বিশ্বে বদল, ভারতে মসনদ : গণতন্ত্রের উলটোপথ

বিশ্বে বদল, ভারতে মসনদ : গণতন্ত্রের উলটোপথ

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


(বিশ্বজুড়ে শাসকের বিরুদ্ধে যখন ব্যালট বিপ্লবের ঝড়, তখন ভারতীয় রাজনীতি হাঁটছে এক অদ্ভুত উলটোপথে ‘পরিবর্তন’-এর বদলে ‘প্রত্যাবর্তন’-ই যেখানে মুখ্য।)

সায়ন্তন চট্টোপাধ্যায়

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে চোখ রাখলে এই মুহূর্তে যে ছবিটা ভেসে ওঠে, তা এককথায় ‘অস্থিরতা’। ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন, টোকিও থেকে প্রিটোরিয়া- সর্বত্রই শাসকের গদি টলমল। মানুষ রাস্তায় নামছে না, কিন্তু ব্যালট বক্সে নিঃশব্দে ঘটিয়ে চলেছে বিপ্লব। গণতন্ত্রের পীঠস্থানগুলোতে মানুষ ‘পরিবর্তন’ চাইছেন। কিন্তু ভারত? ভারত যেন এই বিশ্বজোড়া স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক আশ্চর্য ব্যতিক্রমী দ্বীপ। এখানে ভোটাররা ‘পরিবর্তন’-এর ঝুঁকির চেয়ে ‘স্থিতাবস্থা’-র নিরাপত্তাকেই বেছে নিচ্ছেন। বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এই ভারতীয় ব্যতিক্রমীবাদের সর্বশেষ এবং উজ্জ্বলতম উদাহরণ। নীতীশ কুমার দশমবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। প্রায় দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা একজন নেতার এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে যে, ভারতের রাজ্য রাজনীতিতে ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বা সরকার বিরোধিতার সেই চেনা অঙ্কটি আর আগের মতো কাজ করছে না।

বিশ্বজুড়ে শাসকের শিরে সংক্রান্তি

বিশ্বের দিকে তাকানো যাক। আমেরিকায় ডেমোক্র্যাটদের পরাজয় এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির উত্থান, ব্রিটেনে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে লেবার পার্টির ক্ষমতা দখল, জাপানের লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ঐতিহাসিক জনসমর্থন হারানো- এসবই এক সুতোয় গাঁথা। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকাতেও নেলসন ম্যান্ডেলার দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস তার একচ্ছত্র আধিপত্য হারিয়েছে।

এই সবক’টি দেশের নির্বাচনেই একটি সাধারণ সুর ছিল- শাসকের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং ‘এলিট’ বা অভিজাততন্ত্রের প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা ব্যালটে প্রতিফলিত হয়েছে। সেনেগালের মতো আফ্রিকান দেশেও আমরা তরুণ প্রজন্মের সেই একই ধিকিধিকি আগুন দেখেছি, যা প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে সরিয়ে নতুনের আবাহন করেছে। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে ভোটাররা শাসককে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছেন।

ভারতের ‘উলটোপথ’ এবং ‘প্রো-ইনকাম্বেন্সি’র ঢেউ

কিন্তু ভারতে চিত্রটা সম্পূর্ণ বিপরীত। গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এখানে হাওয়া বইছে ‘প্রো-ইনকাম্বেন্সি’ বা সরকার স্বপক্ষতার দিকে। হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং অতি সম্প্রতি বিহারে বিজেপি বা এনডিএ জোটের ক্ষমতায় ফেরা সেই ইঙ্গিতই দেয়। প্রবল সরকার বিরোধী হাওয়া বা বিরোধী পক্ষের শক্তিশালী প্রচার- কোনওটিই শেষপর্যন্ত ধোপে টিকছে না।

গুজরাটের কথাই ধরুন, সেখানে বিজেপি টানা সপ্তমবারের জন্য ক্ষমতায় এসেছে। আবার ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের বিপুল জয় প্রমাণ করে, মেরুকরণের রাজনীতিতেও মানুষ পরিচিত মুখ এবং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে’র মতো প্রকল্পের ওপরেই ভরসা রেখেছেন।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন সমীকরণ?

এই প্রবণতাকে কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ১৯৫২ সাল থেকে ভারতীয় নির্বাচনের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখব, এটি আসলে ইতিহাসের এক চমকপ্রদ পুনরাবৃত্তি। স্বাধীনতার পর ১৯৫২ থেকে ১৯৬৬- এই সময়কাল ছিল সরকার স্বপক্ষতার স্বর্ণযুগ। তখন ৩৯টি বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন সরকার পুনর্নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু এর পরেই ছবিটা বদলাতে শুরু করে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত সময়কালে ভারতীয় রাজনীতি দোলাচলে ছিল। কখনও সরকার টিকেছে, কখনও বা পড়ে গিয়েছে। কিন্তু ১৯৮৯ থেকে ২০০৩- এই সময়কাল ছিল ভারতীয় রাজনীতির জন্য ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’র যুগ। তখন ৬৩টি বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন সরকারকে বিদায় নিতে হয়েছিল। মানুষ তখন পরীক্ষায় বিশ্বাসী ছিলেন, পারফর্ম না করলেই সরকার বদল। কিন্তু ২০১৪ পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ২০১৬-১৮ সালের সাময়িক সরকার বিরোধী ঢেউয়ের পর, ভারত আবার ফিরে এসেছে সরকার স্বপক্ষতার যুগে। বর্তমান ভোটাররা অনেক বেশি হিসেবি। তাঁরা আবেগের চেয়ে ‘ডেলিভারি’ বা পরিষেবাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

কেন এই ব্যতিক্রম? তিনটি প্রধান স্তম্ভ

বিশ্বজুড়ে যখন অর্থনৈতিক চাপ এবং কাঠামোগত সংকটে মানুষ দিশেহারা হয়ে সরকার বদলাচ্ছে, ভারতীয় ভোটাররা তখন দেখছেন তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঢোকা সরাসরি অনুদান, মাথার ওপর ছাদ এবং উন্নত রাস্তাঘাট। ভারতের এই উলটোপথে হাঁটার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করছে :

১. জনকল্যাণমুখী প্রকল্প ও লভ্যার্থী রাজনীতি : কোভিড-১৯ পরবর্তী ভারতে এই রাজনীতি এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিনামূল্যে র‌্যাশন, আবাস যোজনা, কিষান সম্মাননিধি বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো সরাসরি নগদ হস্তান্তরের প্রকল্পগুলো ভারতের বিশাল নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ভোটব্যাংককে শাসকের পক্ষে এককাট্টা করেছে। বিরোধীরা যেখানে দুর্নীতির অভিযোগ বা গণতান্ত্রিক অধিকারের মতো বিমূর্ত বিষয় নিয়ে সরব, শাসক পক্ষ সেখানে চাল, ডাল, টাকা আর রাস্তার মতো মূর্ত উন্নয়নের ফিরিস্তি তুলে ধরছে। সাধারণ মানুষ দেখছেন, সরকার তাঁদের জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করছে।

২. পরিকাঠামো উন্নয়ন ও মধ্যবিত্তের আস্থা : শুধু গরিব মানুষ নয়, মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেও সরকার নিজের পক্ষে রাখছে হাইওয়ে, মেট্রো, বন্দে ভারত ট্রেন এবং আধুনিক পরিকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া বা স্মার্ট সিটির মতো প্রকল্পগুলো এই শ্রেণিকে আশ্বস্ত করেছে যে, দেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে। ফলে সমাজের দুই প্রান্ত থেকেই শাসকদল সমর্থন আদায় করে নিচ্ছে।

৩. স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি ও শক্তিশালী নেতৃত্ব : বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ‘স্ট্রাকচারাল প্রেশার’ বা কাঠামোগত চাপে যখন সরকার উলটে যাচ্ছে, ভারতের রাজ্যগুলোতে তখন শক্তিশালী আঞ্চলিক বা জাতীয় নেতৃত্ব সেই চাপ শুষে নিচ্ছেন। মোদি-নীতীশ বা অন্য আঞ্চলিক সুপ্রিমোরা নিজেদের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং ‘ডাবল ইঞ্জিন’ তত্ত্বে ভর করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের শাসন থাকলে উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত হয়। এই ‘স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি’ ভারতের ভোটারদের কাছে অনিশ্চিত পরিবর্তনের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়।

গণতন্ত্রের নতুন বিবর্তন

সুতরাং, নীতীশ কুমারের দশম শপথ বা বিভিন্ন রাজ্যে বিজেপি ও অবিজেপি শাসকদের প্রত্যাবর্তন কোনও কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের এক নতুন বিবর্তন- যেখানে ভোটাররা আর কেবল প্রতিশ্রুতিতে ভুলছেন না, তাঁরা হাতে-গরম ফল চাইছেন। আর যাঁরা সেই ফল বা ‘সুফল’ পৌঁছে দিতে পারছেন, ব্যালট বক্সে তাঁদেরই জয়জয়কার। বিশ্বজুড়ে যখন ‘অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট’ সেন্টিমেন্ট বা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া প্রবল, ভারত তখন হাঁটছে ‘প্রো-এস্টাবলিশমেন্ট’ বা প্রতিষ্ঠান স্বপক্ষতার পথে। ভারতীয় ভোটাররা হয়তো মনে করছেন, চেনা শাসকের দোষ-ত্রুটি জানা, কিন্তু অচেনা পরিবর্তন আরও বড় ঝুঁকি নিয়ে আসতে পারে। তাই তাঁরা বেছে নিচ্ছেন স্থিতাবস্থাকে। বিশ্ব যা ভাবছে, ভারত তার উলটোটা ভাবছে- আর এখানেই ভারতীয় গণতন্ত্রের অনন্যতা। এই উলটোপথ কতদিন স্থায়ী হবে, তা সময়ই বলবে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতীয় রাজনীতির মসনদ যে ‘প্রত্যাবর্তন’-এর শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

(লেখক সাংবাদিক)



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *