- পূর্বা সেনগুপ্ত
তখন বৈষ্ণবদের ভক্তির রসে আপ্লুত, তন্ত্রের আচারে সিদ্ধ শক্তিপীঠ এই বঙ্গভূমি। এরই মধ্যে হুগলি জেলার কামারপুকুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়, পরবর্তীকালের শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস। পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়, মাতা চন্দ্রামণি দেবী।
এ এক অদ্ভুত পরিবারের বিচিত্র ইতিহাস। স্বর্গস্থিত দেবতা আর মাটির মানুষ- একই সঙ্গে যে পরিবারের মধ্যে জীবন্ত হয়ে বিরাজ করে সে পরিবারের সদস্যরা হয় দেবসত্ত্বায় পরিপূর্ণ। অলীক জগতের ভাষায় মাখানো চমকপ্রদ এক অধ্যায় আমরা আজ তুলে ধরব।
হুগলি, মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলার সীমান্তরেখায় অবস্থিত শস্যশ্যামলা বৈষ্ণবভাব প্রধান কামারপুকুর গ্রামটি। হুগলি জেলার উত্তর-পশ্চিমাংশে- যেখানে বাঁকুড়া ও মেদিনীপুর জেলা পরস্পর মিলিত হয়েছে, সেই স্থানের কিছু দূরেই তিনটি গ্রাম- শ্রীপুর, কামারপুকুর আর মুকুন্দপুর। ত্রিকোণমণ্ডলীকৃত এই গ্রাম তিনটি পরস্পর এত সন্নিবদ্ধ অবস্থায় বিরাজিত ছিল যে বিদেশিদের কাছে এই তিনটি গ্রাম একত্রে ‘কামারপুকুর’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছিল। স্থানীয় জমিদার কামারপুকুরে বাস করতেন বলে এই গ্রামটি আরও দুটি গ্রামের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে।
তবে আমাদের আলোচনার সূচনা কিন্তু কামারপুকুর নয়। শ্রীরামকৃষ্ণ যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আদিবাড়ি ছিল দেরে বা দ্বরিয়াপুর গ্রামে। বেশ কয়েকবছর আগের কথা। এক সকালে দেরে গ্রামে উপস্থিত হয়েছিলাম। দেরে গ্রামে এই পরিবারের আদি গৃহ তখন সবেমাত্র রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধীনে এসেছে। নতুন মন্দির তৈরি হচ্ছে, সেই মন্দিরের সোজাসুজি প্রাচীন আটচালা ধাঁচের একটি মন্দির। সেখানে এক শালগ্রাম পূজিত হচ্ছেন। যে শালগ্রামের কথা আমরা পরে আলোচনা করব। আগে এই দেরে গ্রাম থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কামারপুকুরে চলে যাওয়ার মূল ঘটনাটি জানতে হবে।
সাতবেড়ে, নারায়ণপুর ও দেরে- এই তিনটি সমৃদ্ধ গ্রাম পাশাপাশি। এর মধ্যে সাতবেড়ে গ্রামে এই তিন গ্রামের জমিদার রামানন্দ রায় বাস করতেন। তখন উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক, বাংলার অভিশাপ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কার্যকর হয়েছে। শুরু হয়েছে জমিদারদের শোষণ। গ্রামবাংলার জনজীবন জমিদারদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার অধীন। জমিদার সহৃদয় হলে গ্রামবাসী স্বচ্ছন্দে বাস করেন, আর অত্যাচারী জমিদারদের অস্তিত্ব জন্ম দেয় নানা করুণ কাহিনীর।
এমনই এক অত্যাচারী জমিদার ছিলেন রামানন্দ রায় বা রামকান্ত রায়। সাতবেড়িয়া গ্রামে বাস ছিল তাঁর। রামানন্দ রায়ের পূর্বপুরুষ রামকিরণ রায় সাতবেড়িয়ায় বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করেন। তার সঙ্গে মন্দির। সেই মন্দিরে শালগ্রাম রঘুবীরজিউ, মন্দির সংলগ্ন নাটমণ্ডপ, পাশে অতিথিশালা, গঙ্গাধর নামে শিবের আরও একটি পৃথক মন্দির। সে বিরাট আয়োজন। এর সঙ্গে বিরাট অট্টালিকার অন্দরমহল সাতটি পাঁচিলের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা। এই সাতটি দ্বার বা বেষ্টনীর জন্য স্থানটির নাম হয়েছিল সাতবেড়িয়া।
এই রায় পরিবারের কোনও সদস্যের অনুরোধে, হয়তো রামকিরণ রায়ের সময়ই সুলতানপুর থেকে বলরাম চট্টোপাধ্যায় এই সাতবেড়িয়ার রায় পরিবারের পুরোহিত হয়ে এই অঞ্চলে আসেন। দেরে গ্রামে বসবাস করতে থাকেন। এই বলরাম চট্টোপাধ্যায় হলেন ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষ।
অর্থাৎ আমরা বলতেই পারি এই অঞ্চলে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আগমনই হয়েছিল রঘুবীর নামে এক শালগ্রামকে পূজা-সেবার অধিকার নিয়ে।
বলরাম চট্টোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ পুত্র রামলোচনের একমাত্র পুত্র মানিকরামের জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়। এই নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে রায় পরিবারের পূজা অর্চনায় দিনযাপন করতেন। চট্টোপাধ্যায় পরিবার রামভক্ত বৈষ্ণব। তাঁদের পরিবারের পুরুষদের নামকরণের মধ্যে রাম শব্দটির ব্যবহার তারই প্রমাণ দেয়।
আমরা দেরে গ্রামে যে মন্দিরের কথা প্রথমেই উল্লেখ করেছিলাম সেটি ছিল বলরাম চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত এই বংশের গৃহদেবতা ‘রঘুবীর’-এর মন্দির। এ পর্যন্ত আমরা দুটি প্রতিষ্ঠিত পারিবারিক রঘুবীর শিলার কথা জানলাম। এরপরের অধ্যায় চট্টোপাধ্যায় পরিবারের জন্য খুবই যন্ত্রণাপূর্ণ ছিল। কিন্তু সেই যন্ত্রণা যেন বজ্রের মতো নেমে এসেছিল এক পরম আনন্দকে লাভ করার দৈব পরিকল্পনা রূপে।
ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে রামানন্দ রায়ের পূর্বপুরুষদের সম্পর্ক যথেষ্ট ভালো ছিল। তা তিক্ত আকার ধারণ করল রামানন্দ রায়ের সময়। ধন আছে রামানন্দের, কিন্তু অত্যাচারী তিনি। গ্রামবাসীর জমি গ্রাস করতে তাঁর মতো পটু দ্বিতীয়জন নেই। এই জমি নিয়েই গণ্ডগোলের সূত্রপাত। ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে উত্তরপাড়ার রাজা জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় দুর্গাচরণ মিত্রের কাছ থেকে দেরের পাশে খেজুরবাঁদি, কোকন্দ ইত্যাদি গ্রামের লাটটি কিনে নেন।
এই নিয়ে দুর্গাচরণের সঙ্গে রামানন্দের মামলা শুরু। প্রতিপক্ষ শক্তিশালী, তাই সাক্ষীকেও শক্তিশালী হতে হবে। এই সাক্ষী সংগ্রহের জন্য রামানন্দর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল পুরোহিত বংশস্থ ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের ওপর। এই ব্রাহ্মণের বিশেষ গুণ তাঁর সত্যবাদিতা। মিথ্যা তাঁর গৃহপ্রাঙ্গণে প্রবেশের অধিকার পায় না। তাঁর কথা কেউ মিথ্যা বলে নাকচ করে দেবে না। তাই রামানন্দ তাঁকেই সাক্ষ্য দিতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু সত্যবাদী ক্ষুদিরাম মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি হলেন না।
মামলায় পরাজিত হতে হল রামানন্দকে। তিনি দুর্গাচরণের সঙ্গে মিটমাট করে নিতে বাধ্য হলেন। এই পরিস্থিতিতে তাঁর সমস্ত ক্রোধ গিয়ে পড়ল ক্ষুদিরামের ওপর। অত্যাচারী জমিদার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সাহায্য নিলেন। ওই সময় পরপর দু’বছর খরা ও অতিবৃষ্টির জন্য ঠিকমতো ফসল হল না। ফলে ক্ষুদিরাম সেবার রামানন্দের তালুকদারকে ঠিকমতো ফসল জমা দিতে পারলেন না। ফসল না দেওয়ার অভিযোগে সমস্ত জমি কেড়ে নিলেন রামানন্দ, বাকি থাকল শুধু বাস্তু জমিটুকু।
চট্টোপাধ্যায় পরিবার যখন চরম দারিদ্র্যের মুখোমুখি, তখন রামানন্দ দশ হাজার টাকার মিথ্যা মামলা রুজু করলেন। ফলে বাস্তুভিটাটিও অধিকার করে নিলেন রামানন্দ। শুধু তাই নয়, রায় পরিবার গৃহদেবতার পুরোহিত বংশকে যে দেবোত্তর সম্পত্তি প্রদান করেছিলেন, সেই সম্পত্তিও কেড়ে নিলেন। কিংবদন্তি হল, রামানন্দ তাঁর লেঠেল শিবু চাঁড়ালকে আদেশ দিয়েছিলেন ক্ষুদিরামকে বেঁধে আনতে। লেঠেল বাঁধতে গিয়ে দেখতে পান তাঁর সম্মুখে স্বয়ং জটাজুটধারী শিব দণ্ডায়মান। শিবু তৎক্ষণাৎ ক্ষুদিরামের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে রাতের অন্ধকারে ক্ষুদিরামকে দেরে গ্রাম ত্যাগ করতে সাহায্য করেন।
গ্রাম ত্যাগ করে ক্ষুদিরাম রাতের অন্ধকারে উপস্থিত হলেন কামারপুকুরে। দেরে গ্রাম থেকে গাড়িতে আধ ঘণ্টা দূরে কামারপুকুর। একেবারে পাশের গ্রামই বলা যেতে পারে। কামারপুকুরের জমিদার সুখলাল গোস্বামী ক্ষুদিরামের বন্ধু ছিলেন। এই সজ্জন ও বন্ধুবৎসল সুখলাল বন্ধুর বিপদের দিনে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর উদ্যোগে কামারপুকুর হল চট্টোপাধ্যায়ের নতুন আবাস। যা জগতের কাছে চিরকাল বন্দিত হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনতে লাগল।
ক্ষুদিরামের পিতা মানিকরামের তিন পুত্র ও এক কন্যা। জ্যেষ্ঠ ছিলেন ক্ষুদিরাম। এছাড়া নিধিরাম ও রামকানাই নামে আরও দুই পুত্র ছিল, একমাত্র কন্যার নাম রামশীলা। ক্ষুদিরাম সম্ভবত ১১৮১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাই মানিকরামের মৃত্যুর পর সমস্ত বিষয় সম্পত্তির দায়িত্ব ক্ষুদিরামের ওপর ন্যস্ত হয়। শোনা যায়, দেরে গ্রামে ক্ষুদিরামের প্রায় দেড়শত বিঘা জমি ছিল।
তিনি অর্থকরী অন্য কোনওকিছু বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন কি না জানা যায় না। তাঁর জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মপ্রাণতা। সঠিক ব্রাহ্মণত্বকে তিনি জীবনে প্রতিফলিত করেছিলেন। শূদ্রযাজী ব্রাহ্মণের নিমন্ত্রণ তিনি গ্রহণ করতেন না। সর্বস্বান্ত হয়ে ক্ষুদিরামকে যেদিন দেরে গ্রাম ত্যাগ করতে হয় সেদিনও তিনি তাঁর ধর্মবোধ থেকে বিচ্যুত হননি। সেই বিপদের দিনে সুখলাল শুধু তাঁকে আশ্রয় দিলেন না নিজের বসতবাড়ির একাংশে কয়েকটি চালাঘর চিরকালের জন্য বন্ধুকে দান করলেন। তাঁর সঙ্গে সংসার নির্বাহের জন্য এক বিঘা দশ ছটাক জমির টুকরো প্রদান করলেন। যে জমিটি ‘লক্ষ্মীজলা’ নামে প্রসিদ্ধ হয়েছিল। কারণ অতটুকু জমিতেই আশ্চর্যভাবে সমস্ত বছরের মোটা ভাতের অভাব মিটে যেত। কামারপুকুরে শুধু এই আশ্রয়টুকু নিয়ে ক্ষুদিরামের জীবনযাত্রা শুরু হল নতুনভাবে। তিনি আবার ঈশ্বরের প্রতি পরিপূর্ণ নির্ভরতায় ধ্যান ও সাধনায় মগ্ন হলেন।
আমরা আগেই দেখেছি দেরে গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবার রামায়েত বৈষ্ণবভাবাপন্ন ছিলেন। দেরে গ্রাম থেকে কামারপুকুরে চলে আসার পর এক অদ্ভুত ঘটনার মাধ্যমে ক্ষুদিরাম একটি রঘুবীর শিলা লাভ করলেন। রঘুবীর শিলার অর্থ কিশোর রামের ভজনা। প্রতিটি শালগ্রাম শিলার পৃথক পৃথক রূপ হয়ে থাকে। ক্ষুদিরাম লাভ করলেন রঘুবীর শিলা।
শোনা যায়, একদিন কোনও এক কাজে ক্ষুদিরাম পাশের এক গ্রামে গিয়েছিলেন। কার্য শেষে যখন কামারপুকুরের দিকে অগ্রসর হয়েছেন, তখন গ্রামের শীতল বায়ু ও বৃক্ষের স্নিগ্ধ ছায়া তাঁর মন-প্রাণকে শীতল করে তুলল। তিনি একটি বৃক্ষের তলায় বিশ্রামের জন্য দাঁড়ালেন, হঠাৎ তাঁর শয়নের ইচ্ছা জাগল তিনি সেই প্রান্তরের ধারে বৃক্ষের তলে নিশ্চিন্ত নিদ্রায় ডুবে গেলেন। এই সময় নিদ্রিত ক্ষুদিরাম স্বপ্ন দেখলেন, তাঁর ইষ্টদেবতা নবদুর্বাদলশ্যাম-তনু ভগবান শ্রীরামচন্দ্র একটি বালকের বেশে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে বলছেন, ‘আমি এখানে অনেকদিন ধরে অযত্নে অনাহারে আছি। আমাকে তোমার বাড়িতে নিয়ে চলো। তোমার সেবাগ্রহণ করা আমার একান্ত অভিলাষ!’
বালক রামের মুখে এই কথা শুনে ভক্তিমান ক্ষুদিরাম গদগদ চিত্তে বলতে লাগলেন , ‘প্রভু , আমি ভক্তিহীন ও নিতান্ত দরিদ্র। আমার গৃহে তোমাকে যোগ্য সম্মান করব এমন ধন আমার নেই। দরিদ্রের ঘরে তোমার সেবার অপরাধ হলে আমার পাপ হবে। সুতরাং আমি তোমাকে গৃহে নিয়ে যাই কী প্রকারে?’ ক্ষুদিরামের এই কথায় বালকবেশী রামচন্দ্র আরও খুশি হয়ে বললেন, ‘ভয় নেই ক্ষুদিরাম! আমি তোমার কোনও দোষ গ্রহণ করব না! তুমি আমাকে যেভাবে সেবা করবে, আমি তাতেই তুষ্ট থাকব।’
বালক রামের এই কথা শুনে ক্ষুদিরাম আবেগে ক্রন্দন করে উঠলেন। নিজের কান্নার শব্দে নিজেরই ঘুম ভেঙে গেল। জেগে উঠে আনন্দে বিস্ময়ে অভিভূত হলেন তিনি! তাঁর প্রাণের দেবতা তাঁর ভাঙা ঘর আলো করবেন? তিনি আসবেন? কবে? এ কি সম্ভব? এ কী অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন তিনি?
একটু থিতু হতেই কাছের একটি ধানখেতের দিকে তাঁর চোখ গেল। তিনি বিস্মিত হয়ে দেখলেন, এই স্থানটিই তিনি স্বপ্নে দর্শন করেছেন। কৌতূহলী হয়ে তিনি গাত্রোত্থান করে সেই স্থানে উপস্থিত হয়ে দেখলেন একটি সুন্দর শালগ্রাম শিলার ওপর একটি সাপ ফণা বিস্তার করে রয়েছে। শিলাটি হস্তগত করতে তাঁর মনে প্রবল ইচ্ছা জাগ্রত হল। তিনি সেই দিকে অগ্রসর হতেই সেই ভুজঙ্গও কোথায় অদৃশ্য হল!
ক্ষুদিরাম অনায়াসে সেই শিলাটি গ্রহণ করলেন এবং নিরীক্ষণ করে দেখলেন সেটি নিখুঁত এক রঘুবীর শিলা। ক্ষুদিরামের হৃদয়ে উত্সাহের বন্যা ডাকল, তবে তো তিনি ঠিক স্বপ্নদর্শন করেছেন। এ শিলা তাঁর জন্যই রক্ষিত ছিল। প্রবল উৎসাহ ও আনন্দে তিনি তুলে নিলেন সেই শিলা। নির্জন প্রান্তরে ক্ষুদিরামের ‘জয় রঘুবীর’ ধ্বনি আকাশে বাতাসে মিলিয়ে গেল। বিধাতা অলক্ষ্যে হাসলেন। এতদিনে কামারপুকুরের বাস পরিপূর্ণ হল। কারণ গৃহদেবতা ব্যতীত গৃহ কখনও নির্মিত হয় না! ক্ষুদিরাম সেই নির্জন প্রান্ত থেকে সেই শিলা মাথায় করে গৃহাভিমুখে রওনা হলেন। পরে সংস্কারকাজ সম্পন্ন করে সেই শিলাকে প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর থেকে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের প্রধান সদস্য হলেন রঘুবীর।
‘যা করেন রঘুবীর’ এই নীতি নিয়েই ক্ষুদিরামের জীবন আবর্তিত হতে লাগল। ক্ষুদিরামের এই শিলালাভের ঘটনা নিয়ে কিছু কিংবদন্তির জন্ম হয়েছে, সেই কিংবদন্তি প্রামাণ্য কি না তা আমাদের জানা নেই, তবে বলা হয় নদিয়ার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর গৃহে যে শিলাটি পূজিত হত এবং পরবর্তীকালে যে শিলাটির আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি, সেই শিলাই ক্ষুদিরাম ধানখেত থেকে অলৌকিকভাবে লাভ করেছিলেন। প্রাচীন কোনও কোনও জীবনীতে এই মত ব্যক্ত করা হয়েছে।
তবে রঘুবীর শিলা লাভের আগে ক্ষুদিরাম আরেক দেবীকে গৃহে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি হলেন শীতলা দেবী। গ্রামবাংলায় লোকায়ত ধারায় মনসা ও শীতলা– উভয় দেবীই জনপ্রিয়। সর্পদংশন ও রোগভোগ নিবারণকারিণী এই দুই দেবী বাংলার সমাজমনের আশ্রয়। ম্যালেরিয়া অধ্যুষিত, অপুষ্টিতে খিন্ন মানুষ স্বাস্থ্যের জন্য শীতলার থানে ধর্না দিতেন। ক্ষুদিরাম গৃহে দেবীঘট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সে নিয়ে একটি কিংবদন্তির দেখা পাওয়া যায়। তবে এটিও কতখানি প্রামাণ্য তা গবেষণার বিষয়।
শোনা যায়, ক্ষুদিরামের বন্ধু ধর্মদাস লাহা তখন জমিদার, তখন সেই অঞ্চলে হরিসভা, ইন্দিরা, অমরপুর ইত্যাদি গ্রামগুলিতে কলেরা আর বসন্ত মহামারি আকারে দেখা দেয়। ওষুধ আর বৈদ্যের অভাবে ক্লিষ্ট, ভীতসন্ত্রস্ত মানুষগুলি দিবারাত্র হরিনাম করতে থাকেন। এই সময় মানুষের দুঃখে দুঃখিত ক্ষুদিরাম দিবারাত্র জগৎ জননীর কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন। এইসময় একদিন রাত্রে তিনি স্বপ্ন দেখেন, জগন্মাতা তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, ‘ভয় কী বাবা, আমাকে তোমার ঘরে প্রতিষ্ঠা করো। তোমার ও গ্রামের সকলের মঙ্গল হবে। মহামারির ভয় আর থাকবে না। দামোদর নদ যেখানে উত্তরমুখী হয়েছে, কাল সকালে তুমি সেই জায়গায় গিয়ে স্নান করলে আমাকে পাবে। ঘরে তুলে এনে তা প্রতিষ্ঠা করো। আমি মা শীতলা।’
এই স্বপ্ন দেখে ক্ষুদিরাম পরদিনই সকালে বন্ধু ধর্মদাসের কাছে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে নিয়ে স্বপ্ন নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হন। সেখানে স্নান সমাপন করে উঠতেই ক্ষুদিরাম ঘটটিকে জলে ভাসমান অবস্থায় দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে ঘট জলে পূর্ণ করে মাথায় নিয়ে গৃহে এলেন। যথাবিহিত আচারে দেবীর প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম প্রথম নাকি শীতলাদেবীর পূজায় ছাগবলিও হত। নিষ্ঠাবান ক্ষুদিরামের প্রতি দেবী শীতলা এতই তুষ্ট ছিলেন যে প্রতিদিন সকালে তিনি যখন পূজার জন্য ফুল তুলতে যেতেন, তখন মা শীতলা ছোট্ট বালিকার রূপ ধরে গাছের ডাল নুইয়ে দিতেন। এ যেন ঠিক সাধক রামপ্রসাদের জীবনের কাহিনী। নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব পরিবারের রামভক্তির সঙ্গে এইভাবে মিশেছিল শাক্তভাবনার, দেবীরূপের আরাধনার সংমিশ্রণ।
শ্রীরামকৃষ্ণ ছিলেন ক্ষুদিরামের অধিক বয়সের সন্তান। তখন চট্টোপাধ্যায় পরিবারের জীবনধারা রঘুবীর আর মা শীতলাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। গয়ায় পিণ্ডদান করতে গিয়ে আবার অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখিন হয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। স্বয়ং যিনি শিলারূপে পূজা গ্রহণ করছেন, সেই ভগবান বিষ্ণু জানালেন তিনি সন্তানরূপে তাঁর গৃহে আসতে চান। আবার ক্ষুদিরামের ভয়, দ্বিধা, আবার দেবতার অনুগ্রহ ও ক্ষুদিরামের তাঁর পিতৃত্ব স্বীকার! গৃহদেবতা অনেক গৃহে বিরাজিত, অনেকেরই আগমনের পিছনে আছে অলৌকিকতা কিন্তু গৃহদেবতা রূপে এসে রক্তমাংসে সেই স্বরূপে উপস্থিত হওয়া- সত্যই কামারপুকুরের ওই পরিবার ব্যতীত আর কোথাও পাই না।
গয়া থেকে ফিরে স্ত্রী চন্দ্রামণিকে গর্ভবতী দেখলেন ক্ষুদিরাম। জানতে পারলেন, পাশে যুগীদের শিব মন্দির থেকে জ্যোতির স্রোত এসে নাকি চন্দ্রামণির অঙ্গ স্পর্শ করে গর্ভে প্রবেশ করেছে। সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়েছেন চন্দ্রা। কিন্তু জ্ঞান ফেরা অবধি অনুভব হচ্ছে তিনি গর্ভবতী। ক্ষুদিরামও নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানালেন স্ত্রীকে, তারপর শুরু হল অপেক্ষা। কবে দেবতা নেমে আসেন সন্তান রূপে। গর্ভবতী চন্দ্রামণি এই রঘুবীরের আঙিনায় তখন কত দেবদেবীর দর্শনই না পেতেন। একদিন দেখলেন, এক হাঁসে চড়া ঠাকুর আঙিনায় উপস্থিত। তাঁর মুখটি বেশ লাল! তিনি বললেন, ‘ও হাঁসে চড়া ঠাকুর, রোদে তোমার মুখ লাল হয়ে গিয়েছে, ঘরে আমানি পান্তা আছে। খেয়ে যাও।’ হাঁসে চড়া ব্রহ্মা এ কথা শুনে মৃদু হেসে মিলিয়ে গেলেন। বিষ্ণুর অবতার শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহাঙ্গনে এই ছিল গৃহদেবতার বিস্তৃত ইতিহাস।
