অনির্বাণ নাগ
গণতন্ত্রে হিংসার স্থান নেই- একথা সকলে জানি। কিন্তু মানি কি? অন্তত এই বঙ্গে? গত কয়েক দশকের নির্বাচনে বঙ্গবাসী শুধু দেখেছে লাগামহীন হিংসা, দ্বেষ, পেশিশক্তির আস্ফালন। কী নির্বাচন কমিশন, কী দেশের সর্বোচ্চ আদালত- হিংসা রোধে ব্যর্থ দুই প্রতিষ্ঠানই।
‘বাসের হাতল কেউ দ্রুত পায়ে ছুঁতে এলে, আগে তাকে প্রশ্ন করো তুমি কোন্ দলে/ ভুখা মুখে ভরা গ্রাস তুলে ধরবার আগে, প্রশ্ন করো তুমি কোন্ দলে/ আত্মঘাতী ফাঁস থেকে বাসি শব খুলে এনে, কানে কানে প্রশ্ন করো তুমি কোন্ দল/ রাতে ঘুমোবার আগে ভালোবাসার আগে, প্রশ্ন করো কোন্ দল তুমি কোন্ দল…’- শঙ্খ ঘোষের এই ‘তুমি কোন্ দল’ কবিতাটি স্পষ্ট করে দেয় বাংলার নির্বাচনি প্রচারে শান্তি ক্রমশ অপস্রিয়মাণ, বাতাসে হিংসার প্রবল দাপট।
শঙ্খ ঘোষ কবিতাটি লিখেছিলেন নয়ের দশকের মাঝামাঝি। বামেদের অঙ্গুলিহেলন ছাড়া তখন গাছের একটি পাতাও নড়ে না। তারপর তিন দশক পার। সরকার বদল হয়েছে। হিংসার বদল হয়নি। বস্তুত ১৯৭২ থেকেই পশ্চিমবঙ্গে ভোট মানে রক্তস্নাত অধ্যায়। ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচনোত্তর সন্ত্রাস আরও ব্যাপক হয়।
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জীবনে পার্টি বা পার্টি-রাজনীতি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। মানুষে মানুষে সম্পর্কের রসায়নও যখন নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক রঙের সূত্রে, তখন গ্রামীণ জীবন শুধু নয়, তথাকথিত শিক্ষিত সমাজও গোপন হিংসার ছুরিতে শান দেয় মুখে হাসি রেখে। এভাবেই রাজনৈতিক হিংসার বিষে নীল হয়ে যাচ্ছে বঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
কিন্তু কেন পশ্চিমবঙ্গেই রাজনৈতিক হিংসা এত বেশি? কেন ভারতের অন্য রাজ্যের তুলনায় বাংলায় রাজনীতি ও নির্বাচন এত বেশি রক্তাক্ত? কেন নেতারা হিংসায় শান্তির জল না ঢেলে উলটে উসকে দেন বিদ্বেষের আগুন? শিক্ষিত, মার্জিত, সংস্কৃতিমান বলে যে বাঙালির পরিচয় বিশ্বজুড়ে, তারা রাজনীতিতে এত হিংস্র কেন? প্রশ্নগুলোর উত্তর অনেক। তার মধ্যে জোরালো উত্তরটা হল, রাজনীতি এখন একশ্রেণির মানুষের আবেগ বা নেশা নয়, পেশায় পরিণত হয়েছে।
তাই ক্ষমতা দখলের জন্য যে কোনও প্রশ্নচিহ্নকে উপড়ে ফেলার তাগিদ ভয়ংকর। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রে কোনও কোনও নেতা তাঁকে ভোট না দেওয়ার জন্য কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। অথচ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর যাঁরা তাঁকে ভোট দেননি, তিনি তাঁদেরও প্রতিনিধি, তাঁদেরও স্বার্থের রক্ষক। তাঁরাও তাঁর বৃহত্তর পরিবারের অংশ। পারবেন তিনি নিজের পরিবারকে কেটে ভাসিয়ে দিতে?
নির্বাচনি লড়াইয়ে জেতার পরে শাসকদলের বিজয় মিছিল থেকে ছোড়া বোমায় নাবালিকার মৃত্যু হয়। সে তো কোনও দলের ছিল না। অথচ তাকে রাজনৈতিক হিংসার বলি হতে হল। কোনও নেতা যখন ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ বলে ইসলামোফোবিয়ার শ্বাসরোধকারী তীব্র কটুগন্ধ ছড়িয়ে ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন দেখেন, তখন সেই হিংসার গ্যাসচেম্বারে কিন্তু হিন্দু, মুসলমান- উভয়েই পুড়ে ছাই হয়!
রাজনৈতিক হিংসাকে ‘জাস্টিফাই’ না করলেও ‘ডিফেন্স’ করার প্রবণতা এখন সব দলের। অভিযুক্ত নিজ দলের প্রভাবশালী হলে বঙ্গের নেতারা যখন টিভির টক তামাশায় মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন, তখন সেটা হিংসায় প্ররোচনা দেওয়ার শামিল হয়। নেতাই থেকে ছোট আঙারিয়া, উন্নাও থেকে হাথরস, কালীগঞ্জ থেকে সামশেরগঞ্জ- এই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।
ডিফেন্স মেকানিজম এখন প্রত্যেক দলের মুখপাত্রদের কৌশল। হিংসার অভিযোগ নিজের দলের বিরুদ্ধে গেলে তিনি আশ্চর্যরকম চুপ আর অন্য দলের বিরুদ্ধে গেলে ভয়ানক রকম সরব। নির্বাচনি সভার ভাষণে কোনওরকম উসকানি আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে বারুদের স্তূপের উপর বসে থাকা এই রাজ্যকে- এটা না বুঝলে এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই নেই।
আর কয়েকমাস পর বঙ্গবাসী নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে আগামী পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত করবে নিজের পছন্দের সরকার। কিন্তু বেশির ভাগ প্রাক নির্বাচনি সভার ভাষণ নির্ভেজাল কুকথা আর ব্যক্তিগত আক্রমণে ভরা। কোথায় গেল ভোটরঙ্গের সেই মজাদার ছড়া, স্লোগান, পলিটিকাল স্যাটায়ারের তীক্ষ্ণ শ্লেষের সংস্কৃতি? বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের এক্সক্লুসিভ পেটেন্ট- ‘সেন্স অফ হিউমার’ উবেই গিয়েছে।
১৯৭২-এ কংগ্রেস ‘গাই-বাছুর’ চিহ্ন নিয়ে সিপিআই-এর সঙ্গে জোট বাঁধলে, সিপিএম দেওয়ালে দেওয়ালে লিখেছিল : দিল্লি থেকে এলো গাই/ সঙ্গে বাছুর সিপিআই। কংগ্রেসও কম যায়নি। তারা লিখেছিল, চিনের চিহ্ন কাস্তে-হাতুড়ি / পাকিস্তানের তারা/ এখনও কি বলতে হবে দেশের শত্রু কারা? অথবা ’৯৬-এ জ্যোতি বসুকে খোঁচা দিয়ে লেখা : তোমার হাতে শাসনকাঠি/ তোমার ক্যাডার তুমি নাচাও/ নিজের ছেলে শিল্পপতি/ এখন বলছো শিল্প বাঁচাও!
বঙ্গের ভোটযুদ্ধের এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ায় ২০২৬-এর নির্বাচনি প্রচারের পারদ চড়ছে ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশ নেতা সাধারণ ভোটারের হৃদয়কে ছুঁতে পারছেন না।
