ভুয়ো ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ এবং এক জালিয়াতের কাহিনী

ভুয়ো ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ এবং এক জালিয়াতের কাহিনী

ভিডিও/VIDEO
Spread the love


আশিস ঘোষ

ধর্মাধর্ম নিয়ে এখনকার চুলোচুলিকে একপাশে সরিয়ে এবার বরং এক হিন্দুরাষ্ট্রের কথা বলি। সেই ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ একেবারেই মনগড়া। এক মহা জালিয়াতের কাণ্ড। তবু সেই রাষ্ট্র একেবারে হইচই বাধিয়ে দিয়েছে দুনিয়াজুড়ে। সেই রাষ্ট্রের নাম ইউনাইটেড স্টেটস অফ কৈলাস। সেই রাষ্ট্রের নিজস্ব পাসপোর্ট আছে। রাষ্ট্রসংঘে তারা প্রতিনিধি পাঠায়। বিশ্বের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয় তাদের। এই দেশ ‘সার্বভৌম।’

এই হিন্দুরাষ্ট্রের মাথার নাম স্বামী নিত্যানন্দ। তার নামডাক ২০১৯ সাল থেকে। আদত নাম অরুণাচলম রাজাশেখরণ। গোড়ায় আশ্রম খুলে বসেছিল বেঙ্গালুরুর কাছে বিদাড়িতে। সেখানে চালাতে শুরু করে ধ্যানপীঠম দাতব্য ট্রাস্ট। তারপর হিন্দু ধর্মের একজন শীর্ষ গুরু হিসেবে তার কারবার ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। নানারকম তাকলাগানো দাবি করত তার ভক্তকুল। নিত্যানন্দ নাকি অন্ধত্ব সারাতে পারে। বিরিঞ্চিবাবার মতো সূর্যের ওঠার সময় বদলে দিতে পারে। আরও কত কী। তারপর বহু বাবার যা হয় তাই হল। শ্লীলতাহানি, ধর্ষণের মতো নানা কিসিমের অভিযোগ মাথায় নিয়ে সোজা দেশত্যাগ। তারপর নিত্যানন্দ কোথায় গেল তার হদিস মিলছিল না। স্থানীয় একটি চ্যানেলে এক তামিল অভিনেত্রীর সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠ অবস্থায় নিত্যানন্দের ছবি দেখানোর পর হুলুস্থুল বেধে যায়। তার এক শিষ্যা তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনে। ছিল অপহরণের অভিযোগও।

বেঙ্গালুরুর পর নিত্যানন্দ জাঁকিয়ে বসেছিল আহমেদাবাদে। গুজরাটের উপর অনেকটা নির্ভর করত ভুয়ো বাবাজি। সেখানে তার যোগাযোগ ছিল ভালো। বলতে গেলে তার আশ্রমে ঘটা নানারকম অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া থেকে তাকে বাঁচিয়েছিল গুজরাট পুলিশই, অভিযোগ এমনটাই। তবে মাঝে একবার ধরা পড়ে তাকে জেলে থাকতে হয়েছিল ৫২ দিন। তারপর জামিন হয় তার। তখন দেশ থেকে পালিয়ে সে গিয়েছে দক্ষিণ আমেরিকায়, জনশ্রুতি তেমনটাই। এই কৈলাসের রাষ্ট্রসংঘের প্রতিনিধি ছিল বিজয়া প্রিয়া। কৈলাসের প্রধানমন্ত্রী ছিল প্রাক্তন চিত্রতারকা রঞ্জিতা। এদেশে আসারাম বাপু, গুরমিত রাম রহিম, রামপালের মতো খ্যাতিমান গুরুদেবদের কোনও অভাব নেই। তবে হিন্দু ধর্ম সম্বল করে জালিয়াতিতে সবাইকে টেক্কা দিয়েছে নিত্যানন্দ। ঘোল খাইয়েছে একাধিক দেশকে।

একেবারে হালে নিত্যানন্দ সাড়া ফেলেছে তার জালিয়াতির নতুন কায়দায়। বলিভিয়ায় গ্রেপ্তার হয়েছে তার জনা চল্লিশ সাঙ্গোপাঙ্গ। এবার অভিযোগ, সেখানকার আদিবাসীদের জমি হাতানো। নিত্যানন্দের ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ থেকে সেই শাগরেদদের ঘাড় ধরে ফেরত পাঠানো হয়েছে যার যার নিজের দেশে। সার্বভৌম রাষ্ট্র বলে পরিচয় দিয়ে হিন্দুরাষ্ট্র কৈলাসের নামে নানা দেশের সঙ্গে চুক্তি সই করত নিত্যানন্দ। ২০২৩ সালে কৈলাসের সঙ্গে চুক্তি করায় পদত্যাগ করতে হয়েছিল প্যারাগুয়ের এক আমলাকেও। নেয়ার্কের সঙ্গে বন্ধুত্বের চুক্তি বাতিল করতে হয়েছে। বলিভিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নিত্যানন্দের ছবি বাগাতে পেরেছিল তার শাগরেদরা।

অতঃপর বাধ্য হয়েই বলিভিয়া সরকারিভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ইউনাইটেড স্টেটস অফ কৈলাসের সঙ্গে তাদের কোনও সংশ্রব নেই। তবে সবথেকে বড় জালিয়াতি ধরা পড়েছে এখন। আমাজনের ধারে আদিবাসীদের হাজার বছরের লিজ চুক্তি দিয়ে জমি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে নিত্যানন্দের চ্যালাচামুণ্ডারা। যে জমি তারা লিজে নিচ্ছিল তা দিল্লির মোট আয়তনের তিনগুণ। সরল আদিবাসীদের ভুলিয়ে মুখে এক বলে চুক্তিতে আরেক রকম লেখা হয়েছিল। তা ধরা পড়ে যায়। তাতে ছিল সেই জমির প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে নেওয়ার শর্তও।

এই প্রতারকরা এদেশে অনায়াসে সাধু সেজে লোকের ভক্তির সুযোগ নিয়ে নিজেদের কারবার অবাধে চালিয়ে যাচ্ছে। আর এখানকার সরকার আর পুলিশের মদতে দেশ থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছেমতো জামিন কিংবা প্যারোলে ভোটের আগে জেল থেকে বেরিয়েও যাচ্ছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *