বিদেশে মুসলিম নেতাদের সঙ্গে দহরম-মহরম, স্বদেশে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা। এ মোদি কেমন মোদি?
রূপায়ণ ভট্টাচার্য
বলিউডে সর্বকালের সেরা ডাবল রোলের তিনটে সিনেমা কী? সিনেমার ওয়েবসাইটগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করলে দেখা যায় দিলীপকুমারের ‘রাম অউর শ্যাম’, হেমা মালিনীর ‘সীতা অউর গীতা’ এবং শ্রীদেবীর ‘চালবাজ’ সবার ওপরে। অমিতাভ-শাহরুখের ডন তাদের নীচে।
তো ভারতীয় রাজনীতিতে ডাবল রোলের কথা বললে সবার আগে চলে আসবে নরেন্দ্র মোদির (Narendra Modi) নাম। ভারতে তাঁর ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’ ‘হিন্দু হৃদয় রক্ষক’ কতরকম নাম! অষ্টোত্তর শতনাম! তাঁর ভক্তরা দেশের চারদিকে মুসলিমদের ওপর ঘৃণা ছেটাচ্ছেন, দেশ থেকে তাড়ানোর মনোভাব। অথচ বিদেশের মাটিতে মোদিই হয়ে দাঁড়াচ্ছেন ‘গ্লোবাল পিসমেকার’, আরব দুনিয়ার প্রবল বন্ধু।
মোদি এই যে ইজরায়েলে (Israel) ঘুরে বেড়ালেন কী স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে! শুনছি, এটা তাঁর ৯৯তম বিদেশ সফর। অথচ এই লোক আবার প্যালেস্তাইনেরও বন্ধু। আমাদের দেশে মোদি ভক্তদের দৌলতে যখন ঘৃণা ঘৃণা এবং ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরব দুনিয়ার শেখদের কী প্রেম কী প্রেম! সঙ্গে আবার ইজরায়েলেরও। ধুরন্ধর-টু সিনেমা আগেই দেখা হয়ে গেল!
ক’দিন আগে মিরাটে মোদির নামে মেট্রো উদ্বোধন হল এবং প্রথম ট্রেনে দেখা গেল মুসলিমদের উদ্দেশ্যে হিন্দুদের জয় শ্রীরাম উন্মত্ত চিৎকার! সেখানে আবার প্রান্তিক স্টেশনের নাম মোদিপুরম। মোদি এগুলো থামাতে যান না, বরং উসকে দিয়ে দেশকেই দুটো ভাগ করে দিয়েছেন! মুসলিম রাষ্ট্রে গিয়ে সেই লোকই আবার গলায় গলায় জড়িয়ে ধরেছেন শেখদের। আয় ভাই, বুকে আয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় (Social Media) একটা রসিকতা চলে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদি যতবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহি গিয়েছেন, ততবার হয়তো মুম্বইয়ের লোকেরা লোকাল ট্রেনে থানে পর্যন্তও যাননি।
এইভাবে মোদি ভারতে হিন্দুত্ব হিন্দুত্ব করে পরদিনই হয়তো রওনা হয়ে গিয়েছেন সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহরিন, ইরান, জর্ডন, প্যালেস্তাইন, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া। মোদির পাসপোর্টে মুসলিম দেশগুলোর স্ট্যাম্প উপচে পড়ছে।
এতে দোষের কিছু নেই। এটাই তো হওয়া উচিত। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ সবার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখবে এটাই স্বাভাবিক। স্যালুট মোদি। কিন্তু স্যর, আপনি এটা বলুন তাহলে দেশের ভেতরে এই হিন্দু মুসলিম দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখার দরকারটা কি আছে?
আমরা ভারতবাসীরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে ঘৃণার দুর্গ তৈরি করছি মোদি মন্ত্র জপে! আর ওদিকে প্রধানমন্ত্রী দিব্যি আছেন। চেষ্টা চালাচ্ছেন বিশ্বগুরুর স্বীকৃতি পেতে। আর ওদিকে বিশ্বগুরুর ভক্তকুল ক্রমাগত দেশের মধ্যে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ছড়াচ্ছে অকারণ।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এসব দেশে গিয়ে মোদির বিখ্যাত ‘ডিপ্লোম্যাটিক হাগ’। দেশে মোদি ভক্তরা বলছেন ‘ভাগ, মুসলিম ভাগ’। রাজ্যের নব্য বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীও বলছেন ‘ভাগ, মুসলিম ভাগ।’ আর ওদিকে মোদি পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোতে ঘুরে করছেন ‘হাগ’ এবং ‘হাগ’। আলিঙ্গন এবং আলিঙ্গন। আলিঙ্গনের কতরকম রূপ, তা মোদির আগে কেউই জানাননি আমাদের।
এসব দেশে কিন্তু গিয়ে ‘হাগ’ করেই মোদির কাজ শেষ হয় না। চুক্তিও হয় প্রচুর। দুবাইয়ের মলে বসে এখন আপনি ইউপিআই স্ক্যান করে দিব্যি শিঙাড়া খেতে পারবেন। রূপে কার্ডও চলবে সেখানে। আবু ধাবিতে বিশাল মন্দির তৈরি হয়ে গেল শেখদের দেওয়া জমিতেই। বাপরে বাপ। মন্দিরের নাম বাপস।
আমাদের দেশের অলিম্পিকে সোনাটোনা বেশি লোকের নেই, সবাই জানেন। মোদি কিন্তু আরব থেকে সেখানকার সর্বোচ্চ অসামরিক সোনার পদক জিতে নিয়েছেন। সৌদি থেকে কিং আবদুল আজিজ স্যাশ, আমিরশাহি থেকে অর্ডার অফ জায়েদ, প্যালেস্তাইন থেকে গ্র্যান্ড কলার অফ দ্য স্টেট অফ প্যালেস্তাইন, মিশর থেকে অর্ডার অফ দ্য নাইল। অথচ দেখুন, তিনি আবার ইজরায়েলে গিয়ে জড়িয়ে ধরছেন নেতানিয়াহুকে।
যে মুসলিম দেশ ১৯৭১ সাল থেকে সবসময় নিঃশর্ত সমর্থন করেছে ভারতকে, সেই ওমানে দু’বার গিয়েছেন মোদি। আমিরশাহিতে রাশিয়ার মতোই ৭ বার। আমেরিকা, ফ্রান্স, জাপানের পরেই। সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, উজবেকিস্তান, মালদ্বীপে তিনবার করে।
তাঁর দলের নেতারা, সে যোগী হোন বা শুভেন্দু, মুসলিমদের নিয়ে কথা বলতে গেলেই বলবেন, পাকিস্তানে যাও। বাংলাদেশে যাও। ওদিকে, মোদি ঘনঘন ঘুরে বেড়াবেন মুসলিম দেশে। নেপাল থেকে হিন্দুরা বেআইনিভাবে এসে উত্তরবঙ্গ ভরিয়ে দিলে শুভেন্দু চুপ থাকবেন। অথচ এঁরাও বেআইনি অনুপ্রবেশকারী।
মোদি এত দেশের মধ্যে পাকিস্তানটা বেশি যান না একটু চক্ষুলজ্জার খাতিরে। তারপর দেশটা আবার একেবারে ঘরের কাছে। লোক ছিছিক্কার করতে পারে। রাম অউর শ্যামের খেলাটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে মোদির ট্যুর ডায়েরি থেকে পাকিস্তান বাদ।
একেকসময় এসব দেখে মনে হয় চারদিকে কোনও মেহবুব বা জনি ওয়াকারের সিনেমা দেখছি। আমাদের দেশে বুলডোজার, এনআরসি, হিজাব, হালাল বিতর্ক, অনুপ্রবেশ সব চলছে অকারণ। উত্তরপ্রদেশে ইচ্ছে করে ফতেপুর সিক্রি বা সিকান্দ্রাকে গুরুত্বহীন করে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে পর্যটক আর যান না। বানিয়ে ফেলা হচ্ছে মথুরা- বৃন্দাবন-আগ্রা করিডর। ভাগ্যিস বিদেশি মুদ্রার লোভে তাজমহলকে বাদ দেওয়া যায় না, নইলে আগ্রাও বাদ হত। আর ওদিকে গিয়ে শেখদের সঙ্গে গলাগলি, মসজিদ পরিদর্শন আর কোরান উপহার দেওয়া চলছে। আর আমাদের লখনউতে দিন-দিন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে মুসলিম স্থাপত্যগুলো। যা শিয়াদের কাছে অশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলার সেই সব কপালে লাল টিপ দেওয়া মোদি ভক্তদের মুখ মনে পড়ছে, যাঁরা সংখ্যালঘু বয়কটের হুমকি দেন আর কিছুক্ষণ পরে টিভিতে দেখেন তাঁদের ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’ আবু ধাবিতে ‘আহলান মোদি’ ইভেন্টে শেখদের সঙ্গে উচ্ছ্বাসে ভাসছেন।
কোথায় একটা পড়লাম, মোদি কোম্পানির মতে, দেশে যার নাম মেরুকরণ, বিদেশে তারই নাম হচ্ছে বিশ্বায়ন। ভারতীয় মুসলিম যেন আলাদা প্রজাতি।
এই দ্বিচারিতার কিন্তু শেষ নেই। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভেতে মোদি ভক্তদের ঢুকিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার বহু শহরে নতুন বিতর্ক তৈরি করছে। কোন মসজিদে বহু যুগ আগে মন্দির ছিল সেটা দেখাই তাদের একমাত্র কাজ। কাশীর জ্ঞানবাপী, মথুরার মসজিদ নিয়ে কত কিছু কেলেঙ্কারি হল। নাম ঢুকে গেল আজমেরেরও। ওদিকে, মোদি সৌদি আরবে গিয়ে রাজা সলমানকে দিলেন ভারতের প্রাচীনতম মসজিদ কেরলের শিরামন জুমা মসজিদের সোনার জল করা রেপ্লিকা! সৌদির কাছে আমাদের তেল দরকার! তাই তেলও দিতে হবে ভাই! মোদি ভক্তরা মসজিদে মসজিদে মন্দির খুঁজে বেড়াচ্ছেন আর তাঁদের ‘হৃদয় সম্রাট’ মসজিদের রেপ্লিকা নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশে। বাহবা নন্দলাল!
মনে আছে, বিজেপির এক মুখপাত্র ২০২২ সালে ইসলাম এবং হজরত মহম্মদকে নিয়ে এত অপমানজনক কথা বললেন, কাতার-কুয়েত-সৌদি প্রচণ্ড ধমক দিল সাউথ ব্লককে। পেট্রো ডলার সব যায় যায়! বিজেপি সরকার অতি দ্রুত বিবৃতি দিল এসব মন্তব্য নাকি বিচ্ছিন্ন কিছু উন্মাদের কাজ। এই উন্মাদরা যখন আলাদা আলাদাভাবে প্রতি মুহূর্তে মানুষ খেপিয়ে যাচ্ছে, ধর্মে ধর্মে বিভেদ ঘটাচ্ছে, তখন কিন্তু মোদি সরকারের উগ্র হিন্দুরা একেবারে চুপ। তখন তো পেট্রো ডলারের হিসেব নেই কোনও।
মোদির এসমস্ত কাজে তাঁর ভক্তরা প্রবল ধর্মসংকটে পড়েন। আবার সামলে নেন। কেননা দেশে একরকম নিয়ম, বিদেশে আরেকরকম নিয়ম। মোদির কট্টর সমর্থকরা ইজরায়েলের জয়ধ্বনি তোলেন, ভরিয়ে দেন ফেসবুক, আবার প্যালেস্তাইনে মোদি খেতাব পেলে চুপ করে যান।
শুধু মুসলিম দেশ বলে তো নয়, গত দু’মাসে যা দেখলাম তাতে চক্ষু ছানাবড়া করে দেখা ছাড়া কোনও উপায় নেই। চিনের সঙ্গে কী ভয়ংকর তিক্ত সম্পর্ক! অথচ আমাদের দেশে তখনও চিনা সামগ্রী উপচে পড়ছে। মোদি ভক্তরা কিনছেও লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে।
ক’দিন আগে দেখলাম রাশিয়া এবং চিনের সঙ্গে মোদির দোস্তাদোস্তি। ট্রাম্পের সঙ্গে দোস্ত দোস্ত না রহা, জাতীয় মুকেশের গান।
আবার এক মাস পরেই দেখলাম ছবিটা পালটে গিয়েছে। পুতিনকেই বলা হচ্ছে দোস্ত দোস্ত না রহা। স্কুল-কলেজের পরীক্ষায় স্ববিরোধিতার উদাহরণ লিখতে বললে এগুলোই লিখে দেওয়া যেতে পারে। ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি। ইউক্রেনেও আছি, রাশিয়াতেও আছি। আরবেও আছি, ইজরায়েলেও আছি! শুধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্টাইলে একটা জায়গায় লেখা যাবে না। বিদেশের মুসলিমে আছি, ভারতের মুসলিমে নেই!
