Amit Shah | ভোট-পাখি ২০২৬, শাহর দাওয়াই: দিলীপেই কি বাজিমাত?

Amit Shah | ভোট-পাখি ২০২৬, শাহর দাওয়াই: দিলীপেই কি বাজিমাত?

ব্লগ/BLOG
Spread the love


উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্কঃ কলকাতার রাজপথে যখন কনকনে ঠান্ডার আমেজ, ঠিক তখনই নিউটাউনের এক অভিজাত হোটেলের রুদ্ধদ্বার কক্ষে চলল ২০২৬-এর মহাযুদ্ধের ব্লু-প্রিন্ট তৈরির কাজ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঝটিকা সফর কেবল বাংলার আসন্ন উপনির্বাচনের রণকৌশল সাজাতে নয়, বরং এক গভীর অসুখের ‘সার্জারি’ করতে। বঙ্গ বিজেপির অন্দরে যে অন্তর্কলহ আর নেতৃত্বের টানাপড়েন গত কয়েক বছর ধরে ঘুণপোকার মতো কাজ করছিল, তাতে এবার চাবুক মারলেন দিল্লির ‘চাণক্য’। আর সেই দাওয়াইয়ের প্রধান অঙ্গ হিসেবে ফের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনা হলো বঙ্গ বিজেপির একদা ‘পোস্টার বয়’ দিলীপ ঘোষকে। প্রশ্ন উঠছে, একুশের হারের পর যাঁকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল, সেই ‘দিলীপ-টনিক’-এই কি তবে চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনের ক্ষত সারিয়ে ছাব্বিশের বৈতরণী পার করতে চাইছে পদ্ম শিবির?

দিল্লির বার্তা: এক হও অথবা শেষ হও

অমিত শাহের এবারের বঙ্গ সফরের নির্যাস যদি এক লাইনে বলতে হয়, তবে তা হলো— ‘দলাদলি বন্ধ করো’। দলীয় সূত্রের খবর, শাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয় এখন আর কেবল একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়, বরং বিজেপির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বৈঠকে শাহ যখন কোর কমিটির সদস্য ও জেলা নেতৃত্বদের সঙ্গে বসলেন, তাঁর শরীরী ভাষায় দাপট ছিল স্পষ্ট। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যে নেতার সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ কমছে। সুকান্ত মজুমদার, শুভেন্দু অধিকারী আর দিলীপ ঘোষ— এই তিন ভিন্ন মেরুর নেতৃত্বকে একই টেবিলে বসিয়ে শাহ যে বার্তা দিলেন, তা হলো ‘যৌথ নেতৃত্ব’। বঙ্গ বিজেপির ট্র্যাডিশনাল ‘আদি’ বিজেপি এবং তৃণমূল থেকে আসা ‘নব্য’ বিজেপির মধ্যে যে অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়েছে, তা ভেঙে ফেলাই এখন শাহের প্রধান লক্ষ্য।

এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় চমক অবশ্যই দিলীপ ঘোষের ‘কোর গ্রুপ’-এ ফেরা। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে যখন বিজেপি ১৮টি আসন পেয়েছিল, তখন দলের সেনাপতি ছিলেন এই দিলীপ ঘোষই। তাঁর মেঠো ভাষা, আরএসএস-এর অনুশাসন আর কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ বিজেপিকে বাংলায় এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পর সমীকরণ বদলায়। তাঁকে সরিয়ে সুকান্ত মজুমদারকে সভাপতি করা এবং পরে মেদিনীপুর থেকে সরিয়ে দুর্গাপুরে প্রার্থী করা— অনেক সমালোচকই মনে করেন দিলীপ ঘোষকে সুকৌশলে কোণঠাসা করা হয়েছিল।

কিন্তু চব্বিশের নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ থেকে জঙ্গলমহল— সব জায়গাতেই দেখা গেছে বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে ধস নেমেছে। বিশেষ করে নিচুতলার কর্মীরা অভিযোগ তুলেছিলেন যে, বর্তমান নেতৃত্ব অনেক বেশি ‘স্টুডিও নির্ভর’ হয়ে পড়েছেন। এই শূন্যতা পূরণ করতেই অমিত শাহের নির্দেশে আবার ময়দানি রাজনীতির কারিগর দিলীপকে ময়দানে নামানো হলো। শাহ খুব ভালো করেই জানেন, শুভেন্দু অধিকারীর আক্রমণাত্মক মেজাজ আর সুকান্ত মজুমদারের একাডেমিক ইমেজকে যদি দিলীপের সাংগঠনিক শক্তির সঙ্গে জোড়া না যায়, তবে তৃণমূলের দুর্ভেদ্য সংগঠন ভাঙা সম্ভব নয়।

উত্তরবঙ্গের সমীকরণ ও শাহের পাখির চোখ

উত্তরবঙ্গ বরাবরই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। ২০১৯ বা ২০১৯-পরবর্তী সময়েও এই অঞ্চল দু’হাত উজাড় করে পদ্ম শিবিরকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু ২০২৪-এর ফলাফলে দেখা গেছে, রায়গঞ্জ বা বালুরঘাটের মতো আসনে জয়ের ব্যবধান কমেছে, আর কোচবিহার হাতছাড়া হয়েছে। শাহের বিশেষ নির্দেশে যে নতুন কোর গ্রুপ তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় লক্ষ্য হলো উত্তরবঙ্গের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করা।

দিলীপ ঘোষের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের মানুষের নাড়ির টান পুরোনো। রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে চা-বাগানের শ্রমিক— সবার মধ্যেই দিলীপের একটা আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। নতুন কমিটিতে তাঁকে রাখা এবং উত্তরবঙ্গের সংগঠনকে আরও বেশি আক্রমণাত্মক করার নির্দেশ দেওয়ার অর্থ হলো, বিজেপি চাইছে হিন্দুত্বের আবেগ আর সাংগঠনিক শক্তিকে ফের উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গে ছড়িয়ে দিতে। শাহের নির্দেশে এবার জেলা সফর এবং ‘প্রবাস’ কর্মসূচির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যার কেন্দ্রে থাকবে উত্তরবঙ্গের আটটি জেলা।

অমিত শাহ যে নতুন ১৫ জনের কোর গ্রুপ গড়ে দিয়েছেন, তার কাজ হবে প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা। এখানে সুকান্ত মজুমদার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব সামলাবেন, শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী দলনেতা হিসেবে বিধানসভা ও জনসভায় ঝোড়ো ব্যাটিং করবেন, আর দিলীপ ঘোষ দেখবেন সংগঠনের বুনিয়াদ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— এই তিন ‘হেভিওয়েট’ নেতা কি সত্যিই ব্যক্তিগত ইগো বিসর্জন দিয়ে এক ছাতার তলায় কাজ করতে পারবেন?

তৃণমূল যখন একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগে কোণঠাসা, তখনও বিজেপি কেন রাস্তায় নেমে চূড়ান্ত সুবিধা নিতে পারছে না, তা নিয়ে শাহ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ইস্যু অনেক থাকলেও সংহতির অভাবে বিজেপি পিছিয়ে পড়ছে। শাহ স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কোনো নেতার অনুগামী হওয়া চলবে না, হতে হবে দলের অনুগামী।

তৃণমূলের পাল্টা চাল ও বিজেপির ঝুঁকি

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শাহের এই চাল লক্ষ্য করছে। বিজেপি যখন পুরোনো লড়াকু মুখদের ফিরিয়ে আনছে, তৃণমূল তখন ‘বার্ধক্য বনাম তারুণ্য’ তত্ত্বে শান দিচ্ছে। তবে দিলীপ ঘোষের ফেরা তৃণমূলের জন্য চিন্তার কারণ হতে পারে, কারণ দিলীপ সেই নেতা যিনি তৃণমূলের মেঠো রাজনীতির কায়দাতেই পাল্টা উত্তর দিতে অভ্যস্ত।

তবে বিজেপির জন্য ঝুঁকিও কম নয়। যদি এই নতুন কোর গ্রুপের মধ্যেও দলাদলি চলতে থাকে, তবে ২০২৬ সালে বাংলায় বিজেপির পতন অনিবার্য। শাহ সেই কারণেই হয়তো ব্যক্তিগতভাবে নিয়মিত মনিটরিং করার কথা বলেছেন। দিল্লির সরাসরি তত্ত্বাবধানে বঙ্গ বিজেপি পরিচালিত হওয়া মানেই হলো, স্থানীয় নেতাদের ডানা ছাঁটা হলো কি না, সেই বিতর্কও উঠতে বাধ্য।

লড়াই এখন অস্তিত্বের

অমিত শাহের এই বৈঠকের পর বঙ্গ বিজেপির অন্দরে একটা বার্তা পরিষ্কার— ‘পারফরম্যান্স না করলে পদ নয়’। দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নেতার ফেরা নয়, বরং বিজেপির সেই পুরোনো আগ্রাসী মেজাজে ফেরার ইঙ্গিত। ২০২৬ সালের নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। শাহ যে টনিক দিয়ে গেলেন, তা কি বঙ্গ বিজেপির শরীরে নতুন রক্ত সঞ্চার করবে? না কি আদি আর নব্যের দ্বন্দ্বে সেই চাণক্য-নীতিও ব্যর্থ হবে?

উত্তরবঙ্গের চা-বাগান থেকে শুরু করে গঙ্গার পাড়— সর্বত্রই এখন চর্চায় ‘শাহ-দিলীপ’ যুগলবন্দি। চব্বিশের ব্যর্থতা ভুলে ছাব্বিশে নবান্ন দখলের স্বপ্ন দেখছে বিজেপি। আর সেই স্বপ্নের সোপান হিসেবে তারা বেছে নিল তাদের সবচেয়ে বিতর্কিত অথচ লড়াকু সেনাপতিকেই। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই, কিন্তু শাহের এই দাওয়াই যে বঙ্গ বিজেপির অন্তিম সুযোগ, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। লড়াইটা এখন আর কেবল ক্ষমতার নয়, লড়াইটা হলো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার। আর সেই লড়াইয়ে দিলীপ ঘোষের ‘প্রত্যাবর্তন’ কতটা কার্যকরী হয়, তার উত্তর দেবে সময়। তবে এটুকু নিশ্চিত, বাংলার রাজনৈতিক পিচে এবার বাউন্সার আর ইয়র্কারের সংখ্যা আরও বাড়তে চলেছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *