(২০২৬-এর আগে তৃণমূলের অন্দরে ক্ষমতার রাশ নিঃশব্দে হাতবদল হচ্ছে, যেখানে মমতার ছবি সরিয়ে দলের একক মুখ হয়ে উঠছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।)
সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যত এগোচ্ছে, বঙ্গ রাজনীতির সমীকরণ ততই পালটাচ্ছে। একটা সময় ছিল, যখন তৃণমূল কংগ্রেস মানেই ছিল একটিমাত্র মুখ, একটিমাত্র নাম, একটিমাত্র আবেগ—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর হাওয়াই চটি আর সুতির শাড়িই ছিল দলের আইডেন্টিটি। এরপর সময়ের নিয়মে হোর্ডিংয়ে মমতার পাশে জায়গা পেলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এখনকার দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ— হাইওয়েগুলো এখন শুধুই দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের একক আধিপত্যের সাক্ষী। বিশাল হোর্ডিংয়ে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর অমলিন হাসি উত্তরাধিকারের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। মমতার ছবি ছাপিয়ে এই নিঃশব্দ পটপরিবর্তন বুঝিয়ে দিচ্ছে, ‘যুবরাজ’ রাজ্যাভিষেকের জন্য প্রস্তুত। প্রশ্ন একটাই, সেই মাহেন্দ্রক্ষণ কবে?
ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ইতিহাসে কখনও মসৃণ হয়নি, আর তৃণমূল কংগ্রেসের মতো একটি আবেগমথিত দলের ক্ষেত্রেও তার কোনও ব্যতিক্রম ঘটছে না। দলের অন্দরে, বিশেষ করে ‘ওল্ড গার্ড’-দের মধ্যে কানাকানি, চাপা গুঞ্জন এবং অস্বস্তি এখন আর কোনও গোপন বিষয় নয়। অরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত বক্সীদের মতো প্রবীণ নেতাদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দলের আদি এবং অন্ত। অন্যদিকে সায়নী ঘোষ বা দেবাংশু ভট্টাচার্যের মতো তরুণ প্রজন্ম চাইছেন, দলে অবসরের বয়সসীমা কড়াকড়িভাবে কার্যকর হোক। তাঁদের যুক্তি, আধুনিক রাজনীতিতে নবীন রক্তের আগ্রাসন ভীষণ জরুরি। এর ঠিক মাঝখানে কুণাল ঘোষ, ডেরেক ও’ব্রায়েনের মতো নেতারা হাওয়া বুঝে অত্যন্ত সন্তর্পণে ভারসাম্য বজায় রাখছেন। তৃণমূলের অন্দরে এই ‘জেনারেশনাল শিফট’ বা প্রজন্মের সংঘাত আজ আর জল্পনা নয়, এক রূঢ় বাস্তব। পোড়খাওয়া নেতারা মনে করছেন, মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার জন্য অভিষেকের এই নীরব তাড়াহুড়ো দলের ভেতরের ভারসাম্যকে জটিল করে তুলছে।
তবে রাজনৈতিক মহলের অনেকেই এই কথা একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, দলের অন্দরে যতই অন্তর্দ্বন্দ্ব থাকুক না কেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে, বিশেষ করে নারী এবং যুবসমাজের মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। এর নেপথ্যে রয়েছে তাঁর সুকৌশলী রাজনৈতিক চাল। অভিষেক বরাবরই নিজেকে ‘সবার চেয়ে স্বচ্ছ’ ইমেজে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আরজি কর বা যুবভারতীর মতো বিতর্কিত ইস্যুতে যখন রাজ্য তোলপাড়, মানুষের ক্ষোভ ফেটে পড়ছে, অভিষেক তখন অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজেকে সেই পঙ্কিল আবর্ত থেকে শত যোজন দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তাঁর এই পরিকল্পিত নীরবতা আসলে একটি নিশ্ছিদ্র রাজনৈতিক ঢাল, যার মাধ্যমে তিনি রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থা বা দলের অন্য নেতাদের গায়ে লাগা দুর্নীতির কালো দাগ নিজের সাদা শার্টে লাগতে দেননি। তিনি বাংলার মানুষকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন— এই পুরোনো পচা গলিত সিস্টেমের তিনি অংশ নন; তিনি এক স্বচ্ছ, কর্পোরেট আধুনিক রাজনীতির প্রবক্তা।
এই আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে তাঁর ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’। নিজের লোকসভা কেন্দ্রকে তিনি একটি পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সেখানে ‘সেবাশ্রয়’-এর মতো বৃহৎ সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় অত্যাধুনিক স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দিয়েছেন। বিনামূল্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের চিকিৎসা, ছানি অপারেশন, রক্ত পরীক্ষা থেকে শুরু করে ‘ডক্টর অন হুইলস’ বা কোভিডকালের ১০০ শতাংশ টিকাকরণ— সবেতেই নিজেকে একজন ডেভেলপমেন্ট-ফোকাসড দক্ষ প্রশাসক হিসেবে প্রমাণ করেছেন। গোটা বাংলার সামনে এটাই তাঁর ব্লু-প্রিন্ট।
আধুনিক রাজনীতির আসল লড়াইটা হয় মানুষের মনস্তত্ত্বে বা পারসেপশন তৈরিতে। আর মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে প্রয়োজন মিডিয়ার ওপর নিরঙ্কুশ দখল। অভিষেক রাজনীতি এবং কর্পোরেট প্রচারের এই যুগলবন্দির সত্যটি খুব ভালো করেই অনুধাবন করেছেন। তাই অত্যন্ত সুকৌশলে এবং নিঃশব্দে তিনি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর নিজস্ব বৃত্তের বিশ্বস্ত লোকেদের এবং ‘ফ্রন্ট ম্যান’-দের মাধ্যমে বিভিন্ন মিডিয়া হাউসের দখল নেওয়ার এক অঘোষিত প্রক্রিয়া চলছে বলে রাজনৈতিক ও সাংবাদিক মহলে জোর চর্চা। এই সংবাদমাধ্যমগুলোর কাছে অঘোষিত কিন্তু কড়া নির্দেশিকা— তৃণমূল কংগ্রেস দল হিসেবে কতটা সফল বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ্য সরকার কী কাজ করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ফোকাস এবং কভারেজ পাবে ব্যক্তি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচার। তাঁর আধুনিক ভাবমূর্তি, তাঁর ঝাঁঝালো বক্তব্য, তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা এবং তাঁর দূরদর্শিতাকে প্রতিনিয়ত গ্লোরিফাই করে মানুষের সামনে তুলে ধরাই হল এই মিডিয়া স্ট্র্যাটেজির মূল লক্ষ্য।
এই গোটা রাজনৈতিক দৃশ্যপট এবং অন্দরমহলের টানাপোড়েন থেকে চোখ এড়িয়ে যায়নি প্রধান বিরোধী দল বিজেপির। তারাও অভিষেকের এই অপ্রতিরোধ্য উত্থানকে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দায় ব্যবহার করতে আটঘাট বেঁধে নেমেছে। ২০২১ সালে মমতার ‘২৯৪ আসনেই আমি প্রার্থী, আমাকে দেখে ভোট দিন’ ন্যারেটিভ প্রবল সফল হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট একদম ভিন্ন। বিজেপি খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে, মমতার আবেগের দুর্গে সরাসরি আঘাত করা কঠিন। তাই তারা এবার নিশানা ঘুরিয়ে দিয়েছে অভিষেকের দিকে। সদ্য শুরু হওয়া বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’-য় এসে খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা তাঁর প্রচারাভিযানে সরাসরি হুংকার দিয়েছেন—‘আপনারা যদি ফের তৃণমূলকে ভোট দেন, তবে মনে রাখবেন, এবার আর মমতা দিদি শাসন করবেন না, শাসন করবে ভাইপো। আপনারা কি চান ভাইপো এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হোক?’ বিজেপির এই ন্যারেটিভের উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার এবং তীক্ষ্ণ। তারা একদিকে তৃণমূলের সাধারণ ভোটারদের মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দিতে চাইছে যে, মমতাকে ভোট দিলে আসলে শাসনক্ষমতা চলে যাবে অভিষেকের হাতে। অন্যদিকে, দলের অন্দরে পুরোনো ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে যে বিভাজনের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে, তাতে ঘৃতাহুতি দিয়ে তৃণমূলকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ দ্বিধাবিভক্ত করে দেওয়াই পদ্ম শিবিরের মূল লক্ষ্য।
এত প্ররোচনার মধ্যেও অভিষেক প্রকাশ্যে অত্যন্ত সংযত। জনসমক্ষে তিনি নিজেকে একজন অনুগত ও শৃঙ্খলাপরায়ণ সৈনিক হিসেবেই তুলে ধরছেন। দলের কর্মী, সমর্থকদের প্রতি তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ২০২৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ফের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসাতে হবে এবং সেই লক্ষ্যেই সবাইকে একজোট হয়ে ঝাঁপাতে হবে। তবে তাঁর এই প্রকাশ্য আনুগত্যের পেছনে নিন্দুকেরা অন্য কারণ খুঁজলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এর নেপথ্যে রয়েছে রূঢ় বাস্তবের স্বীকৃতি। অভিষেক জানেন, গ্রামবাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একক জোরে ক্ষমতায় আসার মতো জাদুকরি জনভিত্তি তাঁর এখনও ১০০ শতাংশ মজবুত হয়নি। বাংলার গ্রামীণ ভোটারদের কাছে এখনও ‘দিদি’ এক প্রবল আবেগ। সেই আবেগকে সরিয়ে রেখে নিজের সাম্রাজ্য স্থাপন করার সময় হয়তো এখনও আসেনি। তাই সরাসরি মসনদ দখলের লড়াই এই মুহূর্তে তাঁর জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতি এখন এক টানটান রোমাঞ্চকর থ্রিলারের শেষ অঙ্কে এসে পৌঁছেছে। রাস্তার ধারের হোর্ডিং বদলেছে, দলের অন্দরের সমীকরণ বদলেছে, বিরোধী আক্রমণের অভিমুখও বদলেছে। প্রবীণদের অভিমান আর নবীনদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার মাঝে তৃণমূল আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে। অভিষেক নিজেকে প্রতিনিয়ত আরও ধারালো করছেন, ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ দিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা প্রমাণ করছেন এবং অনুগত মিডিয়ার মাধ্যমে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করছেন। কিন্তু চূড়ান্ত মুকুট পরার জন্য তাঁকে এখনও সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতেই হবে। ২০২৬-এর নির্বাচন তাই শুধু তৃণমূল-বিজেপির লড়াই নয়, এটি ঘাসফুল শিবিরের অন্দরের রূপান্তরেরও এক চরম অগ্নিপরীক্ষা।
