নীলকুঠির রাজবাড়ি, আস্তাবল, রাজবাড়ির ডলস হাউস, জজকোর্ট এবং আরও অনেক স্থাপত্য। হারিয়ে গিয়েছে সিলভার জুবিলি টাওয়ারও। ভবানীগঞ্জ বাজারে অবস্থিত এই টাওয়ারকে স্থানীয়রা ঘণ্টী ঘর বলতেন। সময়ের সঙ্গে শহরের বুক থেকে হারিয়ে গিয়েছে ঘণ্টী ঘরও।
সাল ১৮৮৭। কোচবিহারের সিংহাসনে আসীন মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ। মহারানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের রজত জয়ন্তী বর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে তৈরি করা হল ৭০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট সিলভার জুবিলি টাওয়ার। চারতলা এই টাওয়ারের একদম উঁচুতে একটি গোলাকৃতি ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। ওই ঘরে একটা বড় ঘণ্টা লাগানো ছিল। এই ঘরে সবসময় একজন প্রহরী থাকতেন। শহরের কোথাও আগুন লাগলে এই ঘণ্টা বাজানো হত। লাল পতাকা দেখিয়ে কোন দিকে আগুন লেগেছে সেটা বোঝানো হত। স্থানীয়রা ওই ঘণ্টাকে পাগলা ঘণ্টী বলতেন।
স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে শহরের প্রবীণ বাসিন্দা নির্মলেন্দু চক্রবর্তী বলেন, ‘বাইরে থেকে যাঁরা শহরে আসতেন তাঁরা লালদিঘির উত্তর পাড়ে গোরু-মোষের গাড়ি রেখে বাজারে যেতেন। লালদিঘির চারদিকে বাঁধানো ঘাট ছিল। কিন্তু এখন চারদিকে হোটেল এবং দোকান হয়ে যাওয়ায় লালদিঘির উত্তর দিকের ঘাট আর দেখাই যায় না।’ তিনি যোগ করেন, ‘ঘণ্টী ঘরের একদিকে ছিল মরু ঘোষের মিষ্টির দোকান। অন্যদিকে ছিল পেনের দোকান। ছোটবেলায় ওই দোকান থেকে পেন কিনে এক বন্ধুর সঙ্গে ঘণ্টী ঘরের দোতলা পর্যন্ত উঠেছিলাম মনে আছে। এখন সেই শংকর পেন স্টোর্সের জায়গা পরিবর্তিত হয়েছে। মরু ঘোষের মিষ্টির দোকানও পাকা হয়েছে। কিন্তু যেই টাওয়ার ঘিরে এতকিছু সেটাই আর নেই। ইতিহাসের স্মারক হিসেবে ঘণ্টী ঘরকে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। কিন্তু ওই টাওয়ার ভেঙে বাজার তৈরি করে দেওয়া হল। বর্তমান প্রজন্ম শহরের এই ঐতিহাসিক স্থানের সম্বন্ধে জানতেই পারল না।’
শহরের প্রবীণরা বলেন, মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্রনারায়ণের ভাই ইন্দ্রজিতেন্দ্রনারায়ণ এই টাওয়ারে উঠে গোটা শহরটাকে দেখতেন। ১৯৫৩ সালের ৬ জুন, এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং নোরগেও এই টাওয়ারে উঠেছিলেন, যাতে জড়ো হওয়া সমস্ত মানুষ তাঁকে দেখতে পান। এইরকম ঐতিহ্যসম্পন্ন টাওয়ারটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহুদিন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল। শেষমেশ ৮০-র দশকে এই টাওয়ারের অবশিষ্টাংশকে ভেঙে ফেলা হয়।
প্রবীণ বাসিন্দা অরবিন্দ ভট্টাচার্য বলেন, ‘১৯৫৮ সালে ভবানীগঞ্জ বাজারে আগুন লেগেছিল। সেইসময় পাগলা ঘণ্টী বাজানো হয়েছিল। ঘণ্টার আওয়াজ শুনে দমকল এসেছিল। ঘণ্টার শব্দ শুনে বহু মানুষ জড়ো হয়ে লালদিঘি থেকে বালতি করে জল নিয়ে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।’
প্রবীণ আইনজীবী আনন্দজ্যোতি মজুমদার বলেন, ‘এই শহরটাই কত পালটে গেল। লালদিঘির চারদিকে এত দোকান হল যে এখন লালদিঘি আর দেখাই যায় না। ঘণ্টী ঘর ভেঙে ফেলা হল। অত বড় পিতলের ঘণ্টী কোথায় গেল কারও মাথাব্যথা নেই। আমরাও ইতিহাস ভুলে গেলাম।’
