গণতন্ত্রে জনগণের প্রতি শাসকের দায়বদ্ধতা অত্যন্ত জরুরি শর্ত। যা না থাকলে গণতন্ত্রের ভিত্তি নড়বড়ে হতে বাধ্য। যাঁদের ভোটে জিতে শাসক ক্ষমতাসীন হয়, সেই জনতা শাসকের কাজে-কথায় রুষ্ট, বিরক্ত হলে সমালোচনা করতেই পারে, জবাবদিহি চাইতেই পারে। তবেই সে প্রকৃত গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে।
তা না করে শাসক নিজের খেয়ালখুশিমতো সরকার পরিচালনা করলে, জনগণের অভাব-অভিযোগের তোয়াক্কা না করলে, বলপূর্বক তাদের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। অথচ গোড্ডার বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে বলছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কি প্রশ্ন করবেন? উনি যাবতীয় প্রশ্নের ঊর্ধ্বে।’
একটি সর্বভারতীয় হিন্দি বৈদ্যুতিন সংবাদ চ্যানেলের জনপ্রিয় টক শো-তে সঞ্চালকের প্রশ্নের জবাবে মোদি-অমিত শা’র আস্থাভাজন এই সাংসদের মন্তব্যটি স্তাবকতাকে অনন্য পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। নিশিকান্তের মতো আরও অনেক বিজেপি নেতা-মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি ও কর্মী-সমর্থক মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, মোদির কাজে কোনও খুঁত থাকতে পারে না। তাই তাঁকে প্রশ্ন করা যায় না।
এহেন আসমুদ্রহিমাচলব্যাপী প্রশ্নাতীত আনুগত্য কোনও রাজতন্ত্রেও পাওয়া দুষ্কর। মোদি ভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। ফলে তাঁর সরকারের কাজকর্ম, নীতি, সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার দেশের মানুষের থাকা স্বাভাবিক। প্রশ্ন ওঠে, বিজেপি কি সেই অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে?
গত লোকসভা ভোটে প্রচারের সময় প্রধানমন্ত্রী নিজেকে জৈবিক বলে দাবি করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, তাঁকে ঈশ্বর কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ধরাধামে পাঠিয়েছেন। ভোটের প্রচারের সেই কথাকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে তাঁকে যাবতীয় প্রশ্নের ঊর্ধ্বে বলে দলের নেতা-সাংসদরা দাবি করলে দেশের গণতন্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন উঁকি দিতে বাধ্য।
জওহরলাল নেহরু থেকে নরেন্দ্র মোদি, প্রত্যেকেই ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সু়যোগ পেয়েছেন। দেশের আর দশের মঙ্গলের দিকে লক্ষ্য রাখা প্রধানমন্ত্রীর প্রধান কর্তব্য। সেই কর্তব্য পালনে কোনও ভুলচুক হলে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করার এবং প্রশ্ন তোলার অধিকার বিরোধীদের ও সর্বোপরি সাধারণ মানুষের আছে বৈকি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর উচিত, সেই সমস্ত সমালোচনা ও প্রশ্নের জবাব দেওয়া। এতে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের পরিচিতি আরও উজ্জ্বল হয়। নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই ভারতকে গণতন্ত্রের জননী বলে থাকেন। অথচ তাঁকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে দাবি করে যে ভাষ্য তৈরি করা হচ্ছে, তাতে গণতন্ত্রের মূল ধারণা ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।
ভারতের শাসন ব্যবস্থায় সবার ওপরে সংবিধান। দীর্ঘ সংগ্রাম এবং বহু বলিদানের ফসল ওই দলিলটি। যা দেশের সমস্ত ক্ষমতার উৎস। কিন্তু সেই দলিল প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা দিয়েছে বলেই তাঁকে সমালোচনা বা প্রশ্ন করার অধিকার বিরোধীদের নেই বলে প্রচার করার মানসিকতা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই আঘাত করে।
সংসদে শাসকদলের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী যুক্তি দিয়ে বিরোধীদের অবস্থান খণ্ডন করবেন আবার বিরোধী দলনেতা পালটা যুক্তি দেবেন- সংসদীয় গণতন্ত্রের দস্তুর সেটাই। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে না, তাঁদের অভিযোগগুলির প্রতি কর্ণপাত করা হবে না, শুধু সরকারের মহিমাকীর্তন হবে- এই মানসিকতা ভয়ংকর।
নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির অন্য নেতারা সবকিছুতে নেহরু-গান্ধি পরিবারের ভূত খুঁজে বেড়ান। দেশের সমস্ত সমস্যার জন্য ওই পরিবারের দিকে আঙুল তোলা তাঁদের অভ্যাস। মোদি সরকারের ক্ষমতাসীন থাকার বয়সও কিন্তু ১২ বছর হয়ে গিয়েছে। শাসক শিবিরের কাজকর্ম নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। সে সবকে গুরুত্ব না দেওয়ার অর্থ বিরুদ্ধ মতকে অগ্রাহ্য করা। এটা গণতান্ত্রিক ধারণার সঙ্গে খাপ খায় না।
গিরিরাজ সিং, নিশিকান্ত দুবেরা হয়তো বিজেপির সম্পদ। কিন্তু তাঁদের মতো নেতারা স্তাবকতাকে মহিমান্বিত করায় গেরুয়া শিবিরের লাভ হতে পারে, কিন্তু ক্ষতি হচ্ছে দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চেতনার।
