ডাঃ বিশ্বজিৎ ব্যানার্জি
চারদিকে কোনও শব্দ নেই, পাহাড়ের মাথায় মেঘ জমেছে, বোধহয় বৃষ্টি আসবে, দাঁড়িয়ে আছি স্টো পাহাড়ে। হাওয়ায় কীরকম নরম ভিজে গন্ধ, আদিগন্ত ছড়িয়ে আছে ঢেউখেলানো বুগিয়াল, স্বপ্নের মতো ফিরে আসছে ছোটবেলায় শোনা গান; জুলি অ্যান্ড্রুজ গেয়ে বেড়াচ্ছেন, বাচ্চাদের শেখাচ্ছেন ‘Do Re Mi Fa So La Ti’, সবুজের গালিচায় শুয়ে পড়ি, মন জুড়িয়ে যায় নরম ছোটবেলায় দেখা সাউন্ড অফ মিউজিক সিনেমার স্মৃতিতে; ঠান্ডা হাওয়া, পাখির ডাক, সব মিলিয়ে মনে হয় স্বপ্ন দেখছি।
আমরা এ পাহাড়ে এসেছি মেয়ের জন্মদিন পালন করতে। ইতিউতি মন্থর পায়ে হেঁটে বেড়াব, ডাক শুনে পাখি চেনার প্রতিযোগিতা হবে তিনজনের মধ্যে, এখানকার নিজস্ব ব্রুয়ারিতে বানানো ওয়াইনের স্বাদ নেব… এটাই আমাদের বেড়ানো। হলিউডের বিখ্যাত ছবি সাউন্ড অফ মিউজিকের পটভূমি অস্ট্রিয়ার সালজবার্গ অঞ্চল। বিপত্নীক ক্যাপ্টেন ভন ট্র্যাপের বিচ্ছু বাচ্চাদের সামলাতে এলেন মারিয়া। শিশুদের মন জয় করতে তাঁর সময় লাগল না; গানের সুরে মেতে উঠল পুরো পরিবার, আল্পস পাহাড়ে ছড়িয়ে পড়ল Excessive on a hill on a lonely goatherd, Edelweiss, So lengthy farewell -এর সুর।
কিন্তু সুখ বেশিদিন রইল না, হিটলারের ফতোয়ায় লুকিয়ে সপরিবারে দেশ ছাড়তে হল ক্যাপ্টেন ভন ট্র্যাপকে; ইউরোপ ছেড়ে থিতু হলেন আমেরিকার এই স্টো পাহাড়ে, জায়গাটা যে একদম অস্ট্রিয়ার মতো… সেই পাহাড়, উপত্যকা, ছোট্ট নদী আর পাখির গান! ওঁরা এখানে যে বাড়িতে থাকতেন সেই বাড়িতেই এখন ‘ভন ট্র্যাপ রিসর্ট’, ওখানেই আমরা আছি| পৌঁছেছি শেষ বিকেলে, পশ্চিম আকাশ সূর্যাস্তের রঙে লাল, গাছে ঝুলছে আপেল, বেরি, অসংখ্য ফুল ফুটে রয়েছে চারদিকে… এটাই কি স্বর্গের নন্দনকানন? রিসর্ট ছড়িয়ে রয়েছে পুরো পাহাড় জুড়ে, থাকার মূল জায়গাটা ছাড়াও রয়েছে ক্যাফে, প্রাইভেট ভিলা, ডেয়ারির গোরু-ছাগল চরার বিস্তীর্ণ মাঠ|
২৬০০ একরের এই স্বপ্নরাজ্যে ঘুরে বেড়াবার জন্য রয়েছে রিসর্টের গাড়ি, ডাকলেই হাজির, অতিথিদের জন্য ফ্রি সার্ভিস! রিসর্টের কর্মীদের পোশাক, রেস্তোরাঁর মেনু, ঘরের ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন… সবেতেই পুরোনো ইউরোপিয়ান সংস্কৃতির ছাপ, আমেরিকায় আছি মনেই হয় না, সামনের উঠোনে সাজানো আছে টেবিল-চেয়ার, অন্ধকার নামতে একটু দেরি আছে, দিনরাতের সীমানায় এই সময়টা আমার খুব প্রিয়, নিস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝে বসে থাকি, গুনগুন করি ‘রাত্রি এসে যেথায় মেশে দিনের পারাবারে তোমায় আমায় দেখা হবে সেই মোহনার ধারে’।
অস্টিন থেকে সকালের ফ্লাইট ধরে নিউ ইয়র্কে নেমে ছোট প্লেনে চেপে লেক চ্যামপ্লেইনের ধারে বারলিংটন শহরে পৌঁছোতে শেষ দুপুর। আকাশ থেকে নামার সময় মনে হচ্ছিল আমাদের ছোট্ট প্লেন যেন লেকের জলেই টাচডাউন করবে! ছবির মতো শহর এই বারলিংটন, এখান থেকে স্টো তিন ঘণ্টার ড্রাইভ, যেন শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং, শুধু চা বাগানটাই নেই! ভন ট্র্যাপ লজে পৌঁছোতেই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি। আকাশ ঠিক যেখানে পাহাড়ে মিশেছে সেখানে তখন মেঘের কোলে রোদ হাসছে, বাদলের আজ ছুটি। সামনের সবুজ মাঠে সাইকেল নিয়ে খেলে বেড়াচ্ছে দুজন পুঁচকে, খিলখিলে হাসিতে ভরে উঠেছে আশপাশ।
খোলা আকাশের নীচে ধূমায়িত গরম কফি নিয়ে বসি, গল্প জুড়ি পাশে বসা বৃদ্ধার সঙ্গে। উনি এসেছেন ব্রাজিল থেকে, আমার মতোই সাউন্ড অফ মিউজিকের ভক্ত; কত কথা হয়, ফুটবল থেকে শুরু করে সাম্বা হয়ে আমাজনের রেন ফরেস্টের সবুজের আঙিনায় গিয়ে শেষ হয় সেই আলাপচারিতা। আজ সন্ধ্যায় আমার কন্যার জন্মদিনের ডিনার, প্ল্যান করেছি হোটেলের গুরুগম্ভীর রেস্তোরাঁয়। পুরো ইউরোপীয় কায়দা, সাহেবি পোশাক নাহলে প্রবেশাধিকার নেই। সুন্দর কাটে সময়টা, মোমবাতি, হ্যাপি বার্থ-ডে গান আর সবার শুভেচ্ছায় মন ভালো হয়ে যায়।
পরদিন ঘুম ভেঙে দেখি পাশের পাহাড় মেঘের সাজে সেজেছে। আজ আমরা ব্রেকফাস্ট করব আরেক পাহাড়ের মাথায় সাজিয়ে রাখা ক্যাফেতে। ওপেন এয়ার ডেকে বসে খাঁটি কন্টিনেন্টাল খাবারদাবার, যতদূর চোখ যায় নানা রঙের সবুজ… ঘন, হালকা, কচি কলাপাতা। খাওয়া শেষে আনমনে পাহাড়ি পথে ঘুরে বেড়াই, নিজের সঙ্গে কথা বলি, গান করি… আশপাশে আমি আর আমার মন ছাড়া কেউ নেই। কতক্ষণ কেটে যায় হিসেব থাকে না, চমক ভাঙে ফোনের আওয়াজে, ‘এই এসো আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে, বৃষ্টি আসছে তো!’ ফিরে চলি ঘরের পানে। কাল পাহাড় ছেড়ে নামব প্লেন ধরতে, গন্তব্য শিকাগো।
