- গার্গী দত্ত গুপ্ত
সুজাতা ঘাটগে, ৪৬ বছর বয়সি, এক সন্তানের মা এবছর মে মাসের ১৩ তারিখে পুনের এক নামজাদা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন জরায়ুর টিউমার অপারেশনের জন্য। অপারেশন হয়, বায়োপসিতে নিশ্চিত করা হয় যে টিউমারটি নন-ক্যানসারাস। অথচ পরের দিন থেকে সুজাতার অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকে। শ্রীলোভ ঘাটগে, সুজাতার স্বামী বেসরকারি ফার্মে ২৫ হাজার টাকা বেতনের চাকুরে, ধারদেনা করে হাসপাতালের সাড়ে সাত লক্ষ টাকার বিল মেটান যাতে স্ত্রীর চিকিৎসায় কার্পণ্য না হয়। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ৬ জুন সুজাতা মারা যান। হাসপাতাল মৃত্যুর কারণ হিসেবে জানায় সেপটিক শক থেকে মাল্টি অর্গান ফেলিওর।
কয়েক বছর সময় পিছিয়ে যাই। নাগাল্যান্ডের আড্রিয়ানা। ২০২০-তে জন্মের পরে তাকে নিওনেটাল আইসিইউতে রাখা হয়েছিল। সেখানে নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিসের মতো একের পর এক মারাত্মক সংক্রমণে আক্রান্ত হতে থাকে শিশুটি। গ্লোবাল কর্টিকল অ্যাট্রফি নামে মস্তিষ্কের জটিল রোগে এখন সে শয্যাশায়ী। সুস্থ হওয়ার আশা ক্ষীণ। ৬৪ বছরের সদরুদ্দিন হাসিমালি জাভেরি, বাইপাস সার্জারির জন্য হায়দরাবাদের একটি প্রাইভেট কর্পোরেট হাসপাতালে ভর্তি হন। অপারেশনের পর একাধিক সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে সেপ্টিসিমিয়ায় মারা যান।
প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে ঘাতক হিসেবে বারবার রোগীর পরিজনরা আঙুল তুলেছেন হসপিটাল অ্যাকোয়ার্ড ইনফেকশন (HAI)–এর দিকে। অথচ HAI নিয়ে জনমানসে সচেতনতা প্রায় শূন্য। রোগীর পরিজনরা প্রিয়জনকে হাসপাতালে ভর্তি করান সুস্থ করে তোলার আশায়। WHO-র (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা) রিপোর্ট অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রোগীর এই ধরনের সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মূলত ক্যাথিটার থেকে মূত্রনালি ও কিডনির সংক্রমণ, রক্তের সংক্রমণ, ভেন্টিলেটার থেকে নিউমোনিয়া সংক্রমণ, তাছাড়া যন্ত্রপাতি যথাযথভাবে জীবাণুমুক্ত না করা, রোগীর পক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একথা সত্যি যে সব ক্ষেত্রে HAI এড়ানো সম্ভব নয়, বিশেষত উচ্চঝুঁকির রোগীদের ক্ষেত্রে- যেমন অত্যন্ত দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যানসার রোগী, প্রবীণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে একাধিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি থাকলে, অথবা দীর্ঘ সময় ধরে ভেন্টিলেটার সাপোর্টে থাকা রোগীরা। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সঠিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের নিয়মগুলো- যেমন হাত ধোয়া, অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত যন্ত্র পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করা- এই ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে, সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)-এর তথ্য অনুযায়ী ৩.২% রোগী HAI-এ আক্রান্ত হন। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯টি হাসপাতালকে নিয়ে করা ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় যে সেখানে ৯.৯% রোগীর মধ্যে HAI পাওয়া গিয়েছে। ইউরোপে ইউরোপীয় সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী ৭.১% রোগী HAI-এ আক্রান্ত হন।
অন্যদিকে, আমাদের দেশের ছবিটা কী? ২০১৪ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ বেসিক অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড মেডিকেল রিসার্চ-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে ভারতের হাসপাতালগুলোতে HAI-র হার— ১১% থেকে ৮৩% পর্যন্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক ও রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর এই সংক্রমণের কোনও রেকর্ড সংরক্ষণ করে না এবং এমনকি হাসপাতালগুলিকে এ ধরনের সংক্রমণ রিপোর্ট করতেও বাধ্য করে না। এই ঢিলেঢালা মনোভাবের ফাঁক গলে হাসপাতালগুলি তাদের গাফিলতি সহজেই আড়াল করতে পারছে।
বেশির ভাগ ভারতীয় হাসপাতাল HAI সম্পর্কে রোগীর পরিবারের কাছে কোনও তথ্য দেয় না। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ত্রুটি হলে তার আর্থিক দায়ও তারা স্বীকার করে না। ভোপালের এইমস (AIIMS)-এর একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এ ধরনের সংক্রমণের কারণে আইসিইউতে থাকার সময়সীমা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১৩.৮ দিন, যেখানে সংক্রমণ না হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই সময় ৮.২ দিন। বেসরকারি হাসপাতালে এই থাকার সময়কাল তো আরও বেশি। খরচও বাড়তে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। তথ্য না থাকার কারণে রোগীর পরিজনদের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়াটাও দুষ্কর হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসকরাও এ বিষয়ে মুখ খুলতে চান না। সব মিলিয়ে রোগীর পরিবার আর্থিক, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে হাল ছেড়ে এই ক্ষতিকে ভবিতব্য হিসেবে মেনে নেয়।
সদরুদ্দিন জাভেরির মৃত্যুর সময় তাঁর সন্তান আলিম জাভেরির বয়স ছিল ১০ বছর। উনিশ বছর ধরে তিনি লড়েছেন তাঁর পিতার মৃত্যুতে হাসপাতালের গাফিলতি প্রমাণ করতে। সম্প্রতি ন্যাশনাল কনজিউমার্স ডিসপিউটস রিড্রেসাল কমিশন বানজারা হিলসের কেয়ার হাসপাতালের গাফিলতির কারণে মৃত্যুর জন্য সদরুদ্দিন জাভেরির পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে কর্পোরেট হাসপাতালগুলির মতো প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া এদেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। একমাত্র কড়া প্রশাসনিক নজরদারি এবং হাসপাতালগুলিকে সঠিক তথ্য দিতে বাধ্য করা, এই দুটি পদক্ষেপ আশু নেওয়া না হলে এই মরণফাঁদ থেকে মানুষের মুক্তির রাস্তা নেই।
এক একটা অঘটন ঘটে যায়। পরিবারগুলি ভেসে যায়। কিন্তু যে স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলির ‘সুবাদে’ এই অঘটনগুলি ঘটে যায় তাদের মধ্যে কোনও বিকার দেখা যায় কি? মনে হয় না! হলে এ ধরনের ঘটনা উত্তরোত্তর ঘটে চলত না। আসলে চিকিৎসা পরিষেবা যতদিন না ‘ব্যবসা’–র তকমামুক্ত হবে ততদিন এমন ঘটনা ঘটে চলতেই থাকবে। করোনাকালে ভূরিভূরি এমন ধরনের ঘটনা ঘটে গিয়েছে। কিছুটা অসুস্থ মানুষ হেঁটে হাসপাতালে ঢুকেছেন। সেখানে চিকিৎসা চলাকালীন আরেক সংক্রমণের কবলে পড়েছেন। সেই মানুষটির আর বাড়ি ফিরে আসা হয়নি। কার গাফিলতি? রোগী একবার হাসপাতালে ঢোকার পর তাঁর দায়িত্ব তো পুরোটাই কর্তৃপক্ষের। সেখানে খারাপ কিছু হয়ে গেলে ‘আমাদের কীই বা করার ছিল’ বলে দায় এড়ানো কথাবার্তা অত্যন্ত অসংবেদনশীল ও অপেশাদারি মনোভাব। মানুষ হাসপাতালকে ‘মন্দির’ বলে মনে করে। সেই মন্দিরের ওপর চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে। কিন্তু সেই ‘মন্দির’ই দায় ঝেড়ে ফেললে মানুষ কোথায় যাবে! আসলে এই স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলি যদি রোগীদের নিজেদের ঘরের লোক ধরে নিয়ে পরিষেবা দেওয়া শুরু করে তবে সমস্যা অনেকটাই মিটবে। এমনটাই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। সংক্রমণ যাতে না ছড়ায় সেজন্য সামান্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন তো এমন কিছু হাতিঘোড়া বিষয় নয়!
(লেখক সুভাষিণী উচ্চতর বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক)
