মহম্মদ আশরাফুল হক, চাকুলিয়া: বড় বড় শ্রেণিকক্ষ, সামনে খোলা মাঠ, আর মাথার ওপর ছাদ- একটি স্কুলের যা যা থাকার কথা, তার সবই আছে। রয়েছেন একজন শিক্ষিকাও। কিন্তু যা থাকলে একটি স্কুল প্রাণ পায়, সেই পড়ুয়ার সংখ্যাই শূন্য! শুনতে অবাক লাগলেও উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়া জুনিয়ার গার্লস হাইস্কুলের (Chakulia Junior Ladies Excessive College) বর্তমান ছবিটা ঠিক এমনই। রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারাটা যেন এই স্কুলের প্রতিটি ইটে খোদাই করা হয়ে গিয়েছে। যেখানে রাজ্যের বহু স্কুলে পড়ুয়ার চাপে স্থান সংকুলান হয় না, সেখানে একটি সরকারি গার্লস স্কুল কীভাবে ছাত্রীশূন্য হয়ে ধুঁকছে, তা দেখে কপালে ভাঁজ পড়েছে খোদ প্রশাসনিক কর্তাদেরও।
চাকুলিয়া (Chakulia) বাজার থেকে কিছুটা দক্ষিণে, সুধানি নদীর গা ঘেঁষে ২০১০ সালে বড় স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই বিদ্যালয়টি। এলাকাবাসীর আশা ছিল, ঘরের মেয়েরা ঘরের কাছেই শিক্ষার আলো পাবে। শুরুর দিকে ছবিটা আশাব্যঞ্জকই ছিল। ২০১৩-’১৪ শিক্ষাবর্ষেও স্কুলের প্রাঙ্গণ প্রায় ২৪০ জন ছাত্রীর কলরবে মুখরিত থাকত। পড়াশোনা থেকে খেলাধুলো- সবমিলিয়ে বেশ জমজমাট ছিল পরিবেশ। কিন্তু ছন্দপতন ঘটতে শুরু করে এরপর থেকেই। ২০২১ সালে ছাত্রীর সংখ্যা একধাক্কায় নেমে আসে ৫০-এ, আর ২০২৩ সালে তা এসে ঠেকে মাত্র পাঁচে। সেই পাঁচজনও আর থাকেনি, টিসি নিয়ে চলে গিয়েছে অন্য স্কুলে। বর্তমানে স্কুলের হাজিরা খাতা একেবারে শূন্য। অথচ এই স্কুল থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে অবস্থিত চাকুলিয়া উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। একই এলাকায় পাশাপাশি দুটি সরকারি স্কুলের এই আকাশপাতাল বৈপরীত্য এলাকার শিক্ষানুরাগীদের ভাবিয়ে তুলেছে।
কিন্তু কেন এই বেহাল দশা? স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের অভিযোগের আঙুল স্কুলের পরিবেশের দিকে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এই স্কুলে স্থায়ী শিক্ষক-শিক্ষিকার চরম অভাব চলছে, যা পূরণের কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। তবে তার চেয়েও বড় সমস্যা হল স্কুলের ‘অস্বাস্থ্যকর’ পরিবেশ। অভিযোগ, সূর্য ডুবলেই বিদ্যামন্দিরটি চলে যায় সমাজবিরোধীদের দখলে। স্কুল চত্বরে নিয়মিত বসে মদ্যপান ও জুয়ার আসর। এখানেই শেষ নয়, প্রতিদিন সকালে স্কুলের বারান্দা ও দরজার সামনে দুষ্কৃতীদের মলমূত্র পড়ে থাকার দৃশ্য নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিষ মহম্মদ বা ভোলা হরিজনের মতো অভিভাবকরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এমন নোংরা ও নিরাপত্তাহীন পরিবেশে তাঁরা তাঁদের মেয়েদের পাঠাতে নারাজ।
স্কুলের এই করুণ পরিণতির সাক্ষী হয়ে আজও রোজ স্কুলে আসেন একমাত্র শিক্ষিকা শেফালি ঘোষ। আগে দুজন পার্শ্বশিক্ষিকা থাকলেও পড়ুয়া না থাকায় তাঁদের অন্য স্কুলে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রধান শিক্ষিকা সুজাতা সাহাও ২০২৩ সালে বদলি নিয়ে চলে গিয়েছেন। পাশের বালিগোড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ড্রাফট হিসেবে আসা শেফালি দেবী এখন একাই স্কুল আগলে বসে থাকেন। তিনি বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেও কাউকে ভর্তি করানো যায়নি। পরিবেশের কারণে অভিভাবকদের তীব্র অনীহা। আমরা সত্যিই মহাফাঁপরে পড়েছি।’ প্রাক্তন ছাত্রী জাহেদা খাতুনের গলায় শোনা গেল আক্ষেপের সুর। একসময় এই স্কুলে ভর্তি হলেও নোংরা পরিবেশ আর দিদিমণি না থাকায় সে এবং তার গ্রামের আরও ১৩ জন মেয়ে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। বর্ষাকালে স্কুলের চারপাশ জলে ডুবে যায়, ভরে যায় জঙ্গলে- যা অভিভাবকদের ভয় আরও বাড়িয়ে দেয়।
পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে স্কুলটি আদৌ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে এলাকায়। স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি নীলাম্বরকুমার দাস বা চাকুলিয়া হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বাসুদেব দে- সকলেই চাইছেন স্কুলটি বাঁচুক, কিন্তু তার জন্য সবার আগে প্রয়োজন সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। জেলা স্কুল পরিদর্শক দেবাশিস সমাদ্দার অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, স্কুলটি চালু রাখার সবরকম চেষ্টা চলছে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে ছাত্রভর্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।
