মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ইরান এবং ইজরায়েলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সম্প্রতি নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। এই সংঘাত (Iran-Israel Battle) কেবল দুটি দেশের সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক সূক্ষ্ম রাজনৈতিক সমীকরণ। ইজরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর টিকে থাকার অন্যতম কৌশল হিসেবেও কাজ করছে।
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, আমেরিকা (US) ও ইজরায়েলের (Israel) সঙ্গে এই সম্মুখসমরের সঙ্গে ইরানে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ প্রশমনের সরাসরি কোনও সম্পর্ক আছে কি? আরও সহজভাবে বলা যায়, ওই বিদ্রোহ দমনে যুদ্ধ কি কোনও অস্ত্র হয়ে উঠল তেহরানের? কিংবা ইরানি শাসক গোষ্ঠীর সেই কৌশলে ডোনাল্ড ট্রাম্প কি আসলে সহায়কের ভূমিকা পালন করলেন।
গত কয়েক বছর ধরে ইরান অভূতপূর্ব অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। বিদ্রোহী তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নারীর জীবন, স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন, কঠোর পোশাকবিধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক দুর্দশা- সব মিলিয়ে ইরানের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন বারবার।
সরকারের বিরুদ্ধে দফায় দফায় গণবিক্ষোভ ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সর্বশেষ সেই বিক্ষোভে দেশের বণিক সম্প্রদায় যুক্ত হয়ে পড়ায় সিঁদুরে মেঘ দেখেছিল আয়াতোল্লা খামেনেই-এর প্রশাসন। মাস দেড়েক আগেও শাসকের নির্মম দমনপীড়নে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। বিভিন্ন হাসপাতালে এখনও পড়ে আছে ব্যাগবন্দি বেশকিছু লাশ।
ঠিক এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে ইজরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ ইরানের শাসক গোষ্ঠীর জন্য ‘সেফটি ভালভ’ বা চাপ কমানোর উপায় হিসেবে কাজ করছে। বিদ্রোহী জনগণের ওপর অত্যাচার হলে ওয়াশিংটন চুপ করে বসে থাকবে না বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হুমকি দিয়েছিলেন। বাস্তবে ট্রাম্প কতটা ইরানের বিদ্রোহী জনতার পাশে দাঁড়ালেন- সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
ইরানে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও যুদ্ধ- এই দুই ঘটনার মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং কৌশলগত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এর ব্যাখ্যাও আছে। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘র্যালি অ্যারাউন্ড দ্য ফ্ল্যাগ’ বা জাতীয় ঐক্যের তত্ত্ব। যখন কোনও দেশ বাইরের শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হয় বা যুদ্ধের পরিস্থিতিতে থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ প্রবল হয়ে ওঠে।
ভারতে পুলওয়ামার ঘটনা তার বড় প্রমাণ। যার ওপর ভিত্তি করে ২০১৯-এ ভারতে বিপুল জয় পেয়েছিল বিজেপি। ইরানের সরকারও যুদ্ধের আবহে দেশ আক্রান্ত বলে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়ে অভ্যন্তরীণ বিভেদকে কার্যত রাশ টানতে সফল হয়েছে। সাধারণভাবে আর ইরান সরকার নয়, ইরানি জনতার সামনে ইজরায়েলকে ‘সাধারণ শত্রু’ হিসেবে দাঁড় করানো গিয়েছে।
যুদ্ধের ডামাডোল অনেক সময় দেশের অভ্যন্তরে দমনপীড়নকে পরোক্ষভাবে বৈধতাও দেয়। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়ে সরকার যে কোনও সরকার বিরোধী আন্দোলন, ধর্মঘট বা প্রতিবাদকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ বা ‘বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্র’ বলে জনতার সামনে দেগে দিতে পারে। তখন সেসব দমন করা সহজ হয়। সামরিক উত্তেজনা জিইয়ে থাকলে মানবাধিকার আন্দোলন এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হয়। সংবাদমাধ্যমের মনোযোগও তখন ঘুরে যায় সীমান্তের দিকে।
যুদ্ধ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা থেকেও মানুষের দৃষ্টি সরিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জেরে ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি, আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্ব নিয়ে সৃষ্ট তীব্র ক্ষোভ ইতিমধ্যে যুদ্ধের দামামায় অনেকটা চাপা পড়ে গিয়েছে। যদিও এই সংঘাত হয়তো সাময়িকভাবে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহকে স্তিমিত করতে পারবে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান করতে পারবে না।
মানুষের মৌলিক অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দাবি কখনও চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। অভ্যন্তরীণ সংকটের মূল কারণগুলোর সমাধান না হলে যুদ্ধের ধোঁয়াশা কেটে গেলেই ক্ষোভের আগুন আবার জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
