রূপায়ণ ভট্টাচার্য
বছর কয়েক হল কলকাতা ও মুম্বইয়ের মিডিয়ায় দুই অভিষেককে নিয়ে পরস্পর বিরোধী খবর বেরিয়েছে প্রচুর। সে খবর ভুল প্রমাণিত হয়েছে বারবার। কিছুদিন চুপ করে থাকার পর আবার সেই একই কথা লেখা হয়েছে। যথারীতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘোরাঘুরি করেছে প্রবল গতিতে।
কী খবর? মুম্বই থেকে খবর আসত অভিষেক বচ্চনের সঙ্গে ঐশ্বর্য রাইয়ের ডিভোর্স চূড়ান্ত! ছাড়াছাড়ি নিশ্চিত! এখন আলাদা থাকছেন তাঁরা!
কলকাতার খবর থাকত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতের অমিল প্রকাশ্যে। নতুন তৃণমূল ও পুরোনো তৃণমূল দ্বন্দ্ব প্রবল।
দুটো ক্ষেত্রেই দেখা যেত, ভবিষ্যদ্বাণী কিছুতেই মিলছে না। দুটো খবরেই বারবার দেখা যেত, দুই অভিষেকের কারও কোনও মন্তব্য নেই। মন্তব্য ছাড়াই খবর লেখা যে কত বিপজ্জনক ও হাসির খোরাক, দুই অভিষেকের ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
মহালয়ার দিন জাগো বাংলার শারদীয় অনুষ্ঠানে দেখা গেল, মমতার পাশের চেয়ারে অভিষেক বসে। মাঝে একবার মমতা পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন অভিষেকের। দুজনের আচরণে পরিষ্কার, এই মুহূর্তে কোনও দ্বন্দ্ব নেই তৃণমূলের সর্বোচ্চ মহলে। কিছু ইস্যুতে মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সেটা মনকষাকষির পর্ব থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। বোঝাপড়ার বন্ধন আপাতত প্রশ্নাতীত। অভিষেকের সামনে এখন অনেকটা জমি ফাঁকা। পিসি শোভনের ব্যাপারটাও অভিষেকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।
একুশে জুলাই বাদ দিলে আপাতত শাসকদলের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠান হচ্ছে মহালয়াতেই। বিধানসভা ভোটের আগে তাদের এই অনুষ্ঠান অনেকগুলো জিনিস দেখিয়ে দিয়ে গেল। অতীতে গণশক্তি দেখলে বা পড়লে তৎকালীন শাসকদলের অন্দরের অনেক খবর বেরিয়ে আসত। এখনকার জাগো বাংলাতেও তাই। খবর এবং ছবির ব্যবহার দেখলে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কোন নেতা, মন্ত্রীর কত দর দলের ভিতরে। দক্ষিণপন্থী সব দলে এই ধরনের ঘটনা খুব স্বাভাবিক। তৃণমূলে এখন অরূপ-ববির সঙ্গে কুণাল ঘোষের বাজারই সবচেয়ে ভালো। শুক্রবার দেখলাম, কুণাল এখন সর্বভারতীয় স্তরেও মুখপাত্রের কাজ করছেন। বক্তব্য রাখছেন হিন্দিতে।
জাগো বাংলার অনুষ্ঠান থেকেও আগের আমলের গণশক্তির মতো বেরিয়ে আসে অনেক সমীকরণ। পরিস্থিতি বুঝতে আরও সাহায্য করে দুটো জিনিস। একটা, অনুষ্ঠানের মঞ্চের দৃশ্যাবলি, আরেকটা পার্টির শারদ সংখ্যার বিজ্ঞাপন।
সেই বিজ্ঞাপনের লেখক তালিকা সাজানো দেখলেই আরও স্পষ্ট হয়ে যায়, পার্টির কাছে কোন কোন নামগুলো এখন গুরুত্বপূর্ণ সবচেয়ে। পর্যবেক্ষণগুলো এমনিতে মজার। সবচেয়ে বড় অক্ষরে নাম মমতার। মাঝারি অক্ষরে নাম অভিষেকের। দুটোই তো খুব স্বাভাবিক। আরও স্বাভাবিক, মমতা-অভিষেকের পরেই জাগো বাংলা সম্পাদক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম।
অস্বাভাবিক হল, পরের নাম বিন্যাস। তিনজনের পরেই অরূপ বিশ্বাস, ববি হাকিম। বোঝা যাচ্ছে, মমতার সবচেয়ে দুই বিশ্বস্ত মন্ত্রী জমাট অবস্থানেই। এঁদের মধ্যে একটু এগিয়ে অরূপই। অতীতে অনেকবার লেখা হয়েছে, দুজনের কাজকর্মেই অভিষেক লবি ক্ষুব্ধ। সেই সমস্যাও আপাতত মিটেছে মনে হচ্ছে। অনুষ্ঠানে তিনজনের ছবিও তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বরং সৌগত-সুদীপ-সুব্রত-মানসরা অনেকটা পিছনে চলে গিয়েছেন।
কারা কারা থাকছেন দক্ষিণ কলকাতার দুই মন্ত্রীর পরেই? তৃণমূলের পত্রিকার উৎসব সংখ্যা বলছে, দলের প্রথম পাঁচের পাঁচজনই দক্ষিণ কলকাতার।
পরপর আছেন ব্রাত্য বসু, শশী পাঁজা, পার্থ ভৌমিক, গৌতম দেব, বীরবাহা হাঁসদা। এখান থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় অনেকগুলো। ১) শিক্ষাক্ষেত্রে ডামাডোল ঠেকাতে ব্রাত্য ব্যর্থ হলেও দলে তাঁর গুরুত্ব যথেষ্ট। ২) কলকাতা শহরের নারী মুখ হিসেবে উত্তরের শশীই এগিয়ে দক্ষিণের চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের তুলনায়। ৩) নতুন মুখের মধ্যে অনেক এগিয়ে গিয়েছেন অন্য পার্থ। চিরঞ্জিতের এলাকার পুরোনো বারাসত স্টেডিয়ামকে উপেক্ষা করে যেভাবে ঘাসফুলের বাগান হয়ে ওঠা আইএফএ পরপর লিগের ম্যাচ দিয়েছে নৈহাটি, কল্যাণীতে, সেটার পিছনেও পার্থ। সুজিত বসু লেখক তালিকায় জায়গা পাননি, কিন্তু পার্থ আছেন। ৪) শিলিগুড়িতে অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে জেরবার হলেও মমতা-অভিষেকের খাতায় মেয়র গৌতমের নম্বর এখনও ভালোই। তাঁর কোনও বিকল্প এখনও নেই। উত্তরবঙ্গ থেকে উৎসব সংখ্যায় গৌতম ছাড়া লেখক হিসেবে কোনও নেতাকেই দেখলাম না। জানি না চোখ এড়িয়ে গেল কি না। তবে এর মানে দিদির চোখে উত্তরের এক নম্বর নেতা আজও গৌতম। ৫) ববি বাদে মুসলিম নেতা হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেমন সামিরুল ইসলাম। ডেরেক ও’ব্রায়েন লেখক তালিকায় না থাকলেও সামিরুল আছেন।
রাজনীতির অঙ্ক ছাড়াও তৃণমূলের অনুষ্ঠান থেকে দুটো আলাদা জগতের সমীকরণ বেরিয়ে আসছে। সেটা একেবারেই সুখের নয়। ভাগাভাগির।
বাণিজ্যিক গান ও বাণিজ্যিক সিনেমা— অতীতে বাম সরকার এই দুটো জিনিসকে পাত্তাই দিত না। তৃণমূল দিচ্ছে। এটা যেমন খুব ভালো দিক, খারাপ হচ্ছে, দুটো ক্ষেত্রেই নিজের স্বার্থ রক্ষায় বড় বেশি ঢুকে পড়ছেন কিছু নেতা। মমতা-অভিষেক হস্তক্ষেপ না করায় ভাবমূর্তি খারাপ হচ্ছে পার্টির।
সিনেমায় যেমন দুই র- রঘু ডাকাত ও রক্তবীজ ২-এর প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়ায় যুদ্ধ চালাচ্ছেন দুই শিবিরের ঘনিষ্ঠরা। রঘু ডাকাত তৃণমূলের সাংসদ দেবের ছবি। কিন্তু জনাকয়েক তৃণমূল নেতা ওই ছবিকে ছোট করতে বদ্ধপরিকর। তাঁরা আবার দৃষ্টিকটু প্রচার চালাচ্ছেন রক্তবীজের হয়ে। ছবির এক পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সটান তৃণমূলের অনুষ্ঠানেই চলে আসেন। মমতাকে প্রণাম করেন, অভিষেকের সঙ্গে কথা বললেন। তার প্রভাব দেখা গেল শুক্রবারই। রক্তবীজের রেটিং জাগো বাংলা দিল দশে সাড়ে সাত। পাশাপাশি রঘু ডাকাত সেখানে দশে মাত্র পাঁচ। দেবের অভিনয় নিয়ে বেশ কটাক্ষও রইল। লেখা হল, ছবিতে দেবকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছাপিয়ে গেছেন সহ অভিনেতারা। তৃণমূলের কিছু নেতা বোঝাই যাচ্ছে সিনেমার বাজারে তাঁদের সংসদ সদস্যকে হারাতে তৎপর। কী খেলা যে হয়!
দেবের ছবির প্রযোজক ও কিছু অভিনেতার ওপর তৃণমূলের কিছু নেতার রাগ, তাঁদের বিজেপি ও সিপিএমের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলে। দল আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলছে না। তবে দলের সৈনিকরা যা করার করছেন। দেবের ছবির বিরুদ্ধেই চলছে প্রচার। মাঝ থেকে ক্ষীর খেয়ে যাচ্ছেন তৃণমূল সাংসদ-অভিনেতার বিপক্ষ শিবির।
ছবি মুক্তির আগে প্রকাশ্যে মুখ্যমন্ত্রীর আশীর্বাদ নিতে যাচ্ছেন পরিচালক, এ দৃশ্য কবে দেখেছে বাংলা? বেশি যোগাযোগের এটাই দোষ। এই টালিগঞ্জ কোনও দাদাগিরির স্বরূপ খোলার জন্য কখনও এক হতে পারে না।
জাগো বাংলার উৎসব সংখ্যাটা আর একটা খবর অজান্তেই জানিয়ে দেয়। পার্টিতে এত তারকা সাংসদ ও বিধায়ক রয়েছেন। তাঁরা লেখক তালিকায় ব্রাত্য। তৃণমূল কি ভবিষ্যতে এই ধরনের চরিত্রদের প্রার্থী করবে না আর?
সাহিত্য পত্রিকার অনুষ্ঠানে সাহিত্যিকদের অনুপস্থিতি যেমন প্রশ্ন তুলে দেয়, ঘনিষ্ঠ সাহিত্যিকদের কাজে কি তৃণমূল নেত্রী বিব্রত ও ক্ষুব্ধ?
গানের ব্যাপারেও ভাগাভাগির খেলা এমনই প্রবল। জাগো বাংলার অনুষ্ঠানে যে সপ্তরথীকে দেখা গেল, তাঁদের সরকারি অনুষ্ঠানে নিয়মিত দেখা যায়। নচিকেতা, শ্রীরাধা, ইন্দ্রনীল, বাবুল, রূপঙ্কর, মনোময়, ইমন। সঙ্গে দুই নতুন গায়িকা ছিলেন। যাঁরা সরকারি অনুষ্ঠানেও নিয়মিত সুযোগ পান।
প্রশ্নটা অন্য। মমতার জন্য এখন সরকারি গানের অনুষ্ঠান অনেক বেড়়েছে, এটা ভালো দিক। ভালো দিক, আগের মতো শুধু কলকাতাকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান হচ্ছে না। সব চাপা পড়ে যাচ্ছে শিল্পীদের ডাকার ক্ষেত্রে রাজনীতির জন্য। শ্রীকান্ত আচার্য, ইন্দ্রাণী সেন, স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত, শুভমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো পরিচিতরাই ডাক পান না। বাকিদের কথা ছেড়েই দিন। এই বৈষম্যের মানেটা কী, বিশেষত যেখানে মন্ত্রীসভায় রয়েছেন দুই প্রতিষ্ঠিত গায়ক। সম্ভবত সপ্তরথীর মতো বাকিরা কেউ নিয়মিত পার্টির দাদাদের সঙ্গে খেজুর করতে যেতে রাজি নন। তাই দিনের পর দিন বঞ্চিত।
বাণিজ্যিক গান এবং সিনেমায় মমতা আগ্রহ দেখাচ্ছেন, জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো উপেক্ষা দেখাচ্ছেন না, এটা খুব ভালো কথা। কিন্তু তাঁর অজান্তে পার্টিরই কিছু নেতা দুটো ক্ষেত্রে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন, অনেকের নামে মিথ্যে বলে কান ভারী করছেন, বিপদে পড়ছেন বহু শিল্পী। অনেক অযোগ্য আবার আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন দিব্যি।
এর চেয়ে বুদ্ধবাবুদের মতো সম্পূর্ণ উপেক্ষার চোখে দেখাই বরং ভালো।
