সুকুমার সেন : বাংলা ভাষার উদার ঐতিহ্য

সুকুমার সেন : বাংলা ভাষার উদার ঐতিহ্য

আন্তর্জাতিক INTERNATIONAL
Spread the love


(বাংলা ভাষার উদার ঐতিহ্য, শিকড় সন্ধান এবং গোয়েন্দা সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম অনুরাগের এক অনন্য মিশেল পণ্ডিত সুকুমার সেন বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ফিরে দেখা।)

শেষাদ্রি বসু

ভাষার প্রবহমানতায় চিরকালই এক স্বতঃস্ফূর্ত আদানপ্রদানের মেজাজ মিশে থাকে। এই মেজাজ তখনই প্রাণবন্ত হয়, যখন সময়ের প্রেক্ষিতটি হয় উদারনৈতিক। অর্থাৎ রাষ্ট্র বা শাসকের দৃষ্টিভঙ্গিই নির্ধারণ করে দেয়, শব্দ ও ভাষার ব্যবহারে একটি সমাজ কতটা উদার হতে পারবে। একথা অনস্বীকার্য যে, ভারতবর্ষের মানচিত্র ধর্মীয় বিভাজনের ভিত্তিতে তৈরি হলেও, একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল কেবল মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্যই। ধর্মনিরপেক্ষতার এই আদর্শেই স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছিল। যদিও কট্টরপন্থীদের তরফে উর্দুর আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল, তবুও উদারতার স্বরই শেষপর্যন্ত জয়ী হয়। নজরুলের ‘চল চল চল’ গানে ‘মহা শ্মশান’-এর বদলে ‘গোরস্থান’ শব্দ বসিয়ে জবরদস্তির চেষ্টা হলেও, বাংলার শিকড় ছিল অনেক গভীরে। যেমন মিহির সেনগুপ্ত তাঁর ‘বিষাদ বৃক্ষ’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কীভাবে পীর বাতাসীর গায়েন তাঁর গুরু জিন্দাগাজির কাছে বর প্রার্থনার মুহূর্তে হিন্দু তীর্থস্থানগুলোকেও সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি দিচ্ছেন। আরবি, উর্দু, পর্তুগিজ বা ইংরেজি ভাষার শব্দকে আমরা কেবল কেজো প্রয়োজনেই আপন করিনি, তাকে আমাদের সাংস্কৃতিক বুনিয়াদের অংশ করে নিয়েছি। বাংলার এই উদার ঐতিহ্যের সার্থক রূপকার ও ভাষাবিদ সুকুমার সেন এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের কাছে আজও এক সজীব প্রেরণা।

১৯০০ সালের ১৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করা সুকুমার সেনের শৈশব থেকেই বিভিন্ন ভাষার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। ছাত্রাবস্থাতেই সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত ভাষার ওপর তাঁর অসামান্য দখল জন্মায়। ঔপনিবেশিক আমলের সেই সময়টায় রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, সৈয়দ আহমদ খান, হরিনাথ দে বা তাঁর গুরু সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়দের মতো বুদ্ধিজীবীরা বিদেশি ভাষা আয়ত্ত করার মধ্য দিয়ে যে বৌদ্ধিক পরিমণ্ডল তৈরি করেছিলেন, সুকুমার সেন ছিলেন সেই প্রসারিত চিন্তার যোগ্য উত্তরসূরি। তাঁর গবেষণার প্রাথমিক কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সালতামামি অন্বেষণ করা। তাঁর অসামান্য কীর্তি ‘হিস্ট্রি অফ বেঙ্গলি লিটারেচার’ বা ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ প্রমাণ করে যে, বাংলা ভাষা প্রাকৃত ও অপভ্রংশের স্তর পেরিয়ে কীভাবে নিজের স্বাতন্ত্র্য অর্জন করেছে। ভাষার ধ্বনি-পরিবর্তন, শব্দগঠন, রূপতত্ত্ব ও বাক্যগঠনের পারম্পর্য নিয়ে তিনি এক মনোজ্ঞ গবেষণার ক্ষেত্র নির্মাণ করেন। বাংলা ভাষার কেবল একটিমাত্র রূপ ছিল না; অঞ্চলভেদে অগণিত উপভাষার রামধনুপ্রতিম বৈচিত্র্যকে তিনি যোগ্য সম্মান জানাতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। কথ্যভাষার ধ্বনি ও শব্দভাণ্ডারের বৈচিত্র্যকে ছেঁচে তুলে তিনি যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তা এককথায় বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বুনিয়াদেরই রূপরেখা। ইতিহাস যে কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদানে আবদ্ধ থাকে না, চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য ও বৈষ্ণব পদাবলীর নিবিড় চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি সেটাই শিখিয়েছিলেন। ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’, ‘ভারতীয় আর্য সাহিত্যের ইতিহাস’, ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ এবং সুভদ্রকুমার সেনের সঙ্গে লেখা ‘বাঙালির ভাষা’ তাঁর সেই অগণিত মেধাবী ও পরিশ্রমী কাজের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।

বাংলা অভিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সুকুমার সেনের পরিশ্রমী মননের এক অভিনব পরিচয় পাওয়া যায়। অভিধানকে যে কেবলমাত্র শব্দের অর্থের সংকলন ভাবলে ভুল হবে, তা তিনি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। ভাষার নিজস্ব মনন ও দ্যোতনার পাশাপাশি তার ভাবজগৎ এবং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ব্যঞ্জনাও থাকে। তাই তিনি কেবল শব্দের অর্থ নিয়েই থেমে থাকেননি; শব্দের উৎস, ধ্বনি পরিবর্তন, রূপ এবং বিবর্তনের ঐতিহাসিক রূপরেখাটি নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছিলেন। বাংলা ভাষার চরিত্র যে কখনোই একরৈখিক ছিল না এবং সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশ ও অন্যান্য ভাষার মিলনে যে তা গড়ে উঠেছে, তা তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।

এই বিপুল পাণ্ডিত্যের অধিকারী হলেও সুকুমার সেন আদৌ কোনও শুষ্ক স্বভাবের মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন গোয়েন্দা গল্প ও উপন্যাসের একনিষ্ঠ পাঠক। ইংরেজি সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা গোয়েন্দা কাহিনীর প্রতিও তাঁর সমান নজর ছিল। আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ব্যোমকেশ সমগ্র’-এর প্রথম খণ্ডের অসাধারণ ভূমিকাটি তিনিই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, কেন গোয়েন্দা গল্প সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘটনার অভিনবত্ব, প্লটের প্যাঁচ, গোয়েন্দার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি এবং প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করত। তাই তো তিনি শার্লক হোমস, ডাক্তার থর্নডাইক, ফাদার ব্রাউন, এরকুল পোয়ারো, মিস মার্পল, লর্ড পিটার উইমসি, ইনস্পেকটর ফ্রেঞ্চ বা অ্যালবার্ট ক্যাম্পিয়নদের মতো বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দাদের পাশাপাশি ব্যোমকেশ বক্সীকেও সমান মর্যাদায় বসিয়েছিলেন। তথাকথিত পণ্ডিতদের মতো জনপ্রিয় সাহিত্যকে তাচ্ছিল্য করার কোনও অহংকার বা দ্বিধা তাঁর ছিল না। বরং পাশের বাড়ির বাঙালি তরুণ ব্যোমকেশের পা এলিয়ে বসার প্রবৃত্তি, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির সমাহার, তীব্র আত্মমর্যাদাবোধ এবং নৈতিক চরিত্র তাঁকে মুগ্ধ করেছিল।

ভারতবর্ষের বহুভাষিক ও বহুমাত্রিক কাঠামোর ওপর যখন আঘাত নেমে আসছে এবং হিন্দিকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিয়ে অন্যান্য ভাষার অবমাননা করার অপচেষ্টা চলছে, তার প্রেক্ষিতে সুকুমার সেন আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। হিন্দি-হিন্দু বলয় গড়ার এই নেশার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই বহুভাষাবিদ আজীবন শিখিয়ে গেছেন মনের জানলা খোলা রাখার পাঠ। তাঁর কাছে কোনও উপভাষাই অপাংক্তেয় ছিল না। আজ ভিনরাজ্যে গিয়ে বাঙালিরা যখন ভাষা ও পরিচয়ের কারণে সন্দেহ বা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, তখন সুকুমার সেনের এই উদার ভাষাদর্শই আমাদের প্রেরণা জোগায়। ভাষার এই অবমাননা দেখলে আজ নিশ্চয়ই তাঁর ক্ষুরধার কলম ও বক্তব্য আরও শাণিত হয়ে উঠত।

(লেখক পরিমল মিত্র স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের অধ্যাপক)

বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও উপভাষার বৈচিত্র্য নিয়ে সুকুমার সেনের যুগান্তকারী কাজ এক উদার সাংস্কৃতিক বুনিয়াদ তৈরি করেছিল। অগাধ পাণ্ডিত্যের পাশাপাশি ব্যোমকেশ বা শার্লক হোমসের মতো গোয়েন্দা গল্পের প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রমাণ করে তাঁর মননের বিশালতা। বর্তমান ভারতে যখন ভাষার ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চলছে, তখন তাঁর এই বহুভাষিক আদর্শ তীব্রভাবে প্রাসঙ্গিক।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *