বৃদ্ধাশ্রমের আয়নায় হারানো স্নেহের বিষম মোড়

বৃদ্ধাশ্রমের আয়নায় হারানো স্নেহের বিষম মোড়

শিক্ষা
Spread the love


সাহানুর হক

সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকে বাবার চোখে যে সাফল্যের স্বপ্ন উঁকি দেয় কিংবা মায়ের প্রার্থনায় যে আগামীর সঞ্চয় দানা বাঁধে, আজকের জনবিস্ফোরণের যুগে তা কি খুব চিরন্তন? যে সন্তানকে ঘিরে এক মায়ের গার্হস্থ্য জীবনের যাবতীয় প্রাপ্তি আবর্তিত হয়, সেই আদরের ধনটিই একদিন কোন মন্ত্রবলে জন্মদাতার কাছে ‘সন্ত্রাস’ হয়ে ওঠে, তা ভাবলে বিস্ময় জাগে। আধুনিকতার মোড়কে আমরা যখন সোশ্যাল মিডিয়া বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে আলোচনায় মত্ত, তখন আমাদের চারপাশের জীর্ণ দেওয়ালগুলোয় কান পাতলে শোনা যায় একাকী বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস। প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতোই এই প্রজন্মের অনেকেই আজ শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের অঙ্গীকার থেকে যোজন দূরে সরে যাচ্ছে।

মিথ্যে ভক্তির আড়ালে আসল কঙ্কাল

প্রতিটি বিশেষ দিবসে যখন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের দেওয়ালে বাবা-মায়ের প্রতি প্রণম্য ভক্তির প্লাবন বয়ে যায়, তখন পর্দার ওপারের বাস্তব চিত্রটি ঠিক উলটো। তথাকথিত এই ‘ডিজিটাল ভক্তি’টুকুই যেন আজকের সন্তানদের কাছ থেকে বাবা-মায়ের পাওয়া শেষ সম্বল। সমাজ ও পরিবারের ভিটেমাটিতে আজ তাঁদের অবস্থান ঠিক কোথায়? পরিসংখ্যান বলছে, দেশজুড়ে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা এক অপ্রতিরোধ্য দুরারোগ্য ব্যাধির মতো বাড়ছে। যেখানে ভারত সরকারের ‘আইপিএসআরসি’-র তালিকায় থাকা ৭০০টি বৃদ্ধাশ্রমে হাজার হাজার প্রবীণ রয়েছেন, সেখানে বেসরকারি সমীক্ষা বলছে আসল সংখ্যাটি ৫ হাজার ৮০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আজ প্রায় ১৫ থেকে ২০ লক্ষ মানুষ বৃদ্ধাশ্রমের চার দেওয়ালে নিজেদের শেষ দিনগুলো কাটান, যা সমাজের মাথা নত করার জন্য যথেষ্ট।

যৌথ পরিবারের ভাঙন ও মনস্তত্ত্ব

কেন এই পরিস্থিতি? কেন সাফল্যের শিখরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে আমরা ভুলে যাই সেই সিঁড়ির ধাপগুলোকে? মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ঝড়ে গ্রাম থেকে শহর- সর্বত্রই যৌথ পরিবারের কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। ফলে বরিষ্ঠরা নিজেদের বাসস্থানেই অধিকার হারিয়ে ফেলছেন। কখনও সন্তানদের দীর্ঘ প্রবাস জীবন আবার কখনও পারিবারিক বন্ধনের মায়া হারিয়ে ফেলাই এই দায়বদ্ধতা থেকে চ্যুত হওয়ার মূল কারণ। মায়ার বাঁধন আলগা হতে হতে এমন এক জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে প্রবীণ গুরুজনদের প্রতি দায়িত্বপালন করাটা অনেকের কাছে স্রেফ বাড়তি বোঝা বলে মনে হয়।

ভাতার অঙ্ক বনাম হৃদয়ের টান

একজন ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ সরকারি ভাতা পান কিংবা প্রাক্তন চাকরিজীবীরা পেনশন পান- কিন্তু এই অর্থ কি একাকিত্বের ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারে? ভারতের বর্তমান চিত্র বলছে, প্রতি বছর প্রায় ২৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমান প্রজন্ম অন্ন-বস্ত্রের খরচ দিতে সক্ষম হলেও পরিচর্যা ও সঙ্গ দেওয়ার মানসিকতা হারিয়ে ফেলছে। আদালতের বিভিন্ন রায়ে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ‘সিনিয়ার সিটিজেনশিপ আইন’-এ পিতা-মাতার ভরণপোষণের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হলেও, ভালোবাসার ঘাটতি আইনের শাসনে মেটানো সম্ভব নয়। শাস্তির ভয়ে দায়িত্ব পালন আর হৃদয়ের তাগিদে কাছে রাখার মধ্যে যে ব্যবধান, সেটাই আজকের মূল সংকট।

ভালোবাসার সপ্তাহে এক অন্য ছবি

ফেব্রুয়ারির এই দ্বিতীয় সপ্তাহে গোটা বিশ্ব যখন ‘ভালোবাসার সপ্তাহ’ পালনে মগ্ন, তখন বৃদ্ধাশ্রমের বদ্ধ ঘরগুলো এক বিষম মোড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যান্ত্রিক হতে হতে আমরা যেন পিতা-মাতার প্রতি ন্যূনতম কৃতজ্ঞতাবোধটুকুও বিসর্জন না দিই।

(লেখক গ্রন্থাগারিক। দিনহাটার বাসিন্দা।)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *