দামিনী সাহা, আলিপুরদুয়ার: ঢাকঢোল পিটিয়ে উদ্বোধন, পরিবেশবান্ধব শহরের স্বপ্ন আর বড় বড় আশ্বাস—সব মিলিয়ে একসময় প্রত্যাশার পারদ চড়েছিল। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দেখা যাচ্ছে ছবিটা সম্পূর্ণ উলটো। পুরসভার সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প আজ কার্যত ধুঁকছে বকেয়া টাকা, কাঁচামালের অভাব এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে।
সূত্রের খবর, প্রকল্পে নিযুক্ত বেসরকারি সংস্থার প্রায় ৩০ লক্ষ টাকারও বেশি বকেয়া রয়েছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে ‘প্রসেসিং’ খরচ ও অন্যান্য কিছু খরচ মেটানোর কথা থাকলেও সেই অর্থ না মেলায় সংস্থাটি আর্থিক সংকটে জর্জরিত। নিয়মিত প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কমছে আর প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ক্রমশ ভেস্তে যাচ্ছে। এই ব্যাপারে আলিপুরদুয়ার পুরসভার চেয়ারম্যান প্রসেনজিৎ কর বলেন, ‘শহর সংলগ্ন চারটি অঞ্চলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তাদের তরফে প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হলেই কাজ শুরু হবে। অন্যান্য জায়গা থেকেও বর্জ্য সংগ্রহ করার বিষয়ে আমাদের প্রচেষ্টা চলছে।’ কোচবিহার পুর এলাকার বর্জ্যও এখানে আনা হবে বলে পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছিল। কিন্তু পুরসভার চেয়ারম্যান এই ব্যাপারে স্পষ্ট করে করে কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
২০২৪ সালের শুরুতে এই প্রকল্পের সূচনা হয় শহরের (Alipurduar) বর্জ্য বৈজ্ঞানিকভাবে প্রক্রিয়াকরণের লক্ষ্য নিয়ে। পরিকল্পনা ছিল, প্রতিদিন প্রায় ২১ টন জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ করে জৈব সার তৈরি করা হবে। অপচনশীল বা ‘ড্রাই ওয়েস্ট’ বাইরে পাঠিয়ে ‘রিসাইক্লিংয়ের’ ব্যবস্থা করা হবে। ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে ড্রাই ওয়েস্ট প্রসেসিং ইউনিট গড়ে তোলার কথাও ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেই সব প্রতিশ্রুতি আজ কাগজে-কলমেই রয়ে গিয়েছে।
বাস্তবে প্ল্যান্টে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৭ টন বর্জ্য পৌঁছাচ্ছে। ক্ষমতা অনুযায়ী এক-তৃতীয়াংশও ব্যবহার হচ্ছে না। যে কারণে উৎপাদন একেবারেই কম হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, যেখানে পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহই নিশ্চিত করা যায়নি, সেখানে এত বড় প্রকল্প ঘোষণার তাড়াহুড়ো কেন?
রাজ্য নগর উন্নয়ন সংস্থা, আলিপুরদুয়ার পুরসভা (Alipurduar Municipality) ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সেই বেসরকারি সংস্থার এই ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে প্ল্যান্টে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পুরসভার। প্রক্রিয়াকরণের পরিকাঠামো গড়ে তোলার দায়িত্ব বেসরকারি সংস্থার। আর প্রসেসিং খরচ বহনের কথা সুডা-র। উৎপাদিত জৈব সার বিক্রির লাভ সংস্থার প্রাপ্য। কিন্তু এই ত্রিপাক্ষিক কাঠামো কার্যত সমন্বয়ের অভাবে ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ। বর্জ্যের ঘাটতি মেটাতে ২০২৫ সালের জুন মাসে আলিপুরদুয়ার পুরসভার সঙ্গে ৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়। পরিকল্পনা ছিল, শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চল থেকেও বর্জ্য এনে তা পৃথকীকরণ করে প্ল্যান্টে পাঠানো হবে। কিন্তু আট মাস পেরিয়েও বাস্তবে সেই উদ্যোগ কার্যকরী হয়নি।
শুধু তাই নয়, ফালাকাটা, জয়গাঁ সহ আরও অন্যান্য জায়গা থেকেও বর্জ্য আনার কথা ছিল। কিন্তু সেগুলিও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বেসরকারি সংস্থার এক কর্মী বলেন, ‘পর্যাপ্ত কাঁচামাল না পেলে জৈব সার উৎপাদন টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। বর্জ্য কম আসায় মেশিনের পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না, উৎপাদন কমছে, আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। তার উপর বকেয়া টাকার বোঝা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে চললে প্ল্যান্ট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে আমাদের আশঙ্কা।’
