উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক : ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে আছড়ে পড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি কেবল দেড়শো শিশুর প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং এটি গত ৪৭ বছর ধরে চলে আসা এক ‘অঘোষিত’ সামরিক সংঘাতের দগদগে ক্ষতকে পুনরায় উন্মুক্ত করেছে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে যে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে, তা আসলে কোনো নতুন যুদ্ধ নয়, বরং ১৯৮০-এর দশক থেকে চলে আসা ওয়াশিংটন বনাম তেহরানের দীর্ঘ লড়াইয়ের (America Iran Battle) এক চূড়ান্ত ও ভয়ংকর অধ্যায়।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: চ্যুতি ও ভ্রান্তি
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যায়, দুই দেশের এই শত্রুতার মাশুল বারবার দিয়েছে সাধারণ মানুষ। ১৯৭৯ সালে ইরানি ছাত্ররা মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালিয়ে ৫২ জন কূটনীতিককে ৪৪৪ দিন বন্দি করে রেখেছিল (1979 Hostage Disaster)। ১৯৮৮ সালে মার্কিন রণতরী ‘ভিনসেন্স’ ভুলবশত ইরানের যাত্রীবাহী বিমান নামিয়ে ২৯০ জনকে হত্যা করেছিল। ঠিক একই ছায়ায় ২০২০ সালে কাসেম সোলেমানির মৃত্যুর পর চরম উত্তেজনার মাঝে ইরান ভুল করে ইউক্রেনীয় বিমান ভূপাতিত করে। ২০২৬ সালের এই বর্তমান সংঘাত আসলে সেই পুরনো ভুলেরই এক নৃশংস ধারাবাহিকতা, যেখানে শান্তির চেয়ে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি প্রবল।
রণকৌশলের পরিবর্তন: সমুদ্র থেকে ছায়াযুদ্ধ
আশির দশকে পারস্য উপসাগরে ‘ট্যাঙ্কার ওয়ার’ বা তেলবাহী জাহাজের লড়াই ছিল এই যুদ্ধের প্রধান রূপ। কিন্তু ২০০০-এর দশকের শুরুতে জর্জ বুশের ‘শয়তানের অক্ষ’ (Axis of Evil) তত্ত্বের পর এই লড়াই ইরাক ও আফগানিস্তানের মাটিতে ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধে রূপ নেয়। ওবামা জমানায় পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে বরফ গলার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা নীতি সেই প্রচেষ্টাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। ২০২০ সালে সোলেমানি এবং ২০২৬-এ খামেনেইর হত্যাকাণ্ড এই যুদ্ধকে সরাসরি রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সংঘাতে উন্নীত করেছে।
কূটনীতির ব্যর্থতা ও বর্তমান মহাপ্রলয়
বাইডেন প্রশাসনের সামনে সুযোগ ছিল এই দীর্ঘ যুদ্ধের অবসান ঘটানোর, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, ইজরায়েলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গেছে। অতীতে দুই দেশ বড় ধরনের উত্তেজনা সত্ত্বেও একটি সীমা বজায় রাখত, কিন্তু খামেনেইর মৃত্যুর পর সেই ভারসাম্য এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এখন যে ইরানি পালটা আক্রমণ (Trump vs Iran) চলছে, তা কি তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস? উত্তর লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এই অন্তহীন ধ্বংসলীলার মধ্যেই।
