শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: ট্রেনের কু-ঝিকঝিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাঙাচোরা কামরার জানলাগুলোর শব্দ ফাঁকা মাঠের অন্যপ্রান্ত থেকেও শোনা যাচ্ছিল। ঢাকা থেকে অনবরত ঝাঁকুনিতেও কামরায় জমা পুরু আস্তরণের ধুলো তখনও উড়ে যায়নি। ২০২৪-এর ১০ ডিসেম্বর ভগ্নহৃদয়ে বন্ধুত্বের ট্রেন যখন হলদিবাড়ির খালপাড়া সীমান্তের ফটক পার হচ্ছিল তখনই মিতালির (Mitali Categorical) ভাগ্যরেখায় অনিশ্চয়তার দাগ পড়েছিল। বছরখানেক আগে বন্ধ হওয়া দরজা শুধু মিতালির ভবিষ্যৎ লেখেনি, লিখেছিল ভারত-বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য সম্ভাবনার ইতিহাস। সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লেখা হল বৃহস্পতিবার, বাংলাদেশের নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের চিলাহাটি স্থলবন্দর (Chilahati Landport) বন্ধ করে দেবার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। কোচবিহারের হলদিবাড়ি সীমান্তের ওপারে থাকা নীলফামারির ডোমার উপজেলার ওই বন্দর বন্ধের ঘোষণা দুই দেশের বহু মানুষের আশায় জল ঢেলে দিল।
চিলাহাটি বন্ধের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নর্থবেঙ্গল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ব্রিজকিশোর প্রসাদ। তাঁর কথায়, ‘ওই বন্দর বন্ধে এখনই কোনও প্রভাব পড়বে না। তবে আমাদের যাবতীয় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভেস্তে গেল বলা যায়। একটি বন্দরকে কার্যকর করতে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়। দিল্লি, ঢাকায় দফায় দফায় দাবির পর মিতালি চালু করা গিয়েছিল। সেই ট্রেনটিও হয়তো আর চলবে না। বাংলাদেশ অনেক বড় ভুল করল।’ হতাশ হলদিবাড়ি পাসপোর্ট হোল্ডার সমিতির কর্মকর্তারাও। সমিতির সদস্য লুৎফর রহমানের বক্তব্য, ‘মিতালি চালুর পর আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্য শুরু হলে হলদিবাড়ির আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত ছিল। সেসব বোধহয় আর হবে না।’
তবে শুধু চিলাহাটি নয়, চুয়াডাঙ্গার দৌলতগঞ্জ ও রাঙামাটির তেগামুখ স্থলবন্দরও বন্ধ করে দিচ্ছে বাংলাদেশ। এছাড়া হবিগঞ্জের বাল্লা স্থলবন্দরের কার্জকর্ম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কথাও ঘোষণা করেছে মুহাম্মদ ইউনূসের উপদেষ্টামণ্ডলী। ওই চার বন্দর দিয়েই ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, যাতায়াত চালু ছিল। ওই চার স্থলবন্দর সহ মোট আটটি বন্দরকে অলাভজনক ও নিষ্ক্রিয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্থলপথে আমদানি-রপ্তানির সুবিধার্থে ২০১৩ সালের ২৮ জুলাই চিলাহাটি শুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করে বাংলাদেশ। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে চিলাহাটি হয়ে রেলপথ তৈরি হয়। ২০২২-এর ১ জুন ওই পথে যাত্রা শুরু করে মিতালি এক্সপ্রেস। ১৯৭২-এর ১৯ মার্চ দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত মৈত্রী চুক্তিতে যে বন্ধুত্বের সেতু তৈরি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধি ও মুজিবুর রহমান, মিতালি তাতে নতুন করে রং লাগিয়েছিল।
চিলাহাটিতেই ছিল বাংলাদেশের শুল্ক দপ্তরের কার্যালয়। মিতালি ওপারে ঢুকলে সেখানেই যাবতীয় যাচাইয়ের কাজ হত। চিলাহাটি বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে সেই কার্যালয়টিও বন্ধ হয়ে গেল। বাংলাদেশ সূত্রের খবর, আপাতত ওই কার্যালয়ের কর্মীদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে মিতালি নিয়ে যে বাংলাদেশ আপাতত কোনও ভাবনাচিন্তা করছে না তা স্পষ্ট। চিলাহাটি দিয়ে এখন পর্যন্ত কোনওরকম বাণিজ্য শুরু হয়নি। সবটাই ছিল ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তবে বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সব রাস্তাই বন্ধ হয়ে গেল বলেই মনে করছেন নর্থবেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সুরজিৎ পাল। তাঁর কথা, ‘আমরা তো অনেক কিছুই ভেবেছিলাম। যাত্রীবাহী ট্রেনের পর পণ্যবাহী ট্রেন চালু হবে বলে আশায় ছিলাম। তা হলে হলদিবাড়ি হয়ে উঠত উত্তরবঙ্গের অন্যতম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র। দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহণের খরচও অনেক কমে যেত। সার্বিকভাবে বাণিজ্যের প্রসার ঘটত এবং আর্থিকভাবে আমরা উপকৃত হতাম। সেইসব পরিকল্পনা আপাতত ভেস্তে গেল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধ না হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না বলেই মনে হচ্ছে।’
