অরবিন্দ ঘোষ
সভ্যতার আদিম লগ্ন থেকেই জলাশয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি ও সংস্কৃতি। মালদহ জেলার নামের ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ‘মাল’ অর্থাৎ সম্পদ এবং ‘দহ’ অর্থাৎ জলাশয়। এই নদীমাতৃক জনপদে নদী তার গতিপথ পরিবর্তনের ফলে রেখে গিয়েছে অসংখ্য পরিত্যক্ত বাঁক, যা আজ জলাভূমি রূপে বিদ্যমান। ওল্ড মালদা ব্লকের ভাটরা বিলও এর ব্যতিক্রম নয়। আশ্চর্যের বিষয় হল, ১৮৭৫ সালের জেলা মানচিত্রে এই বিলের অস্তিত্ব ‘রসিলাদহ’ নামে ছিল। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের মানচিত্রে এটি ‘জলকারবিথান’ নামে পরিচিতি পায় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাটরা ও যাত্রাডাঙ্গা নাম দুটি যুক্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গের ২৩টি বড় জলাভূমির মধ্যে মালদহ জেলায় যে ৯টি প্রধান জলাভূমি রয়েছে, ভাটরা তার মধ্যে অন্যতম। স্থানীয়দের কাছে এর পরিচিতি ‘মিনি দিঘা’ হিসেবে।
ঋতুভেদে জল ও স্থলের আবর্তন
টাঙন ও বেহুলা নদীর সংযোগের কারণে ভাটরা বিলের চরিত্রে এক অদ্ভুত ঋতুগত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। বর্ষাকালে নদী দুটির জলস্ফীতির ফলে ভাটরা, যাত্রাডাঙ্গা ও জলকারবিথান—এই তিনটি জলাভূমি একত্রিত হয়ে এক সুবিশাল হ্রদের রূপ নেয়। প্লাবিত হয় পার্শ্ববর্তী মাঠ ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট। তখন এখানে রুই, কাতলা, পাবদা, কই ও চিংড়ির মতো মাছের পাশাপাশি শামুক-ঝিনুক সংগ্রহের ধুম পড়ে। আবার শীতের আগমনে জল কমতে শুরু করলে বিলের সেই জলমগ্ন রূপ হারিয়ে গিয়ে জেগে ওঠে উর্বর পলিমাটি। ঋতু পরিবর্তনের এই চক্রাকার আবর্তনে বিলটি কখনও হয়ে ওঠে মৎস্যজীবীর কর্মশালা, আবার কখনও কৃষকের শস্যক্ষেত্র।
কৃষিনির্ভর সমাজ ও ভূমির অধিকার
বিলের জল সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় জমি দখলের এক বিচিত্র লড়াই। এখানে ভূমির মালিকানা স্থায়ী নয়, বরং ঋতুভিত্তিক। স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টনের ক্ষেত্রে এক অলিখিত সামাজিক নিয়ম কাজ করে। গত বছর যে কৃষক যে জমিতে চাষ করেছিলেন, পরের বছর তিনি সেই একই জমি পাবেন তার কোনও নিশ্চয়তা থাকে না। স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয়ে এই বণ্টন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। উন্মুক্ত ও উর্বর পলিমাটিতে তখন বোরো ধান, তরমুজ, সর্ষে ও ভুট্টার নিবিড় চাষ শুরু হয়। কৃষিজমির এই ক্ষণস্থায়ী মালিকানা ও ঋতুভিত্তিক পেশা বদল ভাটরা বিল অঞ্চলের এক বিরল ও বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য।
জীবিকার সংকট ও পরিযায়ী জীবন
জলাভূমির পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের জীবিকাও অনিচ্ছাকৃতভাবে বদলে যায়। বর্ষায় যাঁরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, শুকনো মরশুমে তাঁদের অনেকেই পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। কৃষিকাজের সুযোগ না মিললে অনেক পুরুষ শ্রমিক ভিনরাজ্যে পাড়ি দেন। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ ইটভাটায় কাজ করেন, আবার কেউ টোটোচালক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেন। তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও অনেকে বিকল্প হিসেবে বাণিজ্যিক উপায়ে হাঁস পালন করে স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছেন। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি বাড়ায় স্থানীয়দের সঙ্গে বহিরাগত ভ্রমণপিপাসুদের সামাজিক মিথস্ক্রিয়াও ইদানীং বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবেশগত অবক্ষয় ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
গত দুই দশকে বিলের জলধারণ ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমেছে। দূষণের কবলে পড়ে জল ও মাটির গুণমান নষ্ট হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মৎস্য সম্পদ ও ফসলের ফলনের ওপর। কমেছে মৎস্যজীবীর সংখ্যাও। তবে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হল নগরায়ণের গ্রাস। এই ঐতিহ্যবাহী জলাভূমিটি যদি বিলীন হয়ে যায়, তবে মালদহের পরিবেশ ও সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে।
(লেখক শিক্ষক। মালদার বাসিন্দা।)
