সমীর দাস, হাসিমারা: ‘রাতে দেওয়াল টপকে কেউ যদি ঘরে ঢুকে পড়ে, তখন আমাদের কী অবস্থা হবে বলো তো?’ চোখ গোল গোল করে জানতে চায় আদিত্য। সংসারের ‘অভিভাবক’ রাহুলের গলাতেও খুব একটা ভরসার ছাপ মেলে না। অন্ধকারে ভাঙাচোরা বাড়িটাকে ভয় পায় সেও। আসলে যে বয়সে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, সেই বয়সেই রাহুল এখন পরিবারের প্রধান। হাতে খেলনা থাকার বদলে বারো বছরের রাহুলের দু’কাঁধে এখন তিন ভাইবোনের দায়িত্ব। তাদের ভালোবাসার বন্ধন ভাইবোনের সম্পর্কের থেকে আরও বেশি উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছে।
আলিপুরদুয়ার (Alipurduar) জেলার বন্ধ মধু চা বাগানের মুন্সি লাইনের কিশোর রাহুল ইন্দোয়ারের জীবন যেন কোনও সিনেমার করুণ গল্পকেও হার মানায়। পাঁচ বছর আগে বাবা মাংনা ইন্দোয়ার মারা যান। তখন রাহুল ও তার ভাই খুবই ছোট। বাবার স্মৃতি তাদের মনে নেই বললেই চলে। এরপর বছর তিনেক আগে মা বইজু চার সন্তানকে ফেলে রেখে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। সেই থেকেই শুরু হয়েছে রাহুল, তার সাত বছরের ভাই আদিত্য এবং দুই দিদি সোহিনী ও মোহিনীর এক লড়াইয়ের জীবন। তবে রাত বাড়লেই ভয় বাড়ে। ভাঙাচোরা বাড়িতে চার ভাইবোনের রাত কাটে চরম আতঙ্কে। দরজার পাল্লা ঠিকমতো বন্ধ হয় না। রাহুল ভয় মাখা গলায় বলল, ‘রাতে মনে হয় কেউ দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকবে। তখন আমরা চারজন ভয়ে নিজেদের জড়িয়ে ধরে চুপ করে শুয়ে থাকি।’
বর্তমানে রাহুল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। বড় দুই দিদিও পড়াশোনা করছে। অভাব থাকলেও তারা কেউই কিন্তু স্কুল ছাড়েনি। প্রত্যেকেই বাগানের মধু টিই হাইস্কুলে পড়ে আর ছোট ভাই আদিত্য পড়ে শিশুশিক্ষাকেন্দ্রে। তাদের বাড়ির উলটোদিকে থাকেন জেঠু ভোডা ইন্দোয়ার ও জেঠিমা লবিতা। তাঁরা রাহুলদের কিছুটা দেখাশোনা করেন। রাহুল সাবলীল কণ্ঠে বলে, ‘জেঠু-জেঠিমা তো জঙ্গলে ঘাস কাটতে যায়। সকালে বের হয়ে ফেরে সন্ধ্যায়। দুপুরে তো ওরা বাড়িতেই থাকে না, কে খাবার দেবে বলো?’
অনেক সময় আধপেটা খেয়ে কাটাতে হয়। স্কুল খোলা থাকলে মিড-ডে মিলের খাবারই তাদের ভরসা। মধু টিই হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক আশিস ভট্টাচার্য বলেন, ‘ওদের পড়াশোনা এবং মিড-ডে মিলের দিকে আমরা সব সময় বিশেষ নজর রাখি।’
রাহুলদের পিসি দিল্লি থেকে মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠান। এই শিশুদের জন্য যেন নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন পিসি ধর্মী ইন্দোয়ার। ভাইপো-ভাইঝিদের বড় করার জন্য তিনি বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দিল্লি থেকে ফোনে তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের তরফে একটা পাকা ঘর বানিয়ে দিলে ছেলেমেয়েরা একটু নিরাপদে থাকতে পারত।’ শেষপর্যন্ত না মিলেছে আবাস যোজনার ঘর, না রয়েছে রাহুলদের নামে র্যাশন কার্ড। ধর্মী বলছিলেন, ‘র্যাশন কার্ড থাকলেও খাবারের অনেক সুবিধা হত।’
এদিকে গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ইসদোর খাড়িয়া বলেন, ‘ওরা তো অপ্রাপ্তবয়স্ক, সরাসরি আবাস যোজনার ঘর দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরবর্তীতে ওদের কোনও অভিভাবকের নাম যাতে তালিকায় আসে, সেই চেষ্টা করব।’
