লাভের গুড় পিঁপড়ে খায়! সুখের দিন শেষ হতেই বিএনপির বিরুদ্ধে ফুঁসছে জামাত

লাভের গুড় পিঁপড়ে খায়! সুখের দিন শেষ হতেই বিএনপির বিরুদ্ধে ফুঁসছে জামাত

সিনেমা/বিনোদন/থিয়েটার
Spread the love


একে কী বলবেন, ‘নেপোয় মারে দই’! না কি, ‘লাভের গুড় পিঁপড়ের পেটে’?
নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লা, সারজিস আলম, সজীব ভুঁইয়াদের মুখ বাংলাদেশে ভোটের ফল বেরনোর পর জাস্ট দেখা যাচ্ছে না! থমথমে ভয়ার্ত চেহারা। স্বর ভেঙে গিয়েছে। গো-হারা হেরেছে তাদের জামাত জোট। এক রাতে বদলে গিয়েছে প্রশাসনের মুখটাও। দেশজুড়ে তাদের কর্মীদের উপর হামলা হলেও পুলিশ পাত্তা দিচ্ছে না। যারা ‘স‌্যর’ বলে স‌্যালুট করছিল, তারাই বলছে, ‘একটু পাশে গিয়ে দাঁড়ান’। সুখের দিন শেষ হতেই নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন ক’-দিন আগেও হাতে মাথা কাটা নেতারা।

আরও পড়ুন:

আওয়ামি লিগের একটি করে পার্টি অফিস খুলছে, আর তাঁরা ক্ষোভে ফুঁসছেন বিএনপির উপর। অক্ষম আক্ষেপ, আন্দোলন করে শেখ হাসিনাকে তাড়ালাম আমরা, আর সিংহাসনে বসছেন তারেক রহমান– ৫ আগস্ট ’২৪-এর আগে যিনি স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না লন্ডন থেকে বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন! বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কারাবন্দি অবস্থায় মৃত্যুপথযাত্রী হয়ে পড়ায় দলের কার্যক্রম থমকে গিয়েছিল। হেরে হেরে অস্তিত্বের সংকটে থাকা দলের পার্টি অফিসগুলির তালা খোলার লোক ছিল না গ্রামগঞ্জে। ভবের এমন খেলা সেই দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া দল দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় চলে এল। কোন ম‌‌‌্যাজিকে এই অসম্ভব সম্ভব হল!

এলাম-দেখলাম-জয় করলাম! ডিসেম্বরের শেষে মায়ের মৃত্যুর মুহূর্ত আসন্ন বুঝে তিনি এলেন, আর মধ‌্য ফেব্রুয়ারিতে তিনি হয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভিতর কী এমন রবিনহুডের ছায়া পদ্মাপাড়ের মানুষ দেখলেন যে, একেবারে চেয়ারে বসিয়ে দিলেন! এমনটা হতে যাচ্ছে বুঝতে পারলে কি মহাম্মদ ইউনুস জামাই আদর করে এয়ারপোর্ট থেকে তাঁকে বাসায় পৌঁছে দিতেন?

বাঙালিত্বে বিশ্বাসী সিংহভাগ মানুষ ধর্মের বোরখায় ঢুকতে চায় না। জামাত নেতারা ‘ভাল হয়ে গিয়েছি’ বলে যতই ক্ষমা চান, মানুষ তাঁদের ‘রাজাকার’-ই মনে করে। সঙ্গী অতীব পক্ব খানকতক অর্বাচীন যুবক, যারা নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে দাবি করে, তাদের হাতে দেশ তুলে দিতে সাধারণ বাংলাদেশিরা চাননি।

অঙ্ক কিন্তু খুব জটিল ছিল না। হাসিনাকে তাড়িয়েছিল পাকপন্থী ‘মুক্তিযুদ্ধ’-বিরোধী রাজাকার জামায়াতে। ছাত্ররা ছিল মুখ। বিএনপি এই আন্দোলনে ছিল না। গণভবন লুঠের পর ইউনুসকে প‌্যারিস থেকে নিয়ে এসে পুতুল নবাবের আসনে বসানো হয়। আওয়ামি লিগকে ‘নিষিদ্ধ’ করে একতরফাভাবে হাসিনার ফাঁসি ঘোষণা হয়। ক্ষমতা দখল করে জামায়াতে সাত তাড়াতাড়ি ভোটে যেতে চায়নি। ‘সংস্কার’-এর নাম করে ইউনুস থেকে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপ ও নেপালের অভ্যুত্থানের পর ভোট ঘোষণা হওয়ার তাঁরা চাপে পড়েন। তদুপরি জামায়াতের অঙ্ক ছিল, আওয়ামি যেহেতু নেই, শক্তিহীন বিএনপিকে ভোটে রাখতে হবে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বোঝাতে। প্রশাসন হাতে, অনায়াসেই জিতে জয় হবে।

কিন্তু বাঘের ঘরে যে ঘোঘের বাসা রয়েছে তাঁরা যদি জানতেন! নিয়মিত বাংলাদেশের খবর রাখি বলেই ‘চুপচাপ শীষে ছাপ’ হাওয়া অনুমান করেছিলাম। ঢাকার সাংবাদিক বন্ধুরা ছাড়াও রাজনৈতিক দলগুলির নেতৃত্বের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। এবং পশ্চিমবঙ্গে আত্মগোপন করে থাকা আওয়ামি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই এই কলামেই দুই সপ্তাহ আগে পরিষ্কার লিখেছিলাম, বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারে। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের হাতে রয়েছে বিএনপির জয়ের চাবিকাঠি। ভোট বয়কটের ডাক দেওয়া ছাড়া হাসিনার কিছু করার ছিল না। ভোট মানলে নিজের নির্বাসন মেনে নেওয়া। বিদেশ থেকে নেতারা নির্দেশিকা দিলেও গ্রামীণ আওয়ামী সমর্থকদের সমস‌্যা ছিল গভীর। ভোট দিতে গেলে আক্রমণ হতে পারে, না গেলেও চিহ্নিত হওয়ার ভয়। ফলে অনুমান করেছিলাম, আওয়ামি ভোটের তিনটি ভাগ হতে পারে। একাংশ সাহস করেই ভোট দিতে যাবেন না। একটি অংশ ভোট দিতে গিয়েও ব‌্যালট নষ্ট করবেন। আর একটি বড় অংশ সরাসরি ভোট দেবেন বিএনপি প্রার্থীদের। কার্যক্ষেত্রে হলও তাই।

আওয়ামি লিগগের পরোক্ষ সমর্থনে বাংলাদেশে ১৮ মাস পরে পালাবদল। বিএনপি প্রার্থীরা প্রচারে নেমে বুঝতে পারেন জামায়াতে-বিরোধী আওয়ামি সমর্থকদের সমর্থন পেলে তাঁরা জিতে যাবেন। ফলে গ্রামে গ্রামে গিয়ে তাঁরা অভয় দিয়ে বলতে শুরু করেন, ইউনুসকে হারিয়ে দিলে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার সুযোগ থাকবে। আওয়ামি লিগ অফিসগুলি খুলে কাজ করতে দেওয়া হবে। হাসিনা সমর্থকদের এই সুযোগ নেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ ছিল না।

তারেক হাসিনাকে নিয়ে ভারতের সঙ্গে লড়াই চাইবেন না বলেই কূটনৈতিক মহলের অনুমান। তিনি জানেন ঐতিহাসিক কারণে কখনওই ঢাকার হাতে হাসিনাকে তুলে দেবে না নয়াদিল্লি। সেই প্রেক্ষাপটে হাসিনাকে উপেক্ষা করাই হতে পারে তাঁর নীতি।

ভোট মিটতেই জয়ের আনন্দে পথে নেমে পড়েন নৌকা চিহ্নের সমর্থকরা। অবাধে একের পর এক অফিস খুলে টাঙিয়ে দেন ‘বঙ্গবন্ধু’-র ছবি। কেউ বাধা দিচ্ছে না। বিএনপির এক জেলা সভাপতিকে দেখা গেল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আওয়ামির পার্টি অফিস খুলে দিচ্ছেন। অসহায়ভাবে সেই দৃশ‌্য দেখতে দেখতে জামায়াতে শিবিরের ছাত্রনেতাদের মুখে আবার জুলাই আন্দোলনের মতো পথে নামার হুমকি। কেউ কেউ এও বলে দিচ্ছেন, হাসিনার সময় খারাপ কী ছিল! যদিও এসব এখন মূল‌্যহীন।

আওয়ামি কর্মীরা উল্লসিত হলেও শেখ হাসিনার সসম্মানে দেশে ফেরার সম্ভাবনা কতটা? খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর পদ্মাপারে দুই অবিসংবাদিত নেত্রীর মেরুকরণ ভেঙে গিয়েছিল। দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা নিয়ে জিয়াপুত্র প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ নেওয়ার পর অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়লেন না তো ‘বঙ্গবন্ধু’-কন‌্যা? কারণ তারেক ৫ বছর থাকছেনই। ৮০ ছুঁইছুঁই হাসিনা ৫ বছর পর ৮৫-তে পা দেবেন। তারপর! এটা ঠিক, বাংলাদেশের এই ভোটে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ অংশ নেয়নি। ছাপ্পা হয়েছে দেদার। কিন্তু দিনের শেষে ভোটের ফল স্বস্তি এনেছে সমাজে। স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, বাঙালিত্বে বিশ্বাসী সিংহভাগ মানুষ ধর্মের বোরখায় ঢুকতে চায় না। জামাত নেতারা ‘ভাল হয়ে গিয়েছি’ বলে যতই ক্ষমা চান, মানুষ তাঁদের ‘রাজাকার’-ই মনে করে। সঙ্গী অতীব পক্ব খানকতক অর্বাচীন যুবক, যারা নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে দাবি করে, তাদের হাতে দেশ তুলে দিতে সাধারণ বাংলাদেশিরা চাননি। ‘বঙ্গবন্ধু’-র মূর্তির মাথায় প্রস্রাব, রবীন্দ্রনাথের জাতীয় সংগীত বাতিলের চেষ্টা, ‘মুক্তিযুদ্ধ’-র চেতনা মুছে দেওয়া, মুক্ত চিন্তার ‘ছায়নট’ তছনছ থেকে সংবাদমাধ‌্যমের উপর আক্রমণ করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে তারা আফগানিস্তান বানাতে চায়।

মাত্র দেড় বছরেই দাদাগিরি, দখলদারি ও দুর্নীতিতে মানুষ তিতিবিরক্ত। তাদের জন‌্য প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে অহেতুক সীমান্ত উত্তেজনার সৃষ্টি। কোথায় বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা বলা হবে, তা নয়, ‘সেভেন সিস্টার্স’ দখল নিয়ে হুমকি। অখণ্ড বাংলা গড়ার উন্মাদ হুংকার। পাকিস্তানের হাত ধরে নিজের অর্থনীতিতে কুড়ুল মারা আয়োজন করেছিল এসব ছেলেপুলের দল। এই পাগলামো চলছিল একজন নোবেলজয়ী ব‌্যক্তির মদতে। অরাজকতাকে বলা হচ্ছিল ‘সংস্কার’। স্বাভাবিকভাবেই সোনার বাংলা রসাতলে যাক মানুষ চাননি। হিংসা-আগুন, ভাঙচুর-হত‌্যা, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ দেখে সাধারণ মানুষও ক্লান্ত। তাই আওয়ামী-বিএনপি সমর্থকদের মিলমিশে এই ফল।

বিএনপি নেতৃত্ব ইতিমধ্যে বলছে, তারা বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। কাউকে ‘নিষিদ্ধ’ করার পক্ষে নয়। তবে লিগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠলেও হাসিনার পক্ষে দেশে ফিরে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। কারণ জুলাই গণহত‌্যা-সহ নানা অতীত ঘটনাকে জড়িয়ে তাঁকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে বাংলাদেশের আদালত। তারেক তাঁকে ‘মুক্তি’ দেবেন? হাসিনার জন‌্যই তিনি ১৭ বছর দেশে ফিরতে পারেননি। খুন-দুর্নীতির মামলায় ফেঁসেছিলেন। ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে, দেখতে আসতে পারেননি। মা জেলবন্দি হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, ভিডিও কলে দেখতে হয়েছে। এরপর হাসিনা সম্পর্কে তারেকের কোনও মায়া-দয়া থাকার কথা নয়। ফলে তিনি ‘প্রতিশোধ’ নেবেন, না কি ‘উদার’ হবেন, সেটা সময় বলবে। তারেক হাসিনাকে নিয়ে ভারতের সঙ্গে লড়াই চাইবেন না বলেই কূটনৈতিক মহলের অনুমান। তিনি জানেন, ঐতিহাসিক কারণে কখনওই ঢাকার হাতে হাসিনাকে তুলে দেবে না নয়াদিল্লি। সেই প্রেক্ষাপটে হাসিনাকে উপেক্ষা করাই হতে পারে তাঁর নীতি। ফিরিয়ে দিতে ভারতের উপর তিনি যেমন শর্ত বা চাপ বাড়াবেন না, তেমন হাসিনার বিরুদ্ধে মামলাও প্রত‌্যাহার হবে না। এতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।

আরও পড়ুন:

তবু ইতিহাস অতীত মনে করায়। ৪৫ বছর আগে এই হাসিনাকেই নির্বাসন থেকে দেশে ফিরিয়ে আনেন তাঁর পিতৃদেব জিয়াউর রহমান। বাবার পথে কি হাঁটবেন ছেলে? না কি অন্তরালেই শেষ হবে মুজিব-কন‌্যার কাহিনি?

সর্বশেষ খবর

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *