Bangladesh Political Equation | বাংলাদেশের নয়া সমীকরণ: মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর ‘কাল্পনিক শত্রু’র গোলকধাঁধায় একটি রাষ্ট্র

Bangladesh Political Equation | বাংলাদেশের নয়া সমীকরণ: মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর ‘কাল্পনিক শত্রু’র গোলকধাঁধায় একটি রাষ্ট্র

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক : ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছিল বলে মনে করা হয়েছিল। ছাত্র-জনতার উত্তাল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘ দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসনের অবসান ঘটে। ঢাকার রাস্তায় যখন হাজার হাজার মানুষ উল্লাস করছিল, তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন ছিল—এই ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বাংলাদেশকে কোন পথে নিয়ে যাবে? নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন শপথ নেয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। প্রতিশ্রুতি ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের, বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার এবং গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার।

কিন্তু কয়েক মাস পার হওয়ার পর, সেই উচ্ছ্বাসের জায়গা নিচ্ছে এক গভীর অনিশ্চয়তা। মুদ্রাস্ফীতির দাপট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং উগ্রপন্থী শক্তির আস্ফালনে এখন প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি সংস্কারের পথে হাঁটছে, নাকি এক মিথ্যা প্রতিশ্রুতি আর কাল্পনিক শত্রুর গোলকধাঁধায় আটকে পড়ছে? সম্প্রতি একটি সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের এক কলামে যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক কঠোর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখনই কোনও অভ্যন্তরীণ সংকট ঘনীভূত হয়, তখনই ‘ভারত কার্ড’ ব্যবহার করার এক পুরোনো প্রবণতা রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এবং তার সহযোগী ছাত্র আন্দোলনের একাংশের মধ্যে এই প্রবণতা নতুন করে ডানা মেলেছে। ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে পুঁজি করে এখন পুরো ভারতকেই বাংলাদেশের ‘প্রধান শত্রু’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে এখন এক ধরনের ‘প্যারানয়া’ বা অহেতুক ভীতি কাজ করছে। দেশের প্রতিটি সংকটে—সেটা ভয়াবহ বন্যাই হোক কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছুর পেছনে দিল্লির হাত খোঁজা হচ্ছে। ‘ইন্ডিয়া আউট’ ক্যাম্পেইন বা ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক আসলে জনমানুষের দৃষ্টিকে মৌলিক সমস্যা থেকে সরিয়ে দেওয়ার এক রাজনৈতিক কৌশল। যখন চাল-ডালের দাম আকাশচুম্বী হয়, যখন পোশাক শিল্পে অস্থিরতা দেখা দেয়, তখন জনগণের ক্ষোভকে ডাইভার্ট করতে একটি ‘কাল্পনিক শত্রু’র প্রয়োজন হয়। আর ভারত সেই তালিকায় এক নম্বরে। অথচ ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে বৈরিতা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্যই বেশি ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইউনূসের সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ এবং পুলিশ প্রশাসনে আমূল পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্রটি ভিন্ন। বাংলাদেশে এখন আইনশৃঙ্খলার চেয়ে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি প্রথা বেশি কার্যকর বলে মনে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম পর্যন্ত—ন্যায়বিচারের নাম করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

বিগত সরকারের সমর্থক বা সুবিধাভোগী তকমা দিয়ে শিক্ষক, সাংবাদিক এবং পেশাজীবীদের জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হচ্ছে। এই ‘শুদ্ধি অভিযান’ অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। যখন একটি রাষ্ট্র সংস্কারের কথা বলে, তখন সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে আইনের শাসনের বদলে ‘ভয়ের রাজত্ব’ কায়েম হচ্ছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল মানবাধিকার রক্ষার, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে উগ্রপন্থীদের ভয়ে অনেক মুক্তমনা ও উদারবাদী মানুষ আজ নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হল তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কিন্তু গত কয়েক মাসে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে যে পরিমাণ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। শ্রমিক অসন্তোষের আড়ালে বহিরাগতদের উসকানি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে অন্তত ২০০টিরও বেশি কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।

তথ্যানুসারে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে এই পোশাক শিল্প থেকে। এই খাতের অস্থিরতা বিদেশি ক্রেতাদের মনে আস্থার সংকট তৈরি করছে। ক্রেতারা এখন ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার দিকে ঝুঁকছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এখনও কাটেনি। মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যার ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন নাভিশ্বাস উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার বড় বড় সংস্কারের কথা বললেও সাধারণ মানুষের পাতে খাবারের সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রতিশ্রুতি ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণের, কিন্তু সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান। ৫ অগাস্টের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলার অভিযোগ উঠেছে। যদিও সরকার একে ‘রাজনৈতিক’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। শুধুমাত্র ধর্মীয় সংখ্যালঘু নয়, বাংলাদেশের শতাব্দী প্রাচীন সুফি ও বাউল সংস্কৃতিও আজ হুমকির মুখে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজার ভাঙচুর এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাধার সৃষ্টি করা হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে বাংলাদেশে এখন এক মেরুকরণের রাজনীতি চলছে। যারা একাত্তরের চেতনাকে অস্বীকার করছে, তাদের আস্ফালন সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। সরকার যখন এই শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তখন ‘সংস্কারের’ প্রতিশ্রুতি কেবল ফাঁপা বুলি হিসেবেই মনে হয়।

মুহাম্মদ ইউনূস একজন আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, তিনি কি আসলেই রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, নাকি নেপথ্যের কোনও শক্তির ইশারায় কাজ করছেন? একদিকে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের দাবি, অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচন দেওয়ার চাপ—এই দ্বিমুখী সংকটে সরকার দিশেহারা।

জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহযোগী উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো বাংলাদেশে এখন প্রবলভাবে সক্রিয়। তারা দীর্ঘদিনের কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের লোক বসাতে শুরু করেছে। ইউনূস সরকার যদি এই শক্তির কাছে নতিস্বীকার করে, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিজের ইমেজ রক্ষা করা এবং দেশের ভেতরে উগ্রপন্থীদের সামলানো—এই দুই মেরুর টানে সরকার এখন এক ভঙ্গুর অবস্থানে দাঁড়িয়ে।

বাংলাদেশের মানুষ গত ১৫ বছর ধরে ভোটাধিকার বঞ্চিত ছিল। তারা আশা করেছিল, স্বৈরাচারের পতনের পর তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ভোট দিতে পারবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা (Roadmap) এখনো ঘোষণা করেনি। ‘সংস্কার আগে, তারপর নির্বাচন’—এই থিওরি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অরাজনৈতিক সরকার যখন বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে চায়, তখন তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতা দখল করে।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে। এক, সত্যিকার অর্থে সব মত ও পথের মানুষকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন করা এবং দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। দুই, ভারত বা অন্য কোনো দেশকে শত্রু হিসেবে খাড়া করে জাতীয়তাবাদ উসকে দেওয়া এবং সংস্কারের নামে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা। দ্বিতীয় পথটি বেছে নিলে বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবেই দেউলিয়া হবে না, বরং আন্তর্জাতিকভাবেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী বিপ্লব কোনও একটি গোষ্ঠী বা ধর্মের জন্য ছিল না, এটি ছিল সাধারণ মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। কিন্তু সেই ত্যাগের ফল যদি উগ্রপন্থা আর অরাজকতার হাতে চলে যায়, তবে তা হবে এক ট্র্যাজেডি। ‘মিথ্যা প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে জনগণকে বেশিদিন শান্ত রাখা যায় না। কাল্পনিক শত্রুর ভয় দেখিয়ে পেটের ক্ষুধা মেটানো যায় না।

ইউনূসের সরকারকে বুঝতে হবে যে, বাংলাদেশের মানুষের মূল চাহিদা হল স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং জীবনের নিরাপত্তা। ভারত বা অন্য দেশের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন দিয়ে অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলে আখেরে দেশেরই ক্ষতি হবে। বাংলাদেশকে যদি সত্যিই আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়, তবে তাকে উগ্রবাদের শেকল ভেঙে বের হতে হবে এবং গণতন্ত্রের পথে ফিরতে হবে। অন্যথায়, ‘নতুন বাংলাদেশ’ কেবল একটি সুন্দর স্লোগান হয়েই রয়ে যাবে, বাস্তবে তা হবে এক অস্থির ভূখণ্ড।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *