মণিদীপা নন্দী বিশ্বাস
‘জারে কাঁপছে আমার গা… জারে ক্যানে কাঁপিস বউ আগুন পোহা যা…’ চরম রক্ত উদ্বেল করা একসময়ের অজিত পান্ডের এই গান গুনগুনিয়ে উঠত বুকের ভিতর অঙ্ক পরীক্ষা যত এগিয়ে আসত। সে কম্পন শুধুই ক্লাসঘর, পরীক্ষা ঘরে আটকে না থেকে ছড়িয়ে যায়, ছাড়িয়ে যায় বয়স রাজনীতি যাপনের টানাপোড়েন সর্বত্র। এইতো সেদিন আক্ষরিক অর্থেই কলকাতা সহ আশপাশে কতগুলি জেলা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সংযোগে কেঁপে উঠল ভাগ হয়ে ফাটল ধরল রাজপথ, সদ্য তৈরি পিচঢালা রাস্তা, বহুতলের দেওয়ালেও। এ ফাটল আর কম্পন বৃহত্তর অর্থে আমাদের শরীর ছাড়িয়ে স্বভাবে, প্রজন্মের পর প্রজন্মে.. ভয়ের কাঁপন, টিকে থাকার উপায় সন্ধানে নিরাপত্তাহীনতার কম্পন বা ঢেউ। টেনশন সর্বত্র, হাইভোল্টেজ পাওয়ার কানেকশন লেগেই আছে রাজনীতিক তালেবরদের বক্তৃতায়, এসআইআর নিয়ে এক যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, দুরভিসন্ধিমূলক (?) ভোটার তালিকায় কম্পন, কে বাদ গেল কিংবা থাকল তার টানাপোড়েনে কাঁপছে সারা রাজ্য, দেশ। অন্যদিকে এক যুদ্ধ শেষে অন্য যুদ্ধের পৃথিবী। শিশুর ক্ষুধার্ত মুখ, মৃত্যুহত্যার দৌড়, আঘাতে জর্জরিত মা, হারিয়ে যাওয়া বাবার মুখ সব নিয়ে বিশ্ব টলটলায়মান। ঘরে বসে আছেন যাঁরা, অজানা ভয় তাঁদেরও পিছন ছাড়ে না। একাকিত্বের কাঁপন তো কয়েক দশক থেকেই শুরু হয়েছে।
এইসব আক্ষরিক কম্পনের কথা বলতে বলতেই এ সময়ের সবচেয়ে যাঁকে নিয়ে আলোচনা, যাঁকে উদ্দেশ্য করে প্রিয় সব গান ঘুরে বেড়াচ্ছে মুখে মুখে, তাঁর যাপন, কাজ অথবা চলে যাওয়া সব নিয়ে বিচিত্র রকম ব্যাখ্যা, তাঁর মানুষকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে যাওয়া সেগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে ষোড়শ শতাব্দীর সুবর্ণ যুগকে, বিশেষত সমাজ পেরিয়ে সাহিত্যে উঠে এসেছে এ কাঁপন, তার উল্লেখ করতেই হয় প্রথমেই। মানব ধর্মের একনিষ্ঠ সাধক চৈতন্যদেবের কথা বলছি। না, কোনও সিনেমাটিক ফিগারের কথা বলব না। যদিও বলার মতোই একখানা জীবন নিয়ে সত্যিকার গবেষণাধর্মী ফিল্ম বানিয়ে ফেলেছেন সৃজিত, আর সেই ষোড়শ শতাব্দীর বুকে মানুষকে ভালোবাসা, প্রেমের বীজ বুনে দেওয়া মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের কথা তো বলতেই হবে।
সাহিত্যে প্রেমের রকমফের, আকুলতা বিদ্যাপতি চণ্ডীদাসে, যাঁরা চৈতন্য পূর্ব কালেই সৃষ্টি করেছিলেন। বৈষ্ণব পদকর্তাদের চৈতন্য পরবর্তী প্রেম ভাবনার প্রবল ধারায় রাধাকৃষ্ণের প্রেম কখন যেন মানব-মানবী প্রেমের কাঁপন তৈরি করল। ‘দুঁহু কোরে দুঁহু কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া/ আধ তিল না দেখিলে যায় যে মরিয়া’। এরপর চণ্ডীমঙ্গলে মুকুন্দরামের যে উপন্যাসের বীজ, কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীও সে বাস্তব রসের উল্লেখ করেছেন। সেই বীজ মঙ্গলকাব্যের নারী ভাবনায় তাদের বারোমাস্যায় নারীর অন্তর্গত মনোযন্ত্রণার এক থরথর কম্পন ছাড়া কি! সে উপন্যাসের বীজ অন্নদামঙ্গলে ঈশ্বরী পাটনীর সন্তানের দুধে ভাতে থাকার প্রার্থনায় শাশ্বত হয়ে যায়।
মঙ্গলকাব্যের নারী ভাবনার প্রতিফলন পরবর্তী নারী কলমে কেঁপে ওঠেনি কি! আশাপূর্ণা দেবী বা মল্লিকা সেনগুপ্ত হয়ে মহাশ্বেতা দেবী থেকে নবনীতা দেবসেন.. মানসিকতার বিবর্তন ওই নতুন পাতার কাঁপনে নিহিত ছিল। মুকুন্দরামের বাস্তব রসের সার্থক ও চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল শাক্ত পদবলিতে রামপ্রসাদ সেনের ভাবনায়। তাঁর রচিত পদগুলোতে তীব্র মনুষ্যত্ব জাগরণ, বাস্তব বোধ ওই চৈতন্যের মানবতারই প্রভাব। রামপ্রসাদের ‘মনরে কৃষি-কাজ জাননা/ এমন মানব জমিন রইলো পতিত/ আবাদ করলে ফলতো সোনা’ অথবা, ‘আমি কি দুখেরে ডরাই?…’এই দু:খকে জয় করেই আর এক বাঁকের দিকে এগিয়ে গেলাম। সেটা নবজাগরণ। ঊনবিংশ শতকের পাশ্চাত্যের জাগরণ ঢেউ পৌঁছায় সর্বত্র। শিল্পে বতিচেল্লীর হাতে ম্যাডোনা পেল মানবিক দেবী মুখ। যিশু ও মাতা মেরির ঐশ্বরিক চেতনা পেরিয়ে মানবী মায়ের ভালবাসা। ক্লাসিসিজম রোমান্টিসিজম-এর বয়ে চলা ধারায় কত কবি… মিলটন, সামসন অ্যাগোনিসটিস বলছেন calm of thoughts, all passiones spent… অন্যদিকে ওয়ার্ডসওয়ার্থ কোলরিজ রোমান্টিকতাকে আন্দোলনের রূপ দিয়েছেন। প্রচলিত প্রথা ভেঙে the Renaissance of surprise ভাবনায় নতুন জগৎ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন। শেলি, কীটস, বায়রন, ব্রাউনিং হয়ে ইয়েটস পর্যন্ত কবির কাব্যে। ইলিয়টের ডেজার্ট আইল্যান্ড কিংবা হলোম্যান ভাবনার স্ফুরণে।
এদিকে, বাংলায় আর এক কম্পন পয়ার কে ভেঙে ফেলার সময়। কান্ডারি হলেন প্রিয় কবি মধুসূদন দত্ত। গীতিকবিতার ধারা, রামায়ণ মহাভারতের প্রভাব পেরিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কলমে.. কবিতায়, নাটক, মহাকাব্যে। অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রকৃত অর্থেই কবিতায় এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। গীতিকবিতার নিজস্ব কথন, নরনারীর প্রেম, আত্মবোধ, মেঘনাদের মধ্যে এক যুগোত্তীর্ণ স্রষ্টার অন্যায় পরাজয়ের গ্লানি ও আত্মশ্লাঘা তাঁকে মানুষ শ্রেষ্ঠ করেছে।
আমরা ঠিক তারপরেই কম্পনের রিখটার স্কেলের সর্বোত্তম ভার্সন পেয়ে গেলাম কবি রবীন্দ্রনাথ। সোনার তরী-তে কবির অসামান্য ভাবনায়। প্রেমের অনির্দেশ্য গোপন কথা, নরনারী সম্পর্ক আর প্রকৃতি যেখানে তীব্র ও একাকার। প্রেমের নতুন সংজ্ঞায় আশ্চর্য বোধে পৌঁছে গেলাম পুনশ্চ, বলাকা স্তর পেরিয়ে গীতাঞ্জলির দ্বারপ্রান্তে। ‘রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা/ ভরা নদী ক্ষুরধারা খর পরসা/ কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা’… সে বর্ষার হাত ধরেই ‘শেষের কবিতা’য় নতুন লেখা নতুন উপন্যাস নতুন প্রেমের সূত্রপাত। এও তো পাঠকের ভাবনাকে নাড়া দিয়ে যায়।
ঠিক মাঝখানে এসে পড়েন আর এক ধূমকেতু ভূমিকম্প সৃষ্টি করেই… যাঁকে বসন্তদূত বলতেন কবিগুরু। সেই বিদ্রোহী কলমের, পাগলামির কবি নজরুল ইসলাম। যিনি এসেই জ্যৈষ্ঠের ঝড়ের মতো নতুন সৃষ্টিতে আলো হতে জানেন ‘আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস/ আমি লোকালয়, আমি শ্মশান আমি চির দুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস/মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ… আমি শাসন ত্রাণ সংহার, /আমি উষ্ণ চির অধীর… ’। এই স্পষ্ট নতুন স্রষ্টাকে দু’হাতে আগলে নিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। ঠিক তার পরপর সমসময়েই কল্লোল যুগের প্লাবন। নিষিদ্ধ যৌন বিপ্লব, আত্মিক সংকট, যুগ প্রভাব, রবীন্দ্র বিরোধিতা সব নিয়ে পঞ্চপ্রধান কবি ও অন্যান্যরা সাহিত্যের পালের হাওয়ায় বৃষ্টি কাঁপন এনেছেন। এরই মধ্যে জীবনানন্দ যেন ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ নিয়ে এক অন্য জগৎ অন্য বাসনার গন্ধে এক অক্ষর বর্ণের স্ফুরণ। বাংলার রূপ রস গন্ধ নিয়ে প্রবল হাওয়ায় অন্য সৃষ্টি কথা, এক অন্য গন্ধ। নির্জনে বসেও সরব সাধনায় রত কবির আজও অনাবিষ্কৃত রচনার স্ফুরণ হয়েই চলেছে। চলে যাওয়ার এত বছর পরও ডায়েরির পৃষ্ঠায়, উপন্যাসে কবির অন্য মুখের কম্পন। বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কবিধারা, কলম। তাতে সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত কে নেই!
গদ্যের ক্ষেত্রে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রহীন নারীর যে গোপন কামনা বাসনার ফুটে ওঠা সেটাই পুতুলনাচের ইতিকথায় কুসুমের শরীর চেতনার কথা বলে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘হাঁসুলীবাঁকের ইতিকথা’।
তিন বন্দ্যোপাধ্যায় ধারার মাঝখানে পাঠক এসে দাঁড়ান। ১৯৪৫-’৪৬ এ পথের পাঁচালীর সময়েই আমেরিকায় অ্যালেন গিন্সবার্গ, কেরুবার্কের যে আধুনিক চেতনা সেটাই কি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘একটি কবিতার জন্মের’ ‘একটি কবিতা লেখা হবে। তার জন্যে/আগুনের নীল শিখার মতন আকাশ/ রাগে রী রী করে, সমুদ্রে ডানা ঝাড়ে/ দুরন্ত ঝড়, মেঘের ধূম্র জটা।…’ এর হাত ধরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘আমি কি রকম ভাবে বেঁচে আছি…’ বোধের কাছাকাছি এনে দাঁড় করিয়ে দেয় না?
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে রমেন্দ্রকুমার আচার্য চৌধুরী পেরিয়ে সুকান্ত ভট্টাচার্য এক অল্পদিনের বিরাট কাঁপন। আঠারোর জয়ধ্বনির কলম। এভাবেই ঝড়ের দোলায় এসে দাঁড়াই এক স্থিতিশীল, প্রাজ্ঞ বিশিষ্ট জানলায়.. শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদারে। সাহিত্যের এ ঝড় থাকবেই। কবিতা গদ্যের আলোর বিচ্ছুরণে মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ এর পাশে ঝড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন কবিতা সিংহ, দেবারতি মিত্র, বাণী বসু ইত্যাদি।
দেশ-বিদেশের বহু পুরস্কার বন্যা সাহিত্যে তেমন করে আজ আর কাঁপন জাগায় না, যতটা কাঁপন জাগে লেখার টেবিলে মোবাইল ভাইব্রেশনে। প্রতিদিনের চলার পথে রক্ত বন্যা বা অন্ধকারে আলোর কম্পাঙ্কে অহরহ চৌচির মাটির পাহাড়ি হাওয়ার মতো ১৯৬৫-তে সমরেশ বসুর ‘বিবর’ বাংলা সাহিত্যের বিতর্কিত মাইলস্টোন বলা যায়। কলকাতার যুবসমাজের অস্তিত্বের সংকট, যৌন বিভ্রান্তি এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় তুলে ধরেছে এ উপন্যাস। সমকালীন সমাজ ও প্রথাগত রীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বইটি তীব্র সমালোচনা ও প্রশংসা দুটোই পেয়েছে। বাংলা সাহিত্যে এই বাঁক রীতিমতো ঝড় তুলেছিল।
সাহিত্যে আধুনিকতার কাঁপনে পালা বদল ঘটবেই, তা না হলে নদীও তো থমকে যাবে। ভালোবাসার পাড় ভাঙে কেঁপে ওঠে পাহাড়, কাঁপন ধরে অন্তর্গত বোধের ভিতর। টাল খায় মাথা, নড়ে যায় পা ফেলার জোর। মানুষ চেতনা আছে বলেই দৃঢ় সে কাঁপনে জড়িয়ে যাই অথবা বিরুদ্ধ শক্তির মতো শক্ত শিকড় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি উন্মত্ত ঝড়েও।
