দামিনী সাহা, আলিপুরদুয়ার: কাগজে-কলমে তিনি আলিপুরদুয়ার পুরসভার (Alipurduar Municipality) নৈশপ্রহরী। দায়িত্ব- রাতভর পুরসভা ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই কাজের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে প্রতি মাসে নিয়মিত বেতনও তোলেন। কিন্তু অভিযোগ, রাতের বেলায় পুরসভায় তাঁকে কোনওদিন দেখেননি কর্মীরা। বরং সেই সময়ে তাঁকে দেখা যায় পাড়ার চায়ের দোকানে, তৃণমূলের পার্টি অফিসে কিংবা দলীয় বিভিন্ন মিটিং-মিছিলে সক্রিয় ভূমিকায়। সরকারি চাকরি এক জায়গায়, সক্রিয়তা অন্যত্র- সিন্টু করের এই দ্বৈত ভূমিকা নিয়েই এখন সরগরম পুরসভা চত্বর।
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে তিনজন গ্রুপ-ডি কর্মী ৮ ঘণ্টা করে তিনটি শিফটে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ২টো, দুপুর ২টো থেকে রাত ১০টা এবং রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা। রাতের শিফটে একজন স্থায়ী কর্মীর সঙ্গে থাকেন এক ক্যাজুয়াল কর্মীও। অভিযোগ উঠেছে, রাতের শিফট তো দূরের কথা, কোনও শিফটেই তৃণমূলের সক্রিয় সদস্য সিন্টুকে দেখা যায় না। অথচ অ্যাটেনড্যান্স রেজিস্টারে তঁার সই থাকে, মাসের শেষে বেতনও তোলা হয় নিয়মমাফিক।
এতেই শেষ নয়। নাইটগার্ড হলেও দিনেরবেলায় পুরসভায় এসে ‘হম্বিতম্বি’ করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। প্রশ্ন উঠছে, রাতের ডিউটি এড়িয়ে দিনের উপস্থিতি কি শুধুই প্রভাব খাটানোর জন্য?
অভিযোগ কার্যত স্বীকার করে নানা যুক্তি দিয়েছেন সিন্টু। তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ১০ বছর ধরে আলিপুরদুয়ার পুরসভার নাইটগার্ড হিসেবে কাজ করছি। তবে কাজের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান আমাকে যে দায়িত্ব দেন, আমি সেটাই পালন করি। আমাদের এখানে নিয়মই হল, চেয়ারম্যান যেভাবে বলবেন, সেভাবেই কাজ করতে হবে। বর্তমানে আমি ‘হাউসিং ফর অল’ প্রকল্পের বাড়িগুলোর জিও ট্যাগিংয়ের কাজ করছি। এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি ক্যাম্পে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেগুলোও করি।’
এখানেই প্রশ্ন। জিও ট্যাগিংয়ের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়— প্রতি ট্যাগিংয়ের ভিত্তিতে অর্থ মেলে। ক্যাম্পের ক্ষেত্রেও মাসিক বেতনের পাশাপাশি অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা রয়েছে বলে পুরসভা সূত্রে দাবি। তাহলে কি একদিকে নাইটগার্ডের স্থায়ী বেতন, অন্যদিকে অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক- দুই দিক থেকেই অর্থপ্রাপ্তি? সরকারি নিয়ম কি তা অনুমোদন করে? নাকি এটি প্রশাসনিক নমনীয়তার আড়ালে সুবিধাভোগ?
পুরসভার অন্দরমহলে অসন্তোষ থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চাইছেন না। কারণ, সিন্টু চেয়ারম্যানের ‘খাস লোক’। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে কথা বললে প্রশাসনিক রোষের মুখে পড়তে হতে পারে এমন আশঙ্কাই কর্মীদের নীরব রেখেছে।
পুরসভার এক ক্যাজুয়াল কর্মী বলেন, ‘আমরা অনেক কম বেতন পাই। এক সময় বলা হয়েছিল এই ধরনের কাজ মানবিকভাবে আমাদের দেওয়া হবে। যদিও এক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক কিছু নেই। চেয়ারম্যানের ইচ্ছামতো কাজ দিচ্ছেন।’
চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ করের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসার ইউজেন মোক্তান বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে যোগ দিয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে।’
আলিপুরদুয়ার পুরসভার পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি নিয়ে সুর চড়াচ্ছে বিরোধীরা। পুরসভার বিরোধী দলনেতা তথা ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার শান্তনু দেবনাথ বলেন, ‘আমি তো এই প্রথম জানলাম যে তিনি নাইটগার্ড। ওঁকে তো দিনেরবেলায় প্রায়ই পুরসভায় ঘোরাফেরা করতে দেখি। যেখানে সাধারণ কর্মীর বিরুদ্ধে সামান্য গাফিলতিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয় সেখানে বছরের পর বছর এই অনিয়মের অভিযোগ, অথচ প্রশাসন নীরব কেন? এ বিষয়ে চেয়ারম্যানই ভালো বলতে পারবেন।’
সিপিএমের জেলা সভা সম্পাদক কিশোর দাস মনে করছেন, এটা পুর প্রশাসনিক শৃঙ্খলার চরম অবক্ষয়। কাজ না করেই বেতন নেওয়াতেই তো দুর্নীতির গন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে সবাই ভাগ পান বলেই চুপ করে রয়েছেন। এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি। কংগ্রেসের জেলা সভাপতি মৃন্ময় সরকার বলেন, ‘এটা প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ। পুরসভা কি দলীয় কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে? নাইটগার্ডের কাজ না করেও বেতন তোলা যদি স্বাভাবিক হয়, তবে স্বচ্ছতা কোথায়? দুর্নীতির চরম সীমায় চলে গিয়েছে পুরসভা। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
অভিযোগ প্রমাণিত হোক বা না হোক, বিষয়টি প্রশাসনিক স্বচ্ছতার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। তদন্ত হবে না কি নীরবতার আড়ালে সব চাপা পড়ে যাবে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে শহরবাসী।
