বৃষ্টিসুখে জাগে সৃষ্টির চর

বৃষ্টিসুখে জাগে সৃষ্টির চর

শিক্ষা
Spread the love


আশুতোষ বিশ্বাস

বাংলার বৃষ্টিসুখ এক অনন্ত সৃষ্টি সৌন্দর্য-সুখ। পুলক-লাবণ্য প্রকৃতির রূপদর্শনে সুস্থ মনের অধিকারী মানুষ রোমাঞ্চিত হয়, আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। তখন কথা কিছু কিছু গান হয়ে ঝরে পড়ে। কপোতকপোতী শ্লেষহীন প্রেম কুতূহলে আরও নিবিড় সান্নিধ্যে উষ্ণতা খুঁজে নেয়। আবার বিরহ-তাপিত প্রাণে মিলনের চরম ব্যাকুলতা শুধু ব্যক্ত করতে পারেন তিনি, যিনি কবি-‘রাজ’। পৃথিবীর বেশিরভাগ শ্রেষ্ঠ বিরহ-প্রেমের রচনাগুলিতে ঘনকৃষ্ণ মেঘ-চঞ্চল দুর্বার বর্ষার ছাঁট এসে লেগেছে। মহাকবি কালিদাসের ‘মেঘদূতম’ কাব্যের রচনা শুরু হয়েছিল আষাঢ়ের প্রথম দিনে। আমাদের বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধতম শাখা বৈষ্ণব পদাবলির বৃহৎ অংশজুড়ে রয়েছে বর্ষা ঋতু। কৃষ্ণবিরহে অস্থির রাধার আকুলতাকে বর্ষা ঋতু আরও বেশি খরতর তীব্রতর দহনদীর্ণ করে তুলেছে। বর্ষাপ্রকৃতি যেন অপ্রতিরোধ্য প্রতি-নায়কের ভূমিকায় থেকে মহাজন কবিদের প্রতিভার সমস্তটুকু উজাড় করে নিয়েছে।

মৈথিলি কোকিল বিদ্যাপতির ‘এ সখি হামারি দুখের নাহি ঔর/ এ ভরা বাদর মাহ ভাদর/ শূন্য মন্দির মোর’। অথবা দ্বিজ চণ্ডীদাসের- ‘এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা কেমনে আইল বাটে/আঙ্গিনার মাঝে বঁধুয়া তিতিছে দেখিয়া পরাণ ফাটে’-র মতো প্রায় প্রবাদপ্রতিম চরণগুলি আমাদের ছোটখাটো পাওয়া–না পাওয়ার মধ্যিখানে হাইফেনের মতো ভাসতে থাকে। আকাশে মেঘ ঘনালে আমরা এখনও যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের- ‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে।/ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে’-র আকুল সাবধানবাণী শুনতে পাই। শুনতে পাই- ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে/ জানিনে জানিনে কিছুতে কেন যে মন লাগে না’ হৃদয়ের অন্তঃস্থলে সুতীব্র প্রিয়ম অনুভব মনের আকাশ ভারী করে রাখে।

যাঁরা দক্ষিণবঙ্গের, তারা এই বৃষ্টিসুখের অপেক্ষায় চাতক মন নিয়ে বসে থাকেন। ক্যালেন্ডারের পাতায় আষাঢ় এলেও প্রকৃত বর্ষা আসতে গড়িমসি করে। তা মানুষের গা-সওয়া হয়ে গেছে। আর যখন আসে তখন নগরবাসীর নাভিশ্বাস। শহরের রাস্তায় জলজট, ভাঙা রাস্তা আর যানজটের ভোগান্তি। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো শহর-উপশহরে বর্ষা দুর্ভোগের অন্য নাম। প্রবল বৃষ্টিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ি, হাঁটুজল পেরিয়ে মানুষ পৌঁছায় গন্তব্যে। নিকাশি ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জল-নাকাল। তবু এই বর্ষাতেও আছে এক সুখের রং। কলেজ স্ট্রিটে চায়ের কাপ, বইয়ের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা, কিংবা ভিক্টোরিয়া, ময়দানে কাকভেজা হয়ে হেঁটে যাওয়া- সবই দক্ষিণবঙ্গের নাগরিক জীবনের বৃষ্টিসুখের অঙ্গ। এদিক থেকে বাঁকুড়া-পুরুলিয়া-মেদিনীপুর জেলার বৃষ্টিতে যে সুখ তা কী লেখে অভিধানে! প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে ফুটিফাটা মাঠ, উঁচু-নীচু টিলাময় অসমতল প্রান্তর টানা দু’দিনের নিরবচ্ছিন্ন বর্ষায় রাতারাতি অষ্টাদশী তরুণী যৌবন পেয়ে যায়। বুনো গাছে গাছে ঘাসে ঘাসে স্ফূর্তি, ব্যাঙেদের বিবাহোৎসব। জলভরা মাঠ, এঁদোপুকুরের পাড় উপচে এ বাড়ির বাসন ও বাড়ির দোরে গড়াগড়ি খায়।

আর উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, কালিম্পং কিংবা উত্তর-দক্ষিণ দিনাজপুরজুড়ে সবুজের বিস্ফোরণ, প্রাণের স্নিগ্ধতা। চা বাগানগুলো প্রাণ ফিরে পায়। পাহাড়ে মেঘের খেলা আর টিপটিপ বৃষ্টির শব্দ যেন এক প্রকৃতির আনন্দ সংগীত। বৃষ্টির জল ঝরনাগুলিকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত, তিস্তা, তোর্ষা, জলঢাকা নদীগুলি ফুলেফেঁপে ওঠে। এসময় আকাশে মেঘের আনাগোনা দেখে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে খুব মনে পড়ে- ‘বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস/ মেঘ এখানে গাভির মতো চরে…’ তবে উত্তরের বর্ষাতেও আছে বিষাদ। অতিবৃষ্টিতে ধস নামে পাহাড়ে, নদী আছড়ে পড়ে সমতলে। চাষাবাদে ব্যাঘাত ঘটে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় বহু জায়গায়। ডুয়ার্সের অরণ্য থেকে বন্যপ্রাণীর দল নেমে আসে রেলপথ, জাতীয় সড়ক কিংবা মানুষের বসতির ধারেকাছে। বাংলার মন কেবল বসন্তে নয়, বর্ষাতেও ভেজে- দুই বাংলার বৃষ্টিসুখে সৃষ্টির চর জাগে।

(লেখক শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক, আলিপুরদুয়ারের বাসিন্দা)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *