সুমন ভট্টাচার্য
আমার প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বন্ধু, উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা আইএএস অফিসারের ছেলে যখন আজ থেকে দুই দশক আগে আচমকাই এক রুশ তরুণীকে বিয়ে করেছিল, তখন আমি ভেবেছিলাম এটা বোধহয় শুধুই ভারত-রুশ মৈত্রীর একটা উদাহরণ। কিন্তু পরে যখন আমার বন্ধু সগর্বে জানাল তাদের সন্তান হওয়ার জন্য পুতিন সরকার ১০ লক্ষ ভারতীয় মুদ্রা, অর্থাৎ, প্রায় ৯ হাজার ডলারের বেশি ‘ইনসেন্টিভ’ দিচ্ছে, তখন আমি বুঝলাম বিষয়টার মধ্যে অনেক গভীরতা আছে। অর্থাৎ, রাশিয়া, ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া, যারা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য অন্য দেশ থেকে, এমনকি প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকেও মানুষ ভাড়া করে নিয়ে যায়, তাদের নিজেদের দেশের জনহার বাড়ানোটা খুব জরুরি। সেইজন্য যদি কোনও রুশ তরুণী অন্য কোনও দেশের পুরুষকে বিয়ে করে সন্তান জন্ম দেয়, তাহলে পুতিনের প্রশাসন তাদের প্রায় ১০ লক্ষ মুদ্রা দেয়।
ইউরোপের যে কোনও প্রধান সংবাদপত্র কিংবা ডয়েচেভেল দেখলেও দেখা যাবে গত কয়েক মাস ধরে জার্মানি আলোড়িত তার কর্মীসংকট নিয়ে। একদিকে সেদেশে অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে, অন্যদিকে অভিবাসীরা না এলে তাদের নার্স, স্কুলের শিক্ষক কিংবা কারখানার শ্রমিক জোটানো মুশকিল। জার্মান সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ অনুযায়ী জার্মানিতে যাঁরা এখন থাকেন, তাঁরা যে ধরনের ‘হাই স্কিলড’ কাজের জন্য উপযুক্ত, তাঁরা এই ধরনের ছোট কাজ করবেন না। তাহলে জার্মান সভ্যতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবার মাথা তুলে দাঁড়ানো যে অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় এবং ইউরোপের সবচেয়ে বড় শক্তি, সেই জার্মানির অর্থনীতি চলবে কী করে? কারণ, জার্মানিতে যদি মধ্যমেধার বা নিম্নবৃত্তের কাজ করার মানুষ না থাকে, তাহলে কী হবে? জেনে রাখা ভালো, দক্ষিণ ভারত থেকে দলে দলে নার্সদের জার্মান ভাষা শিখিয়ে জার্মানি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একদিকে যখন জার্মানিতে আবার নাৎসিদের পুরোনো খোলস ভেঙে যাচ্ছে এবং স্বাজাত্যবোধ বা ‘নীল রক্ত’-র কথা নতুন করে বলছে, তখনই অভিবাসন নীতিতে বদল আনতে হচ্ছে শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতির এবং তথাকথিত সিস্টেমকে চালু রাখার জন্য।
ইচ্ছে করেই জার্মানি এবং রাশিয়ার উদাহরণ দিয়ে এই লেখাটি শুরু করলাম, জনসংখ্যা কমে যাওয়ার বা ‘লো ফার্টিলিটি রেট’-এর বিপদটাকে বোঝানোর জন্য। রাশিয়া, যেটি একটি ‘কন্ট্রোলড’ বা ‘কমান্ড ইকনমি’, অর্থাৎ, ‘নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি’-তে চলে, আর অন্যদিকে জার্মানি যেটা ইউরোপের মুক্ত অর্থনীতির ‘চ্যাম্পিয়ন’ বলে পরিচিত, তারা দুজনেই একই সমস্যায় ভুগছে বা বলা ভালো তারা সমাধানের জন্য মরিয়া হয়ে পথ খুঁজছে। দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের উদাহরণে না যাওয়াটাই ভালো। সেখানে সমস্যাটা আরও তীব্রতর। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ফার্টিলিটি রেট’, অর্থাৎ, জন্ম হার ১-এর কম, জাপানের ১.২। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই জন্ম হার বা ‘ফার্টিলিটি রেট’ অন্তত ২.১ হওয়ার দরকার, তা না হলে একটি জাতি বা রাষ্ট্র ক্রমশ গুঁড়িয়ে যায় এবং তার কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে।
গুঁড়িয়ে যাওয়া জাতি বা কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকলে দেশে কী সমস্যা হতে পারে? এই প্রশ্নটির উত্তর জানার জন্য ফ্রান্সের মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সাক্ষাৎকার নেওয়া উচিত। ম্যাক্রোঁ যতটা না চিন্তিত ইরান যুদ্ধে তাঁর দেশ জড়িয়ে পড়বে কি না, তার চাইতে অনেক বেশি চিন্তিত তাঁর দেশের অর্থনীতি নিয়ে। একদিকে তাঁর দেশে অতি দক্ষিণপন্থী রাজনীতি বাড়ছে, অন্যদিকে গত কয়েক বছরে মধ্যবর্তী প্রেসিডেন্টকে নিজের ২৬ বছরের সিনিয়ার বৌকে সামলানোর চাইতে প্রধানমন্ত্রী খোঁজাটা কঠিন কাজ হয়ে পড়েছে। ম্যাক্রোঁকে গত কয়েক বছরে যতবার প্রধানমন্ত্রী বদলাতে হয়েছে, ইউরোপের প্রায় কোনও দেশেই হয়তো ততটা হয়নি। কিন্তু ম্যাক্রোঁর সংকট কী কারণে? সোজা কথায় বললে ফরাসি অর্থনীতি ধুঁকছে পেনশন ও অবসরের পর সুযোগসুবিধা দেওয়ার চাপে। ফ্রান্সে যত পেনশনভোগী বাড়ছে, ততই ফ্রান্সের অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। ম্যাক্রোঁ চেয়েছিলেন অবসরের বয়স বাড়িয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে, কিন্তু প্রবল বিক্ষোভ, রাজনৈতিক অশান্তি, একদিকে অতি দক্ষিণপন্থী, অন্যদিকে অতি বামপন্থীদের টানাপোড়েনের মধ্যে সরকার এবং অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে তাঁর রীতিমতো কালঘাম ছুটে যাচ্ছে।
আসলে সংকটটা কী? সংকটটা কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট দেশের নয়। এটা আসলে একটা গোটা পৃথিবীর সংকট। ১৯৬৩ সালে যেখানে ‘ফার্টিলিটি রেট’ ছিল ৫.৩, সেখানে ২০২৩ সালে এই ‘ফার্টিলিটি রেট’টি গোটা পৃথিবীতে কমে দাঁড়িয়েছে ২.২-তে। আমাদের মনে রাখতে হবে, কর্মক্ষম, অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্ম যেন সবসময় অর্থনীতির হাল ধরে রাখে, এরকম করতে গেলে অন্তত পক্ষে সবসময় ‘ফার্টিলিটি রেট’-কে ২.১ রাখতে হবে। তা না হলেই ফ্রান্সের মতো সমস্যা হবে। অথবা রাশিয়ার মতো বাংলাদেশ থেকে, উত্তর কোরিয়া থেকে মানুষ ভাড়া করে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে। এই যে মানুষ ভাড়া করতে হচ্ছে, তার কারণ কী? কারণ, রাশিয়া বা জার্মানির মতো দেশে যে কাজগুলি সমাজ বা রাষ্ট্রকে চালানোর জন্য সবচেয়ে জরুরি, সেই কাজগুলো করার জন্য ‘ইয়াং ওয়ার্ক ফোর্স’ বা তরুণ প্রজন্মের কর্মীদের অভাব। রাশিয়ায় কতটা অভাব, সেটা আমরা ইউক্রেন যুদ্ধের সময় টের পেয়েছি। আর জার্মানিতে টের পাচ্ছি প্রতিদিনের জার্মান সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন, সেদেশে শিল্পকর্তাদের উদ্বেগ— এই সবকিছুর মধ্যে দিয়ে। এতে জার্মানির সংকট যতটা, ততটাই সংকট শিল্পের দিক থেকে অন্য দেশগুলির চাইতে অনেক এগিয়ে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার জন্যও।
ফ্রান্সের মতোই গত কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক টানাপোড়েনে থাকা, বারবার বিক্ষোভের কারণে সরকারের বদলে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া দক্ষিণ কোরিয়ায় নাকি মানুষের প্রধানতম চিন্তা অর্থনীতি নিয়ে। কেন অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা? কারণ, কর্মক্ষম মানুষের অভাব। দক্ষিণ কোরিয়া যে তার নিকটতম প্রতিবেশী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী, বা বলা চলে সহোদর ভাই, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রর হুমকির চাইতে অর্থনীতিতে অনেক এগিয়ে গিয়েছিল এবং দুনিয়াজোড়া সব ‘টেক কোম্পানি’, স্যামসাং থেকে শুরু করে আরও সব কোম্পানি তৈরি হয়েছিল, সেই সবকিছুই আজ প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখে। কারণ, সেদেশে বৃদ্ধের সংখ্যা বাড়ছে আর তরুণদের সংখ্যা কমছে। এই পরিস্থিতিতে জার্মানির মতোই দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিতে যিনিই কুর্সিতে বসুন, তাঁকে সবসময় মাথায় রাখতে হচ্ছে এই ‘ফার্টিলিটি রেট’-এর কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটিতে জন্মহারের বৃদ্ধি লাফিয়ে লাফিয়ে কমেছে। এখন এতটাই কম যে, দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন কারখানায়, যে সমস্ত কারখানার বিভিন্ন মোবাইল বা ইলেক্ট্রনিক পণ্য গোটা বিশ্বকে মাত করে দিয়েছে, তাদের কারখানায় যোগ্য কর্মীর অভাব!
ফলে কি পুতিনের দেখানো পথই ইউরোপকে অনুসরণ করতে হবে? সন্তান উৎপাদনের জন্য ‘ক্যাশ ইনসেন্টিভ’ দিতে হবে? আমাদের দেশে যেমন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ থেকে ‘লাডলি বহনা’ রাজনীতি এবং সমাজে আমূল পরিবর্তন এনে দিয়েছে, তেমনই কি ইউরোপের সব দেশে এখন থেকে সন্তান উৎপাদনের জন্য ‘হাতে গরম ডলার’ ধরিয়ে দেওয়া হবে? আমরা নিশ্চিত নই। কিন্তু একটা কথা বলা যায়, পৃথিবী ক্রমশ সেইদিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, পৃথিবী যদি ক্রমশ বুড়িয়ে যায়, তাহলে সেই বুড়িয়ে যাওয়া রাষ্ট্র বা বুড়িয়ে যাওয়া সমাজ কোনও নতুনতর অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাকে অর্জন করতে পারে না। ঠিক যেমন পারে না নতুন কোনও স্বপ্ন দেখতে। আমাদের একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে, গ্রেগ চ্যাপেল যে কথাটা বলে ভারতীয়দের, বিশেষত বাঙালিদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন, আজ কিন্তু সেটাই সত্যি। অর্থাৎ, ক্রিকেটের ক্ষেত্রে যেমন অনূর্ধ্ব ৩০ ক্রিকেটারদের ক্রমাগত তুলে দেওয়াটাই একটা দলের সাফল্য হতে পারে, ঠিক তেমনই সমাজ বা রাষ্ট্র চালানোর ক্ষেত্রে বা আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, শিল্পে উন্নয়ন আনতে গেলে তরুণতম প্রজন্মকে দরকার। তার একটা অন্য সমাজতাত্ত্বিক কারণও সবাই বলেছে। যাঁরা বৃদ্ধ হয়ে যাবেন, যাঁরা পেনশন বা অবসরকালীন সুযোগসুবিধায় বাঁচবেন, তাঁরা আর কতটা ঝুঁকি নেবেন? তাঁরা আর কতটা কেনাকাটার ক্ষেত্রে উদার হবেন? যারা তরুণ প্রজন্ম, তারাই তো কেনাকাটা, শপিং ইত্যাদি করে অর্থনীতিকে সচল রাখবে। তাই জন্মহার কমে যাওয়াটা আধুনিক বিশ্বে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
(লেখক সাংবাদিক)
