মিথ্যের ইট গেঁথেই পতন ওয়ালের

মিথ্যের ইট গেঁথেই পতন ওয়ালের

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


 

  • প্রসূন আচার্য

দুটো বিশ্বযুদ্ধ কেন হয়েছিল? সাম্রাজ্য বিস্তারে পুঁজির সংঘাতে বা দ্বন্দ্বে।

অরবিন্দ কেজরিওয়াল কেন হারলেন? সহজ উত্তর হচ্ছে ক্ষমতা দখলের জন্য দুই হিন্দুত্ববাদী দলের মধ্যে সংঘাতে।

সেক্ষেত্রে ঠিক ভুল যাই হোক, একটি রাজনৈতিক দল জিতল। যারা আজ প্রধান হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে গোটা বিশ্বে পরিচিত। এবং মনে রাখতে হবে, ২৭ বছর পরে! অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদির দিল্লি দখলের প্রায় ১১ বছর পরে। যা গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ লক্ষণ।

আর ক্রমাগত মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে, মানুষকে প্রভাবিত করে, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগের পাহাড় সাজিয়ে, তার ওপরে রাজার মতো বসে থেকে, কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য বিদেশের টাকায় একটা এনজিও থেকে দল হয়ে ওঠা অরাজনৈতিক নেতার একদিন যা হওয়ার ছিল, তাই হয়েছে। কেজরিওয়াল হেরেছেন। এবং এই সংকট থেকে তাঁর পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো মুশকিল।

গত কয়েকদিনে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ইন্ডিয়া জোটের অনেক নেতাই আঙুল তুলে বলেছেন, কংগ্রেস আসলে ভোট কেটে হারিয়ে দিল! জোট হলে হারত না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে আরম্ভ করে উদ্ধব শিবসেনার নেতা সঞ্জয় রাউথ, অনেকেই এই কথা বলেছেন। একদা বিজেপির সঙ্গে সুখে ঘর করা আদতে জাতীয় কংগ্রেস বিরোধী এই দুই আঞ্চলিক দলের নেতারাও খুব ভালো করে জানেন, রাজনীতিতে দুয়ে দুয়ে চার হয় না। পাঁচও হয় বা ছয় হয়। তাই, আম আদমি পার্টি সাড়ে ৪৩ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়েছে, আর কংগ্রেস ৬ শতাংশের কিছু বেশি- এই দুটো যোগ করলে বিজেপির সাড়ে ৪৫ থেকে বেশি হয়ে যাচ্ছে মানেই বিজেপির হেরে যেত- বিষয়টা এমন সহজ নয়।

পরিসংখ্যান বলছে, কংগ্রেস আর আপ দুই দলের ভোটের যোগফল করলে, ১৪ আসনে বিজেপির থেকে বেশি। তার মানে যদি ধরে নেওয়া হয়, জোট হলে এই ১৪ আসন বিজেপি হারত, তার থেকে মূর্খামি কিছু হয় না। কারণ, জোট হলে মানুষ একভাবে ভোট দেয়। না হলে অন্যভাবে।

আচ্ছা, এই আপ-দরদিরা কিন্তু একবারও বলছেন না, আজ থেকে প্রায় ৬ মাস আগে দলের সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়াল ঘোষণা করে দেন, দিল্লির ভোট আপ একাই লড়বে। এর পরে ধাপে ধাপে সবার আগে প্রার্থীদের তালিকা ঘোষণা করতে থাকেন কেজরি। তাঁর এবারের পরামর্শদাতা টিম কিন্তু আইপ্যাক। অর্থাৎ অনেক আঁটঘাঁট বেঁধেই কেজরি নেমেছিলেন।

২০২০ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি পেয়েছিল ৩৮ শতাংশ ভোট। কিন্তু আসন মাত্র ৮টি! কংগ্রেস ৪ শতাংশ ভোট পেলেও কোনও আসন জেতেনি। আর আপ সাড়ে ৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ৬২টি আসন জিতেছিল। অর্থাৎ সোজা হিসেবে দুটি বিধানসভার ৫ বছরের হিসেবে ভোটে আপের ভোট কমেছে ১০ শতাংশ। আর বিজেপির ভোট বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ। কংগ্রেস বেড়েছে ২ শতাংশ। অর্থাৎ সোজা হিসেবে দিল্লিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আপের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে ভীষণভাবে।

লোকসভায় যেহেতু আপ এবং কংগ্রেস জোট হয়েছিল, আর বিজেপি বিপুল ভোটে সবক’টি লোকসভা জিতেছিল, তাই এই হিসেব ধরা হচ্ছে না।

এখন প্রশ্ন হল, কেন কেজরির জনপ্রিয়তা কমল?

কলকাতায় কয়েক মাস আগে আপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত ভূষণ এসেছিলেন। পরবর্তীকালে একনায়ক অরবিন্দ তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দেন। একান্ত আলাপচারিতায় প্রশান্তকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, অরবিন্দ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? বলেছিলেন, ‘এত বড় ধুরন্ধর, মিষ্টি মিষ্টি করে মিথ্যা কথা বলে মানুষের মন জয় করার মতো শিক্ষিত রাজনীতিক আমি জীবনে দেখিনি। ওর পুরোটাই মুখোশ। মাঝে মাঝে বসে ভাবি, মানুষ চিনতে এত বড় ভুল কী করে করেছিলাম!’ শুধু প্রশান্ত ভূষণ নয়, যোগেন্দ্র যাদব, সাংবাদিক আশুতোষ থেকে সকলেই এই ভুল করেছিলেন।

এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় অরবিন্দর পুরোনো কথার কিছু ক্লিপিংস ঘুরছে। যে কেউ চাইলেই দেখতে পাবেন। বিদেশের টাকায় কংগ্রেসকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ‘ইন্ডিয়া এগেনস্ট করাপশন’ মুভমেন্টের সময় কীভাবে তিনি, আন্না হাজারে, কিরণ বেদি সবাই মিলে বৈঠক করেছেন, সেই ছবিও ঘুরছে।

কীভাবে মঞ্চ থেকে অরবিন্দ একের পর এক মিথ্যে কথা বলেছেন। সব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই নিয়ে বই আছে। ক্যারাভান ম্যাগাজিনে বিস্তারিত রিপোর্ট আছে।

‘নিজে সাধু আর অন্যরা চোর’ এই ক্যাচলাইন সঙ্গে নিয়ে গদিতে বসেছিলেন কেজরি। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর আসল চেহারা বেরিয়ে পড়তে শুরু করে। দ্বিতীয় দফার সরকার গড়ার পরে আরও স্পষ্ট হয় ব্যাপারটা।

পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে দিল্লির দাঙ্গায় কেজরির ভূমিকা। সব থেকে মানুষ মারা যায়, আহত হয়, বাড়ি পোড়ে মুসলিম মহল্লায়। কিন্তু অরবিন্দ ছিলেন নিশ্চেষ্ট। এর পরে ২০০০ সালের ভোট জিতেই সোজা চলে যান হনুমান মন্দিরে পুজো দিতে। মনে রাখবেন, আপ কিন্তু কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির বিরোধিতা করেনি। এমনকি এনআরসি এবং সিএএ-রও বিরোধিতাও করেনি। অর্থাৎ এইবার ভোটের আগে মোদির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে শুধু মোদির গুরু আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতকে চিঠি লেখাই নয়, প্রতিটা পদক্ষেপে একজন আদ্যন্ত হিন্দুত্ববাদী নেতার যা যা করা উচিত, গত ১০ বছরে অরবিন্দ তাই তাই করেছেন। এমনকি মোদি যেমন নিজেকে ‘নন বায়োলজিক্যাল’ বলে দাবি করেন, গুজরাটের ভোটে তাঁকে পিছনে সরিয়ে দিয়ে অরবিন্দ বলেছিলেন, ‘সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণ ভগবান আমাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আমি ঈশ্বরের অংশ!’

অথচ পরবর্তীতে আমরা দেখেছি, একের পর এক আপের মন্ত্রী দুর্নীতির দায়ে জেলে গিয়েছেন। এমনকি অরবিন্দ পর্যন্ত। উপমুখ্যমন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া জেলে ছিলেন। অর্থাৎ প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, ‘সবাই চোর আর আমি সাধু’ এই ক্যাচ লাইন কত মিথ্যে ছিল।

বাকি রইল দিল্লির বায়ু দূষণ আর যমুনা নদীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ, যমুনা সাফাই। দুটো কাজেই কেজরি চরম ব্যর্থ। যেটুকু সরকারি কর্মীদের ভোট সঙ্গে ছিল, সেটাও বাজেটে ১২ লক্ষ টাকা অবধি কর ছাড় দিয়ে মোদি তুলে নিয়েছেন। সব থেকে বড় কথা, মূলত বিহার সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে কেজরির ভোট এবং আসন দুই ভীষণভাবে কমেছে। এখানে গরিব এবং মূলত সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ বাস করেন। তাঁদের মধ্যেও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অরবিন্দ সম্পর্কে।

ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। এনজিও করা কেজরির ডিক্টেটরশিপে চলা পার্টি হেরেছে। আগামীদিনে কিন্তু কেজরির এই দলের অবস্থা আরও সঙ্গিন হবে।

(লেখক সাংবাদিক)

The submit মিথ্যের ইট গেঁথেই পতন ওয়ালের appeared first on Uttarbanga Sambad.



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *