BCCI | ক্রিকেটার না কি দাবার বোড়ে? বিসিসিআই-এর ক্ষমতার অন্ধ আস্ফালন

BCCI | ক্রিকেটার না কি দাবার বোড়ে? বিসিসিআই-এর ক্ষমতার অন্ধ আস্ফালন

শিক্ষা
Spread the love


উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক : ভারতীয় ক্রিকেটে এখন এক অদ্ভুত সমান্তরাল জগৎ চলছে। একদিকে মাঠের লড়াইয়ে ক্রিকেটারদের বীরত্ব, আর অন্যদিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকা বোর্ড কর্তাদের চরম অসংবেদনশীলতা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজের চতুর্থ ম্যাচটি লখনউয়ের একানা স্টেডিয়ামে একটি বলও না গড়িয়ে পরিত্যক্ত ঘোষিত হওয়ার পর আজ আবার সেই চিরন্তন প্রশ্নটা সামনে এল— বোর্ড কি আদৌ কারও কাছে দায়বদ্ধ? নাকি ক্ষমতার দম্ভে তারা সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমী এবং ক্রিকেটারদের স্বাস্থ্য— দুটোকেই স্রেফ দাবার বোড়ে বানিয়ে ফেলেছে?
লখনউয়ের বিপর্যয়কে প্রকৃতির রোষ বা ‘ফোর্স মাজিউর’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিসিসিআই (BCCI)। কিন্তু সত্যটা হল, এটি বিসিসিআই-এর অপারেশনস টিমের একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। যে শহরে ডিসেম্বরের মাঝপথে কুয়াশা এবং ভয়াবহ দূষণ ধ্রুবসত্যের মতো ফিরে আসে, সেখানে কোন যুক্তিতে ফ্লাডলাইটের তলায় নৈশকালীন ম্যাচ আয়োজন করা হল? এর উত্তর পাওয়া আজ অসম্ভব, কারণ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডে বর্তমানে দায়বদ্ধতা শব্দটি অভিধান থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।

দূষণে হাঁসফাঁস: ক্রিকেটারদের স্বাস্থ্য কি পণ্য?
ম্যাচের দিন লখনউয়ের বায়ু গুণমান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স ছিল ৪০০-র ওপরে, যা ‘বিপজ্জনক’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। মাঠে যখন হার্দিক পান্ডিয়াদের মতো মহাতারকাদের সার্জিক্যাল মাস্ক পরে গা-ঘামাতে দেখা যায়, তখন প্রশ্ন জাগে— বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা হওয়ার দম্ভ করা বিসিসিআই কি ক্রিকেটারদের নিছক ক্রীতদাস মনে করে?
শুধু লখনউ নয়, ধর্মশালার দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতেও আবহাওয়া ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল। নিউ চণ্ডীগড়ে ম্যাচের সময় দূষণ পৌঁছেছিল ‘সিভিয়ার’ বা মারাত্মক পর্যায়ে। উত্তর ভারতের এই শীতকালীন আবহাওয়া এবং দূষণের ইতিহাস কি বিসিসিআই-এর কর্তাদের জানা ছিল না? নাকি লজিস্টিক বা অন্য কোনও অদৃশ্য ‘রাজনৈতিক’ সমীকরণকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ক্রিকেটারদের ফুসফুসকে বাজি রাখা হল? মনে রাখতে হবে, ভারত আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে ঘরের মাঠে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ (T20 World Cup) ডিফেন্ড করতে নামবে। প্রস্তুতির চূড়ান্ত লগ্নে এই ম্যাচগুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শীতের রাতে উত্তর ভারতে ম্যাচ ফেলে সেই প্রস্তুতির বারোটা বাজিয়ে দিল খোদ বোর্ডই।

পরিকল্পনা না কি দম্ভের আস্ফালন?
ভারত গর্ব করে যে তাদের কাছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সচল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু রয়েছে। এই বিশাল দেশের মানচিত্রে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে ডিসেম্বরের রাতে কুয়াশার দাপট থাকে না। তা সত্ত্বেও লখনউকে কেন বেছে নেওয়া হল? উত্তরটা সম্ভবত পেশাদারিত্বে নেই, আছে রাজনীতির গলিঘুঁজিতে। বিসিসিআই আজ এমন এক মহীরুহ, যারা অর্থ এবং ক্ষমতার জোরে আইসিসি-কেও তুড়ি মেরে ওড়ায়। কিন্তু নিজেদের আঙিনায় যখন তারা সাধারণ দর্শকদের পকেটের পয়সা খরচ করিয়ে মাঠে এনে চরম হতাশ করে, তখন তাদের সেই ‘সুপারপাওয়ার’ তকমাটা হাস্যকর মনে হয়।

যদি ম্যাচটা আয়োজন করতেই হতো, তবে কেন তা দুপুর থেকে শুরু করার ‘প্ল্যান বি’ ছিল না? দিনের আলোয় ম্যাচ হলে অন্তত টিকিটের টাকা খরচ করে আসা দর্শকরা খেলা দেখতে পারতেন। কিন্তু বিসিসিআই সম্ভবত মনে করে, দর্শকরা তো আসবেনই, তারা তো আমাদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। এই ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ মনোভাবই বিসিসিআই-এর পতনের কারণ হতে পারে।

অর্থের দম্ভ বনাম সাধারণের আবেগ
ভারতীয় ক্রিকেট প্রেমীদের আবেগকে পুঁজি করে বিসিসিআই আজ বিশ্বের ধনীতম ক্রীড়া সংস্থায় পরিণত হয়েছে। স্পনসরশিপ, ব্রডকাস্ট রাইটস আর আইপিএল-এর হাজার হাজার কোটি টাকা বোর্ডের ভাণ্ডার পূর্ণ করছে। কিন্তু সেই টাকার ঝনঝনানি কি বোর্ড কর্তাদের এতটাই বধির করে দিয়েছে যে তারা সাধারণ মানুষের হাহাকার শুনতে পায় না?

লখনউয়ের ওই ঘন ধোঁয়াশা এবং কুয়াশার চাদর আসলে বিসিসিআই-এর অদূরদর্শিতারই প্রতীক। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বিদেশি দল যখন ভারতে আসে, তখন এই ধরণের অব্যবস্থা দেশের ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করে। বিদেশি ক্রিকেটাররা যখন দেখেন মাস্ক পরে মাঠে নামতে হচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কুয়াশার কারণে খেলা বাতিল হচ্ছে, তখন তারা ভারতের পরিকাঠামো নয়, বরং ভারতীয়দের কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

প্রশ্ন তোলা কি অপরাধ?
বিসিসিআই-এর অন্দরমহলে এখন চাটুকারিতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তাতে ভুল ধরিয়ে দেওয়ার লোক খুব কম। অপারেশনস টিম কি জানত না যে ডিসেম্বরের রাতে লখনউ বা মোহালিতে দৃশ্যমানতা শূন্যে নেমে আসে? যদি জানত, তবে সেই রিপোর্ট কি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছিল? না কি কোনও এক ‘মাস্টার পাপেটিয়ার’ বা অদৃশ্য সুতোর টানে সবটা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়েছিল?
বিশ্বকাপের প্রস্তুতির যে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ভারতের কাছে ছিল, তার মধ্যে একটি এভাবে হেলায় নষ্ট করা ক্রিকেটের প্রতি অবমাননা ছাড়া আর কিছু নয়। বিসিসিআই আজ এতটাই শক্তিশালী যে তারা কোনও সমালোচনার পরোয়া করে না। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এই ক্ষমতা এবং অর্থের উৎস হল সাধারণ সমর্থক।

লখনউয়ের (Lucknow) বিপর্যয় বিসিসিআই-এর গালে এক সপাটে চড়। এটা কোনও দৈব দুর্ঘটনা নয়, বরং এক প্রশাসনিক ব্যর্থতা। ক্রিকেটারদের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এবং দর্শকদের আবেগকে পদদলিত করার এই সংস্কৃতি যদি বন্ধ না হয়, তবে ভারতীয় ক্রিকেট শুধু অন্ধকার কুয়াশাতেই ঢাকা পড়বে।

বিসিসিআই-এর এই চরম গাফিলতির দায় কে নেবে? দায়বদ্ধতা কি কেবল মাঠের ক্রিকেটারদের জন্যই বরাদ্দ? কর্তাদের এসি ঘরের গদি কি এতটাই নিরাপদ যে সেখানে জবাবদিহির কোনও প্রবেশাধিকার নেই? সময় এসেছে এই অন্ধ ক্ষমতার আস্ফালনের বিরুদ্ধে সওয়াল করার। কারণ, ক্রিকেটটা এদেশের মানুষের কাছে নিছক খেলা নয়, এক আবেগ। আর সেই আবেগের অসম্মান করার অধিকার কারও নেই— সে যতই ক্ষমতাশালী বিসিসিআই হোক না কেন।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *