Alipurduar | সবুজ গালিচায় ঢাকা বিষাদ! চা বাগান থেকে চাষের জমি— বঞ্চনা আর ক্ষোভের অন্তরালে ভোটের নতুন অঙ্ক

Alipurduar | সবুজ গালিচায় ঢাকা বিষাদ! চা বাগান থেকে চাষের জমি— বঞ্চনা আর ক্ষোভের অন্তরালে ভোটের নতুন অঙ্ক

শিক্ষা
Spread the love


প্রতিটি বিধানসভা এলাকা একেকটি জীবন্ত জনপদ। তার নিজস্ব রয়াসন আছে। একেক বিধানসভায় রাজনীতির বোঝাপড়া একেকরকম। আজ নজরে কুমারগ্রাম

রাজু সাহা ও নৃসিংহপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, শামুকতলা ও কুমারগ্রাম: চা বাগানের সবুজ গালিচায় মন জুড়িয়ে যায়। উত্তরবঙ্গের বাইরে থেকে কেউ বেড়াতে এলে মুগ্ধ হয়ে যান। দুটি পাতা একটি কুঁড়ি নিয়ে কতই না গান, কবিতা। গত ডিসেম্বরের শেষে কলকাতা থেকে আসা এক সাহিত্যিকও চা বাগান ঘুরতে ঘুরতে নানা কবিতা ও গল্পের প্লট মনে সাজিয়ে ফেলছিলেন।

ধাক্কা খেলেন কোহিনুর ও তুরতুরি চা বাগানে গিয়ে। আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) জেলার প্রত্যন্ত এলাকার ওই বাগানগুলির শ্রমিকদের কথায় শুধুই বিষাদ। অভিযোগ, সমস্যা, উপেক্ষার কাহিনী শুনতে শুনতে সাহিত্যিকের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘এত বঞ্চনায় আপনাদের জীবন চলে কীভাবে? কোহিনুর বাগানের এক মহিলা শ্রমিক তাঁকে বললেন, ‘মালিকপক্ষ আমাদের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে। আমরা নিরুপায় হয়ে মালিকের শর্ত মেনে কাজ করছি শুধু পেটের খিদেটুকু মেটানোর জন্য।’

কী সেই শর্ত? বাগানের ফ্যাক্টরি গেটের সামনে জটলায় দাঁড়ানো শ্রমিকদের কাছে জানা গেল, মালিকের কাছে মজুরি, পিএফ, গ্র্যাচুইটি, বোনাস ইত্যাদি বাবদ তাঁদের কোটি কোটি টাকা পাওনা। অথচ সেই প্রাপ্য নিয়ে তাঁরা আন্দোলন করতে পারবেন না বলে মালিকপক্ষ মুচলেকা আদায় করে রেখেছে। এক শ্রমিক বললেন, ‘চুক্তিতে সই করতে আমাদের বাধ্য করেছে। মজুরি ছাড়া আর কিছু পাই না আমরা।’

অথচ শ্রম আইন আছে। সেই আইন মালিকরা ভাঙলেও নেতা-মন্ত্রীরা নীরব। কাজে যেতে যেতে একজন বলে গেলেন, ‘আমাদের নিয়ে শুধু ভোটের অঙ্ক কষা হয়।’ কিছুক্ষণ পর ওই বাগানের বাজারে একটি দোকানে চা খেতে খেতে কলকাতার ওই সাহিত্যিকের কথায় বিষণ্ণতার সুর, ‘দূর থেকে বাগান দেখে চলে গেলে চা শ্রমিকদের এমন দুর্দশা জানতেই পারতাম না। জানতাম, উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি চা শিল্পের উপর দাঁড়িয়ে। অথচ চা শ্রমিকদের কী দুর্দশা!’

বছরের শেষ ও নতুন বছরের প্রথম কয়েকদিন তেমন রোদ ছিল না। কুয়াশায় ঢাকা চারদিক। শামুকতলা বাজারের কাছে ঢিপধুরায় প্রবল শীতের মধ্যেই পাম্প চালিয়ে জমিতে সেচের জল দিচ্ছিলেন এক চাষি। দেখে তাঁর পরিচিত এক সাইকেল আরোহী খেতের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পাম্প ছাড়া গতি নেই বুঝি।’ দীর্ঘশ্বাস পড়ল চাষির। তাঁর কথায়, ‘আমাদের অদৃষ্টের লিখন।’

এমন অদৃষ্ট কেন? তিনি জানালেন গারোখুটার স্লুইস গেট দিয়ে এ জীবনে আর সেচের জল পাওয়া ভাগ্যে নেই। ১৯৯৩-এর বন্যায় তুরতুরি নদীর বাঁধ ভাঙার পর অবৈজ্ঞানিকভাবে কয়েকবার নির্মাণ হলেও বর্ষা এলেই বাঁধ ভেসে যায়। ফলে কয়েক হাজার চাষি সেচের জল থেকে বঞ্চিত। শুধু ভোট এলে বাঁধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি মেলে। চাষি বলছিলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে ভোট দিই। ভোট গেলে সব ফাঁকা।’

এলাকাটি কুমারগ্রাম (Kumargram) বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে। এই কেন্দ্রের পূর্ব দিকে বারবিশায় চা দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলেন কয়েকজন ছোটখাটো ব্যবসায়ী। তাঁদেরই একজনের কথায়, ‘শাসকদলের স্থানীয় নেতাদের মাতব্বরিতে শান্তিতে ব্যবসা করার আর জো নেই। আজ এই অনুষ্ঠানের জন্য তো কাল অমুক কর্মসূচির নাম করে চাঁদার চাপ।’

আরেকজন ফুট কাটলেন, ‘অথচ এই দল করে কয়েক বছরে ওই নেতাদের আঙুল ফুলে কলা গাছ।’ অথচ কুমারগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্রে উন্নয়ন একেবারে হয়নি বলা যাবে না। শামুকতলায় কলেজ, থানা হয়েছে। দমকলকেন্দ্র হচ্ছে। হাটগুলির পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। প্রচুর রাস্তাঘাট, কালভার্ট, বাঁধ হয়েছে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী মিলছে।

কিন্তু এই বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাণ চা বাগানগুলির পরিস্থিতি দিন-দিন খারাপ হচ্ছে। কৃষকদের দুরবস্থা বাড়ছে। সারের কালোবাজারি হচ্ছে। আকাশছোঁয়া দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে সার। ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। বহুমুখী হিমঘর আজও হল না। তার ওপর কর্মসংস্থান নেই। হাজার হাজার তরুণ ভিনরাজ্যে কাজের খোঁজে চলে যাচ্ছেন।

অতীতের লাল দুর্গ কুমারগ্রাম। পালাবদলের পর ২০১৬-তে তৃণমূলের দখলে এলেও বামফ্রন্ট ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে যোগ দেওয়া মনোজকুমার ওরাওঁ এখন এলাকার বিধায়ক। কুমারগ্রাম কেন্দ্রে গত লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপির পক্ষে ঢালাও ভোট পড়েছে। পরিস্থিতি বদলাতে তৃণমূল ঝাঁপিয়ে পড়লেও সাফল্যের কাঁটা তীব্র গোষ্ঠীকোন্দল।

মাত্র কিছুদিন হল বুথ, অঞ্চল এবং ব্লক স্তরে সাংগঠনিক পদে রদবদল করেছে তৃণমূল। যাঁদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। অপসারিত চেয়ারম্যান, সভাপতি সহ বিভিন্ন পদাধিকারী ও তাঁদের অনুগামীরা শেষপর্যন্ত কোন শিবিরে খেলবেন, তা অনিশ্চিত। অন্যদিকে, যেটুকু উন্নয়ন হচ্ছে, তাতে দুর্নীতির উদাহরণ প্রচুর।

এই কেন্দ্রের ভূমিপুত্র রাজবংশীরা। কামতাপুর আন্দোলনের (Kamtapur Motion) সূত্রপাত এই মাটি থেকেই। নতুন করে আলাদা রাজ্য বা স্বায়ত্তশাসনের দাবি দানা বাঁধছে। নতুন উদ্যমে মাঠে নেমেছে কামতাপুর স্টেট ডিমান্ড কাউন্সিল (কেএসডিসি)। কুমারগ্রামে কান পাতলেই বোঝা যাচ্ছে, ফের একজোট হচ্ছেন রাজবংশীরা।

স্বায়ত্তশাসনের স্বপ্ন পূরণে ভূমিপুত্রদের ভোট প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার দিকে ঝুঁকবে বলে চর্চা চলছে। দিল্লিতে জীবন সিংহের সঙ্গে কেন্দ্রের বৈঠক উৎসাহ বাড়িয়েছে ভূমিপুত্রদের। যা তৃণমূলের মাথাব্যথার কারণ। তবে কামতাপুরি সংগঠনগুলি আলাদা প্রার্থী দেবে বলেও শোনা যাচ্ছে। সেটা হলে ভোটের অঙ্ক বদলে যাবে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *