- স্বস্তিক সরকার
মাধ্যম হিসাবে চলচ্চিত্রের গ্রহণযোগ্যতা খানিক বেশি হওয়ায় ঐতিহাসিক ঘটনা, সংগঠিত বিপ্লবের কাহিনী ডকুমেন্টেশনের তাগিদে ফ্রেমবন্দি হয়েছে যুগে যুগে। স্বাধীনতার রূপরেখা বিশ্ব চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ভারতীয় চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত হয়েছে বারবার। দশক, শতক পেরিয়েও যে চল অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান সময়ে ভারতীয় সিনেমার হিট ফর্মুলা– জাতীয়তাবাদের আবেগ। দেশপ্রেম, সেনাবাহিনীর আত্মবলিদান অথবা ভারতীয় গুপ্তচরদের বীরগাথা এখন হট টপিক। এই সকল বিষয়কে কেন্দ্র করে একের পর এক ছবি তৈরি হচ্ছে যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রবলভাবে অতিরঞ্জিত। ভারতীয় গুপ্তচরদের কখনও আমরা দেখছি হেলিকপ্টার থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে আবার কখনও দেখছি দু’হাতে মেশিনগান চালাতে। নিছক মনোরঞ্জন হিসাবে ধরলে কোনও সমস্যা নেই। তবে ‘আলগা জাতীয়তাবাদ’ অথবা ‘ভারত বনাম শত্রু’ বিষয়কেন্দ্রিক ছবি দর্শকের মনে প্রভাব বিস্তার করছে। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগকে উপেক্ষা করা যাচ্ছে না।
১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট মধ্যরাতে যখন ‘ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি’ ঘোষিত হয়, ঠিক সেই সময় জন্মগ্রহণ করে এক শিশু, সেলিম সিনাই। স্বাধীনতা ঘোষণার প্রহরে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের মধ্যে সঞ্চারিত হয় বিশেষ কিছু ক্ষমতা। সেলিমের বিশেষ ক্ষমতা সে টেলিপ্যাথির মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে স্বাধীনতার প্রহরে জন্মানো বাকি মানুষগুলোর সঙ্গে। তার জীবনযাত্রার মধ্যে দিয়ে উঠে আসে দেশভাগ থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের ইতিহাস। সলমান রুশদি রচিত ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ জাদু বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে ভারতের এক ঐতিহাসিক রূপরেখা ব্যক্ত করে। ২০১২ সালে এই বিখ্যাত কাহিনী অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন দীপা মেহতা, যা সেই বছর টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথম প্রদর্শিত হয়।
সিনেমা ইতিহাসের মাইলফলক আইজেনস্টাইন পরিচালিত ‘ব্যাটলশিপ পটিমকিন’ বলসেভিক বিপ্লবের উদযাপনে নির্মিত। ‘মেমোরিজ অফ আন্ডারডেভেলপমেন্ট’-এর মতো চলচ্চিত্রে উঠে আসে কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনী। ১৯৬৬ সালে গিলো পন্টেকর্ভো পরিচালিত ছবি ‘দ্য ব্যাটল অফ আলজিয়ার্স’ ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে আলজিরিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের গল্প বলে। মহম্মদ লাখদার হামিনা পরিচালিত ছবি ‘ক্রনিকাল অফ দ্য ইয়ার্স অফ ফায়ার’ একই বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয় ১৯৭৫ সালে। একটি কৃষকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আলজিরিয়ার বিপ্লব এই ছবির মূল উপজীব্য। ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে সর্বোচ্চ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়। এমন উদাহরণ অগণিত। ভারতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট কলকাতার রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে স্বাধীনতা উদযাপন উপলক্ষ্যে প্রদর্শিত হয় অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘সংগ্রাম’। চিত্রা সিনেমা হলে দেখানো হয় প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘অধিকার’। সঙ্গে শোনানো হয় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বক্তৃতা ও ‘কদম কদম বড়ায়ে যা’ গান।
সাম্প্রতিককালে ‘কেশরী : চ্যাপ্টার ২’ শীর্ষক চলচ্চিত্র চর্চায় উঠে এসেছে। ওই চলচ্চিত্রে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকির নাম পরিবর্তন করার অভিযোগ উঠেছে। সমস্যা ঠিক এই জায়গায়। কিছু ছবির প্রভাবে মানুষের কাছে ভুল ইতিহাস পৌঁছাচ্ছে এবং হাইপার রিয়েলিটির মতোই তারা মূল ইতিহাসের থেকে বেশি এই সকল চলচ্চিত্র দ্বারা প্রচারিত বিকৃত ইতিহাসকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে। দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদের আবেগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির মানুষ তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করছে এবং আরেক শ্রেণির মানুষ ব্যবসায়িক সফলতা পাচ্ছে। তবে শুধু নির্মাতাদের ওপর আঙুল তোলা অনাচার হবে। দর্শক যদি এই বিকৃত ইতিহাসকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র বর্জন করত তাহলে হয়তো এই ছবিগুলির এমন বাজার তৈরি হত না।
২০১৬ সালের পর থেকে দ্রুতগতিতে সমাজ রাজনীতির প্রেক্ষাপট পরিবর্তন, যুদ্ধ পরিস্থিতি সিনেমার বিষয়বস্তুতে প্রভাব ফেলেছে। গত দশকের গুপ্তচরকেন্দ্রিক ছবিতে বাণিজ্যিকভাবে কিছু ক্ষেত্রে ঐক্যের বার্তা দেওয়া হত, যা এই দশকে বিরল। বড় পর্দার সঙ্গে সঙ্গে এখন ওটিটি-তেও চাহিদা বাড়ছে এমন কনটেন্টের। এই চাহিদার কারণ সমাজ রাজনীতির গভীরে। তবে সবচেয়ে সমান্তরাল কারণ হয়তো আবেগপ্রবণতা। ইতিহাস অনুসারে জাতীয়তাবাদের অনেক রূপ। ধর্মনিরপেক্ষতা, শ্রেণিসংগ্রাম, উপনিবেশ বিরোধিতা ইত্যাদি। বিষয়গুলি দর্শকের কাছে খানিক জটিল। তাই চলচ্চিত্রে জটিলতা বাদ দিয়ে সরল দেশপ্রেম এবং ‘শত্রু দেশ’ সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়ে উঠেছে মূল উদ্দেশ্য। এই সরলীকরণ দর্শকের জন্য হজমযোগ্য এবং বিনোদনমূলক।
কিন্তু শুধুমাত্র অতিরঞ্জিত, উগ্র জাতীয়তাবাদী ছবি ফেলে আসা দশকে তৈরি হয়নি। বিপরীতে এমন কিছু চলচ্চিত্রের উদাহরণ দেওয়া যায় যেখানে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদের ইতিহাস প্রতিফলিত হয়েছে সৎভাবে। পরিসর ছোট তাই বহুল আলোচিত ছবি যেমন শ্যাম বেনেগালের ‘বোস : দ্য ফরগটেন হিরো’, রিচার্ড অ্যাটেনবরোর ছবি ‘গান্ধি’ অথবা বাণিজ্য সফল ছবি ‘লগান’ (পরিচালনায় আশুতোষ গোয়ারিকর) সম্পর্কে আলোচনা না করে কয়েকটি স্বল্পচর্চিত ছবির কথা বলা যাক।
এক বিদেশিনী ভারতে আসেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কেন্দ্র করে একটি ছবি করার তাগিদে। নির্মাণকাজে জড়িয়ে পড়ে কয়েকজন উদাসীন তরুণ-তরুণী। ১৯৪০ সালের বিপ্লবী রাজগুরু, ভগৎ সিং-এর ভূমিকায় অভিনয় করতে গিয়ে তারা বিপ্লবীদের সমান্তরালে নিজেদের জীবন দেখতে শুরু করে এবং তাদের মধ্যেও জেগে ওঠে সংগ্রাম চেতনা। রাকেশ ওমপ্রকাশ মেহরা পরিচালিত ‘রং দে বসন্তী’ তৎকালীন সময়ে সাড়া জাগানো এক ছবি, যে ছবি বলে দেশপ্রেম মানে শুধুমাত্র যুদ্ধক্ষেত্র নয় বরং দেশপ্রেম হল যে কোনও দুর্নীতি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান।
২০১২ সালে বেদব্রত পাইন পরিচালিত ‘চিটাগং’ মুক্তি পায়। ১৯৩০ সালে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এই ছবির বিষয়বস্তু। মাস্টারদার ভূমিকায় মনোজ বাজপেয়ী এবং অন্য বিপ্লবীদের ভূমিকায় রাজকুমার রাও, নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকী, বিজয় বর্মাদের অভিনয় এই সিনেমার মূল সম্পদ। একই ঘটনা অবলম্বনে বলিউডে আরেকটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল ২০১০ সালে ‘খেলে হম জি জান সে’। তবে ঐতিহাসিক বস্তুনিষ্ঠতা এবং চলচ্চিত্রের গুণগত মান- দুইয়ের দিক থেকেই ‘চিটাগং’ তুলনায় অনেক বেশি উন্নতমানের ছবি। বিপ্লবী সুবোধ রায়ের বয়ানে এই ছবি ভারতের সশস্ত্র সংগ্রামের এক জ্বলন্ত দলিল হয়ে ওঠে।
২০২১ সালে ওটিটি-তে মুক্তিপ্রাপ্ত সুজিত সরকারের ছবি ‘সর্দার উধাম’। যদিও ছবিটি বড় পর্দার জন্য তৈরি করা হয় কিন্তু অতিমারির কারণে তা বড়পর্দায় মুক্তি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ছবিটিতে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের উপস্থাপনা এমনই বিশ্বাসযোগ্য এবং নির্মম বাস্তবের প্রতিফলন যা মানসিকভাবে আমাদের আক্রান্ত করেছে বারবার। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় সর্দার উধাম সিং হত্যা করেন ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যর মাইকেল ও’ডায়ারকে। সর্দার উধামের সংগ্রামী জীবন এই ছবির মূল বিষয়বস্তু। ছবিতে অভীক মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরায় দৃশ্যের কাব্যময়তা এবং নৈঃশব্দ্যের ব্যবহার ছবিটিকে এক মহাকাব্যের পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। প্রতিশোধ স্পৃহা নয় বরং ঔপনিবেশিক নির্মমতার বিরুদ্ধে বিপ্লবই সর্দার উধাম সিংয়ের মূল ভিত্তি।
সিনেমা আদতেই স্বাধীনতা। আত্মউন্মোচনের পথ। বাড়ি থেকে পালিয়ে কিশোর বয়সে সিনেমা দেখা। সিনেমা দেখছে শুনলে বড়রা জিজ্ঞেস করেন, কী সিনেমা? সিনেমার ভেতরেই যেন কোনও নিষিদ্ধ বস্তু আছে। সিনেমা জীবনের নতুন দরজা খুলে দেয়। ধাপে ধাপে আমরা আরেকটা নতুন শিল্প আবিষ্কার করি যেখানে সাহিত্য, গান, নাচ, অভিনয় সব একাকার হয়ে ফুটে ওঠে এক চলমান ছবি। আমরা আকৃষ্ট হই। সিনেমাকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খায় স্বাধীনতা। সিনেমা একটা বক্তব্য রাখে। বক্তব্যটা পরিবর্তনের। দৃষ্টিভঙ্গির। স্বাধীনতার জন্ম সেখানেই।
