আজ শিশু দিবস। সময় বদলেছে, বদলেছে আচার-আচরণ। শিশুদের বড় হয়ে ওঠার পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। একটা বড় অংশের পরিবার এখন আর একান্নবর্তী নয়। বাবা-মা, দুজনেই হয়তো কাজ করেন। ‘ছোটবেলা’ এখন অনেক স্মার্ট। স্কুলের আগে-পরে কোচিং ও গান, সাঁতারের ক্লাসে ছোটাছুটি আছে। অ্যাসাইনমেন্টের চাপ আছে। দু’পক্ষের ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানো, তার সঙ্গে কথা বলা, ওর মন বোঝার চেষ্টা করা, ভালোমন্দ লাগাকে গুরুত্ব দেওয়া ভীষণ জরুরি। শৈশবের স্মৃতি যেন সুখকর হয় প্রতিটি সম্ভাবনার, সেটা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য হোক।
মাধবী দাস
শিক্ষিকা, মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ হাইস্কুল, কোচবিহার
সময় ও নগরায়ণের হাত ধরে আমূল বদল এসেছে জীবনযাত্রায়। বদলেছে আমাদের চিন্তা-চেতনা আর মূল্যবোধ। এমনকি পারিবারিক বন্ধনের ছবিও। এই পরিবর্তন সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলেছে শিশু-কিশোরদের মনে। প্রতিযোগিতার ভিড়ে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে রঙিন শৈশব, অথচ শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ।
প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরে অধিকাংশ ‘সচেতন’ মা-বাবারা ভাবছেন, সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করানো, বাহ্যিক সচ্ছলতা প্রদান করাই হয়তো একজন প্রকৃত অভিভাবকের দায়িত্ব। অথচ, তাঁরা একথা প্রায় ভুলতে বসেছেন যে, একটি শৈশবের মূল চাহিদা খেলনা বা দামি পোশাক হতে পারে না। বরং তা স্নেহ ও মনোযোগ।
নিজেদের না পাওয়া, অপূর্ণ ইচ্ছে সন্তানদের মধ্য দিয়ে পূরণের তীব্র বাসনা ও অযৌক্তিক প্রত্যাশা এক ভয়ংকর প্রবণতা। এই প্রত্যাশা ও বাসনা চরিতার্থ করতে গিয়ে ছোট থেকেই শিশুর মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা ঢুকিয়ে দিচ্ছেন অনেকে। সবকিছুতেই সেরা হওয়া যেন প্রধান কর্তব্য তাদের। শিশুর কী ভালো লাগে, কী মন্দ- সেকথা ভাবাই হয় না। ‘অমুক বাবুর ছেলে ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে, তোমাকেও হতে হবে’, ‘আমার কলিগের ছেলে আবৃত্তিতে রাজ্য স্তরে পুরস্কার পেয়েছে, তোমাকে এত টাকা খরচ করে শেখাচ্ছি, কেন পারবে না?’, ‘তোমার পিসির ছেলে অলিম্পিয়াডে দুটো মেডেল পেল, তোমার কী হবে?’ এসব কথা শুনে শিশুর মুখে রা নেই। চোখ পিটপিট করে যন্ত্রমানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকে সে। তুলনার দাঁড়িপাল্লায় উঠে ক্রমশ চঞ্চলতা হারিয়ে একা হতে শুরু করে।
ক’দিন ধরেই খেয়াল করছিলাম, প্রতিবেশী একটি ফুটফুটে প্রাণচঞ্চল বছর ছয়েকের কন্যা হঠাৎ কেমন চুপচাপ হয়ে গিয়েছে। আগের মতো লাফিয়ে এসে কোলে উঠে বায়না জুড়ছে না। কথার ফুলঝুরি নেই। মেয়েটির মাকে জিজ্ঞেস করতেই দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এবারের পরীক্ষায় পূর্ণমানের থেকে তিন নম্বর কম পেয়েছে। খুব ছোট ছোট ভুলের জন্য। তাই স্কুলের মিস বকেছেন। সেই থেকে মেয়ে আমার ভীষণ সিরিয়াস!’
ও যে কতটা কষ্ট পাচ্ছে, মানসিক পরিস্থিতি কতটা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে- তা হয়তো আশপাশের কেউই বুঝতে পারছে না। এভাবেই ধীরে ধীরে শিশুমন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। আত্মবিশ্বাস হারায়। বাবা-মাকে তাই সচেতন হতে হবে। মানসিক ও আবেগিক বিকাশ ব্যাহত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। আজ আমরা যদি তাদের মনের কথা না শুনি, তাদের ইচ্ছেকে গলা টিপে মারি, তবে একদিন তারা আবেগহীন ও দায়িত্ব-কর্তব্যহীন যন্ত্রমানবে পরিণত হয়ে সমাজের স্বাভাবিক জীবনধারাকে অমান্য করবে।
কথায় বলে শিশুর ‘সেকেন্ড হোম’ তার বিদ্যালয়। সার্বিক বিকাশে পরিবারের পাশাপাশি স্কুলের বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি বিদ্যালয় ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র সংস্করণ। সেখানে থেকে শিশুরা শেখে সামাজিক ন্যায়-নীতি, দায়বদ্ধতা। হাতেখড়ি হয় সৃজনশীলতা আর খেলাধুলোয়। অথচ আজকাল দেখি, বেশিরভাগ স্কুলেই খাতায়-কলমে পড়ুয়া সংখ্যার তুলনায় উপস্থিতির হার তলানিতে ঠেকছে। অনলাইন কিংবা প্রাইভেট টিউশন নির্ভরতা কমিয়ে বিদ্যালয়মুখী করার ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। সমবয়সি, বন্ধুদের সাহচর্যে মননশীলতা ও সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে।
একসময় যৌথ পরিবার ও প্রতিবেশীদের সান্নিধ্যে শিশুরা রাগ-অভিমান-দুঃখে ফুঁপিয়ে কাঁদার আশ্রয় পেত। এখন নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে হয়তো বাবা-মা দু’জনেই কর্মজীবী। সন্তান বড় হচ্ছে বোর্ডিং, ক্রেশ কিংবা আয়ার কাছে। দিনশেষে বাবা-মা সন্তানের খবর নিচ্ছেন ‘হোমওয়ার্ক করেছ?’, ‘সময়মতো জল খেয়েছ?’, ‘দুষ্টুমি করোনি তো?’। অথচ এর বাইরেও কিন্তু ছোটদের অনেক কথা বলার থাকে। আপনাদেরও শোনার থাকে।
অথচ সেই সময়টুকু কেড়ে নেয় মোবাইল। প্রযুক্তি একদিকে যেমন জ্ঞানের নতুন পথ খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে হয়ে উঠছে মানসিক বিচ্ছিন্নতার কারণ। শিশুরাও মেতে উঠছে ভিডিও গেমসে। আকৃষ্ট হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। পাশের বাড়ির ছেলের নাম না জানলেও গেমের দৌলতে হরিয়ানা কিংবা জাপানে তার ‘ফ্রেন্ড’ জুটে যায়।
এখানেও শুধরে দেওয়ার দায়িত্ব অভিভাবকের। ছোটরা তো ভুল করবেই। বকাঝকা নয়, বরং উষ্ণ আলিঙ্গনে চিনিয়ে দিতে হবে সঠিক রাস্তা। একজন বন্ধু হিসেবে সমাজের নেতিবাচক দিক, কোন জিনিসের কী কুপ্রভাব এবং কতটা ক্ষতি- তা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে হবে। শত ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানকে সময় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে রুটিনে রাখতে হবে। তাকে পড়াশোনায় সাহায্য করা, একসঙ্গে খেতে বসা, ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। আপনার বৃদ্ধকালে আজকের নবজাতকরাই কিন্তু হয়ে উঠবে নিরাপদ আশ্রয়।
শিশুর রঙিন শৈশব রং ছড়াবে আগামীর সমাজে। আলোকিত হবে আমাদের দেশকাল। সেই সম্ভাবনাকে লালন করার দায়িত্ব আপনারই কাঁধে।
