ভোট সামনে না থাকলে কি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে হত যে চা শ্রমিকের মজুরি এত কম! ২৫০ টাকা দৈনিক মজুরিতে যে সংসার চলে না- এই উপলব্ধি হতে সময় লাগল অনেক। আবার অভিষেকের ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজু বিস্টের মনে হল, আর তো মাত্র ক’টা দিন, জাতীয় শ্রম নীতি কার্যকর হলে চা শ্রমিকের মজুরি ৩৫০ টাকা হয়ে যাবে।
এক কদম এগিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী মনসুখ মান্ডব্য জানালেন, শুধু মজুরি বৃদ্ধি নয়, জাতীয় শ্রম আইনে ইএসআই, গ্র্যাচুইটি, শ্রমিক পরিবারের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা ইত্যাদি নানা সুবিধা মিলবে চা বাগানে। শ্রম আইনটি কিন্তু সংসদে গৃহীত হয়েছে অনেকদিন। তাহলে এতদিনে উত্তরবঙ্গে এসে মান্ডব্যের আইনটির কথা মনে হওয়ার কারণ কি সামনে ভোট? কীসের ভিত্তিতে দার্জিলিংয়ের সাংসদ দৈনিক মজুরি ৩৫০ হবে বললেন? মজুরি নির্ধারণের মানদণ্ডটি ঠিক কী, তা যেমন অভিষেকের ভাষণে ছিল না, তেমনই নেই বিস্টের কথায়।
তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হঠাৎ শুধু চা শ্রমিকের সমস্যা শুনতে উত্তরবঙ্গে চলে এলেন। যেন এতদিন সমস্যাগুলি তাঁর দল বা তাঁর দলের সরকারের জানা ছিল না! শ্রমিকদের ডাক দিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী করে দিন, ৩০ দিনের মধ্যে মজুরি ৩০০ টাকা হয়ে যাবে। মুখ্যমন্ত্রীর পদে তো এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই আছেন। গত ১৫ বছর ধরেই আছেন।
প্রশ্ন তোলা কি অস্বাভাবিক হবে যে, তাহলে এতদিনে কেন মজুরি ৩০০ টাকা করে দেওয়া গেল না! প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী থাকাকালীন নির্মলা সীতারামন বেশ কয়েকবার উত্তরবঙ্গে এসে বন্ধ চা বাগান খোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। চা বাগানের পরিকাঠামো উন্নয়নে প্যাকেজের কথা শোনা গিয়েছিল। বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। এখন চা শ্রমিকের মজুরি ও অন্য সুযোগসুবিধার কথা মান্ডব্য ও বিস্টের মনে পড়ছে কি সামনে ভোট আছে বলেই?
চা শিল্পে শ্রমিকের মজুরি নিয়ে তিন বছর অন্তর অন্তর চুক্তির প্রথাটাই বরং তৃণমূল জমানায় উঠে গিয়েছে। ওই চুক্তি হত মালিক ও শ্রমিকের। সরকারকে আলোচনায় অংশ নিতে হলে চুক্তি হত ত্রিপাক্ষিক। সেই প্রথাটা তুলে দিয়ে এখন মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি হয়ে গিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছে িনর্ভর। শ্রমিকদের অসন্তোষের আঁচ টের পেলে তিনি একতরফা অ্যাড হক মজুরি বৃদ্ধি ঘোষণা করে দেন।
অথচ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দীর্ঘদিনের দাবিটাকেই ঠান্ডাঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ন্যূনতম মজুরি ঠিক করতে যে বিশেষ কমিটি গড়া হয়েছিল, সেই কমিটির আর কোনও তৎপরতা দেখা যায় না। মুখ্যমন্ত্রী যে মজুরির অ্যাড হক বৃদ্ধি ঘোষণা করেন, তাকে শ্রমিক বা মালিক- কোনও পক্ষের মতামত থাকে না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যদি উপলব্ধি করেই থাকেন যে, ২৫০ টাকা মজুরিতে সংসার চলে না, তাহলে এই সরকার থাকতে থাকতেই কেন ৩০০ টাকা করে দেওয়া হচ্ছে না?
আবার অভিষেকের ৩০০ ঘোষণার পরদিনই রাজু বিস্টের ৩৫০ টাকা মজুরি ঘোষণা নিছক কাকতালীয় নয়। বরং ভোট বড় বালাই বলে নিলামের ডাকের মতো মজুরি বৃদ্ধির পরিমাণের আশ্বাস নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। পাহাড় ও লাগোয়া সমতলে উত্তরবঙ্গে চা শ্রমিকদের ভোট যে সত্যিই বালাই। এই ভোট নির্ধারক শক্তি তো বটেই।
এখন তো চা শ্রমিকের স্বার্থে কে বা আগে করিবেক দান, তার লাগি প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছে। মজুরি বাড়ানোর আশ্বাসের এই হইচই চললেও এখন এই শীত মরশুমে যে বেশকিছু চা বাগান বন্ধ হয়ে আছে, তা নিয়ে কোনও মহলের কোনও উচ্চবাচ্য নেই। ফলে মজুরি নিয়ে এই শোরগোল যে শুধুই ভোটের মরশুমি, তা বুঝতে বোধহয় চা শ্রমিকের অসুবিধা হচ্ছে না।
