চিরঞ্জীব রায়
মণিপুরের বর্তমান অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির উৎস সন্ধানে আমাদের ফিরে যেতে হবে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। ১৮৯১ সালের ঐতিহাসিক অ্যাংলো-মণিপুর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ শক্তি যখন এই পার্বত্য রাজ্যের নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে, তখন থেকেই শুরু হয় সুদূরপ্রসারী এক বিভেদের রাজনীতি। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা তাদের চিরাচরিত ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা ‘বিভাজন ও শাসন’ নীতি প্রয়োগ করে মেইতেই রাজা শাসিত ইম্ফল উপত্যকা এবং কুকি-নাগা অধ্যুষিত পাহাড়ি অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়। এই কৃত্রিম বিভাজন পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যেকার কয়েক শতাব্দীর সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে যবনিকাপাত ঘটায়।
ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং ব্রিটিশদের উদাসীনতার কারণে আধুনিক সভ্যতার সুযোগসুবিধা পাহাড়ি জনজাতিগুলোর কাছে পৌঁছায়নি, যা তাদের মনে এক গভীর বঞ্চনার বোধ তৈরি করে। ১৯১৭-’১৯ সালের কুকি বিদ্রোহ ছিল সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই প্রথম বড় বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশরা নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক খুঁটি শক্ত করতে কখনও নাগাদের বিরুদ্ধে কুকিদের, আবার কখনও মেইতেইদের বিরুদ্ধে কুকিদের ব্যবহার করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাসেও সচেতনভাবে ফারাক তৈরি করা হয়েছে—মেইতেইরা মূলত সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং পাহাড়ি কুকিরা প্রধানত খ্রিস্টান। শতাব্দীর প্রাচীন সেই অবিশ্বাসের দেওয়াল আজও মণিপুরকে কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে বর্তমান প্রজন্মকে।
দাঙ্গার ভয়াবহতা ও আধুনিক জনজাতি সংঘাত
২০২৩ সালের মে মাসে মণিপুর যে অভূতপূর্ব জাতিদাঙ্গার সাক্ষী হয়েছিল, তার উত্তাপ আজও স্তিমিত হয়নি। তপশিলি উপজাতির মর্যাদা পাওয়া নিয়ে মেইতেইদের দাবি এবং তার বিপরীতে কুকি-জো সম্প্রদায়ের তীব্র বিরোধিতাই ছিল এই সংঘাতের তাৎক্ষণিক কারণ। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে সম্পদের বাঁটোয়ারা, জমির অধিকার এবং মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে লাগাতার অনুপ্রবেশের মতো জটিল সব বিষয়। গত দুই বছরে এই সংঘর্ষে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন অগণিত। গ্রামের পর গ্রাম ভস্মীভূত হয়েছে, প্রায় ৬০ হাজার মানুষ আজও নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে শরণার্থী শিবিরের মানবেতর জীবনে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি ও প্রশাসনিক স্থবিরতার দায়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী নংথম্বা বীরেন সিং ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারিতে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। দীর্ঘ এক বছর রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি থাকার পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি ইয়ুমনাম খেমচাঁদ সিংয়ের নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নিয়েছে। রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টায় কুকি-জো ও নাগা গোষ্ঠী থেকে যথাক্রমে নেমচা কিপগেন ও লোসি দিখো-কে উপমুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনিক এই পদাধিকার দিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ মেটানো যায়নি। চূড়াচাঁদপুরের মতো কুকি-প্রধান এলাকায় বঞ্চনার অভিযোগ তুলে আজও অবরোধ ও নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে। নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে উখরুলের মতো জেলাগুলো, যেখানে এখন কুকি ও নাগাদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী লড়াই শুরু হয়েছে।
সশস্ত্র গোষ্ঠী ও সীমান্ত নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
মণিপুরের এই অস্থিরতা কেবল একটি অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। মায়ানমার সীমান্ত দিয়ে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয়তা পরিস্থিতিকে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলছে। সীমান্ত পেরিয়ে আসা এই গোষ্ঠীগুলো কেবল অস্ত্র হাতে লড়াই করছে না, বরং মাদক ব্যবসা ও পপি চাষের মতো অবৈধ কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও পাহাড়ে খবরদারি চালাচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি জাতীয় নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে।
গত ১২ বছরের কেন্দ্রীয় শাসনের ইতিহাসে মণিপুর সংকটকে মোদি সরকারের অন্যতম বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মায়ানমার-ফেরত জঙ্গিদের দৌরাত্ম্য এবং অত্যাধুনিক ড্রোন বা গ্রেনেড ব্যবহারের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সীমান্ত সুরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা নজরদারিতে বড় ধরনের ছিদ্র রয়ে গেছে। বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই জনপদে সামান্য গুজব বা উসকানিতেই ফের জ্বলে উঠছে ঘরবাড়ি। এই অবিশ্বাস এবং নিরাপত্তার অভাব এতটাই প্রকট যে, ২০২৭-এর নির্বাচনের আগে কুকি-জো সম্প্রদায় এখন আর রাজ্যে থাকার চেয়ে পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা বিশেষ রাজনৈতিক মর্যাদার দাবি তুলতে শুরু করেছে। এটি ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত।
সামাজিক অস্থিরতা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতি
একটি অশান্ত সীমান্ত রাজ্য কখনোই উন্নয়নের অংশীদার হতে পারে না। মণিপুরের এই জাতিদাঙ্গা পরোক্ষভাবে সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘অষ্টলক্ষ্মী’ বা উত্তর-পূর্বের আটটি রাজ্যের সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন এখন অনিশ্চিত। রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা বারংবার ব্যাহত হওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ খেটেখাওয়া মানুষের ওপর। পর্যটনশিল্প, যা এই অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হতে পারত, তা এখন কার্যত ধ্বংসের মুখে।
দীর্ঘকাল ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ও আশঙ্কায় দিন কাটানো মানুষের মধ্যে রাজ্য ও কেন্দ্র—উভয় সরকারের প্রতিই এক গভীর অনাস্থা জন্মেছে। এটি কেবল মণিপুরের সমস্যা নয়, বরং সংখ্যাগুরু বনাম সংখ্যালঘু সংঘাতের এই বিষাক্ত মানসিকতা পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জনজাতির সামাজিক-সাংস্কৃতিক আদানপ্রদান কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়, তাই মণিপুরের আগুন নেভাতে দেরি হলে তার আঁচ পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে গ্রাস করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যেভাবে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট থাকেন, মণিপুরের মতো অভ্যন্তরীণ ক্ষত নিরাময়েও সেই একই পর্যায়ের আন্তরিকতা ও বিচক্ষণতা আজ সময়ের দাবি।
শান্তি আলোচনা ও উত্তরণের পথ
মণিপুরের এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সেনা মোতায়েনই যথেষ্ট নয়। সেনা সদস্যরা বড়জোর দাঙ্গা দমন করতে পারেন বা অস্থায়ী শান্তি বজায় রাখতে পারেন, কিন্তু মানুষের মনের গভীরে প্রোথিত ঘৃণা ও অবিশ্বাসের বিষ নামাতে পারেন না। সমস্যার সমাধান হতে হবে মানবিক, সংবেদনশীল এবং সর্বজনগ্রাহ্য। ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেই মণিপুরে এমন একটি সুস্থির পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি, যেখানে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর আধিপত্য নয় বরং সকলের সহাবস্থান নিশ্চিত হয়।
নতুন সরকারকে কেবল মৌখিক আশ্বাস বা পদ বণ্টনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, সব জনজাতির ছাত্র সংগঠন, মহিলা গোষ্ঠী এবং স্থানীয় সামাজিক নেতাদের নিয়ে একটি নিরন্তর ও নিবিড় আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। সংলাপের টেবিলে বসেই একে অপরের প্রতি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অভিযোগগুলো শুনে তার প্রতিকার খুঁজতে হবে। কেন্দ্রকে এক্ষেত্রে বড় দাদার মতো অভিভাবকের ভূমিকা নিতে হবে। মণিপুর যাতে ‘বঞ্চিত ও অবহেলিত’ হওয়ার তকমা মুছে ফেলে মূলধারার উন্নয়নে ফিরতে পারে, তার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। ব্রিটিশদের রোপণ করা সেই বিভাজনের বিষবৃক্ষকে সমূলে উপড়ে ফেলে এক নতুন সম্প্রীতির মণিপুর গড়াই হোক বর্তমান সময়ের প্রধান লক্ষ্য।
(লেখক প্রাবন্ধিক)
