বিবর্ণ ক্যানভাস ও নীল প্রজাপতি – Uttarbanga Sambad

বিবর্ণ ক্যানভাস ও নীল প্রজাপতি – Uttarbanga Sambad

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


  • শাশ্বত বোস

প্রকাণ্ড একটা সাদা ক্যানভাসের গায়ে ফ্ল্যাট ব্রাশটা দিয়ে আঁকিবুঁকি, অবাধ্য আঁচড় কাটছে অনিমেষ। আজ অনেকদিন পর সে ছবি আঁকবে। হাফ হাতা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্টে লিখে ফেলবে স্ব-যাপনে আত্মমগ্ন একটা শরীর। শরীরের ভিতর ভাঁজ হয়ে থাকা আরেকটা শরীর; বহুদিনের পুরোনো একটা শরীর! সম্ভবত কয়েক শতাব্দী পুরোনো। সে শরীরে কোনও জানলা নেই। হয়তো শরীরটার মুখে-চোখে খানিকটা ভয় লেগে থাকে। হয়তো লেগে থাকে অনেকটা বিস্ময়। সর্বদর্শী শরীরটা হয়তো আচমকা দেখায়, ক্লান্ত পতঙ্গের মতো ঘুমে ঢলে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে, কারও ওপর জাদুপ্রভাব বিস্তার করতে পারে। সেই শরীরটার চামড়া ফেটে বেরিয়ে এসে বেশ খানিকটা মায়াবী আলো অনিমেষের মন মাথায় ধীর গতিতে মাকড়সার জাল বোনে। জীবনের যা কিছু নিয়মিত তার কিছুটা স্রোতের অভিমুখে, কিছুটা চুনাপাথরে জমে থাকা ফসিলের মতন। নিয়মের অছিলায় সেখানে একরাশ বিবশতা শুধু মৃত্যুর মুখবন্ধ হয়ে ঝুলে থাকে অ্যাকিউট পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি থেকে অবটিউজ পঁয়ত্রিশ ডিগ্রির মাঝের কোণ ধরে। অঝোরে বৃষ্টির পর গজিয়ে ওঠা আঠালো জীবনটায় নিষ্প্রাণ গাঢ় শ্যাওলা রং লাগে। আগামী কুয়াশার গন্ধ মেখে মানুষের মনের মধ্যে কি আর মানুষ তখন তলিয়ে দেখে? জানতে চায় নতুন করে তার নিজের ভেতরের মানুষটাকে? এরপর হয়তো সেই ধূসর শরীরটা ছায়া-ছায়া আচ্ছন্নতায় ধীরে, অতি ধীরে নেমে যাবে কোনও অন্ধকার কুয়োয়, পড়ার টেবিলে ছড়ানো-ছেটানো একরাশ বইয়ের মতো অনিয়মের অস্থির আকুলতা নিয়ে। জলপাই রঙের মৃত্যুর আধিপত্য আর তার অলৌকিক ও জটিল বর্গক্ষেত্রে, একটা কৌণিক বিন্দুতে এসে দাঁড়ায় অনিমেষ, সামান্য ঠান্ডা বাতাসটুকুর হাত ধরে আসা, ফোঁটা ফোঁটা হেমন্তের ভাবনাটুকু বুকে করে নিয়ে। তার দু’চোখে গলগলিয়ে সন্ধে নামে, মাথা ভার হয়ে আসে, শরীর এলিয়ে দেয়– তবু অনিমেষ আজ ছবি আঁকবেই!

অনিমেষ দিব্যি টের পায় বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের নখটা বড় হয়েছে বেশ। গোড়ার দিকে মোটা কিন্তু আগার দিকটা সরু হয়ে ছুঁচোলো হয়েছে, ঠিক মুখভোঁতা ছুরির মতো। প্যালেট থেকে ওই নখে করেই বেশ কিছুটা ক্যাডমিয়াম রেড, ইয়েলো অকর, আল্ট্রামেরিন ব্লু আর টাইটেনিয়াম হোয়াইট খামচে তুলে এনে, রতিস্নাত জ্যোৎস্নার মতো ক্যানভাসের সারা শরীরে হরবোলা পাখির সুর এঁকে দিতে ইচ্ছা করে। বহু যুগের ওপার থেকে ভেসে আসে পাখিটার শিস। আধপোড়া ইটের ভাঁজে ভাঁজে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিকে খুঁচিয়ে তুলতে ওই শিসের জুড়ি মেলা ভার! এটাই হয়তো পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া প্রথম গান। এর আগেও কেউ কোনও দিন গান গায়নি, পরেও না। প্যালেট নাইফটার কাজ কেড়ে নিল শুধু অনিমেষের বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলে গজিয়ে ওঠা এই নখটাই! বিষয়টা ভিতরে-ভিতরে ভীষণ তাতিয়ে দেয়। ক্যানভাসজুড়ে তখন বিস্তৃত একটা নিবিষ্ট সমকোণী সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ। কোনও অজানা মানবীর মুখের বেস লাইনস– পোর্ট্রেট পেন্টিংয়ের একদম প্রাথমিক ধাপ। অনিমেষের জীবনটা যেন তার ঠিক দুটো বাহুতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেন গন্তব্যের দু’দিক। আজকাল সে যেন দুটো সম্পূর্ণ পৃথক মানুষ, দুটো আলাদা আলাদা রঙের মনওয়ালা দুটো পৃথক জীবন যেন সর্বক্ষণ ভর করে থাকে তার ওপর; কোরা কাপড়ে বেশ খানিকটা সাদা আর অল্প কালো মিশে গিয়ে তৈরি হওয়া ছাই রঙের একটা জীবন। তোলপাড় ধুলোঝড়ের মতো আস্তে আস্তে সে জীবন কালো হয়ে আসে, মিহি সুতোপাড়ে জমা হয়ে আসা থকথকে আলকাতরার মতো– নির্জন, নির্বাক, নগ্ন! আবার ঠিক তার উলটোপিঠে হলুদ, কালো আর লাল মিশে সংগম লবণের ভারে মেহগনি রঙের ঘনঘোর, অশিষ্ট একটা মন। ভিজে নিঃশেষ হয়ে যাবার মত্ত একটা জেদে যার অসুখের পরোয়া নেই। যেন রুক্ষ্ম মরুভূমির মতন। এই প্রবল জলকষ্ট আবার এক ঢোঁকেই ভেতরে জল থইথই! ভ্রম আর ভ্রমর সেখানে বাস করে আলোর সমকামী হয়ে। এই প্রখর মে মাসের দুপুর, যে দুপুরে ঠাঠা রোদে তৃষ্ণার্ত কাক একফোঁটা জল না পেয়ে ছটফট করে। বছর বিয়াল্লিশের বিধবাকে একমাত্র ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে পেন-পেন্সিল-চিরুনি ফেরি করতে হয়। গনগনে ইমারতের গা বেয়ে ইটের পাঁজা মাথায় নিয়ে বারোতলার ছাদে উঠতে হয় বছর ছত্রিশের স্বামী পরিত্যক্ত খুশবুকে। একটা নিরেট লালসার প্রতিক্রিয়াহীন অভিব্যক্তি যখন পোড়ায়, ভেপসে যাওয়া ঘামের গন্ধে বিবর্ণ শরীরগুলোকে, তখন সেই অপরিসীম কষ্ট আর লড়াইয়ের সমান্তরাল জগতে বসে কেবল ছবি আঁকে অনিমেষ, মধ্য কলকাতার পুরোনো, জীর্ণ বাড়িটার দোতলার এই বন্ধ ঘরটায় বসে।

ঠিক এখানেই রক্তগোলাপের ছিটে হয়ে ক্যানভাসে প্রবেশ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে বিকশিত হওয়া স্যুররিয়ালিজমের দৃশ্য ও পোশাকের কাল্পনিক বন্ধনে তৈরি ইমেজারি আর ‘কাইফোর্ড স্টিল’-এর হাত ধরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চালু হওয়া ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম’-এর নীলচে মিশেলে মূর্ত, রাতের বাঁকে পথ হারিয়ে ফেলা উতল চন্দ্রভাগা! অনিমেষের শুধু মনে হয়, যেন প্রাগৈতিহাসিক কালের থেকে সে দাঁড়িয়ে আছে ক্যানভাসটার সামনে। ক্যানভাসটা ধূপকাঠির মতো নগ্ন হয়েছে শুধু ব্রাইট ব্রাশ, ওয়াশ ব্রাশ, ফিলবার্ট ব্রাশ আর এগবার্ট ব্রাশের খোঁচায়; ড্রাই ওয়াশিং, স্ক্র্যাম্বলিং, গ্লেজিং, হ্যাচিং ইত্যাদি স্পেসিফিক ব্রাশিংয়ের সোহাগে আদরে! শুধু এই নখ আর রং দিয়েই হয়তো এঁকে ফেলতে পারবে সেই মুখ। সুন্দর আর মাঝামাঝি রকম দেখতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে যে মুখ, গন্ধ ফুরোনো আরব্যরজনীর সময় থেকে স্মৃতির ঘুঙুর পায়ে। ঘন-ঘিঞ্জি-ভয়-হত্যা-আতঙ্কের গলিতে বসে যে মুখটার ধ্যান করেছে অনিমেষ সেই কিশোরবেলা থেকে। আবার সেই মুখটা দেখলেই হয়তো মাঝে মাঝে স্ব-মেহনের ইচ্ছে জেগেছে। কয়েকটা মুখ অনিমেষ অনায়াসে এনে বসাতে পারে এই মুখটির জায়গায়। সাইকেলের চাকার ধুলোকাদা মেখে কয়েকটা মানুষ এভাবেই বেঁচে আছে আজও, অনিবার্য ঘুমঘুম নির্জনতার হাত ধরে। যেমন, খুকিদি।

বৈজয়ন্তীমালার মতো ধীর এক্সপ্রেশন খেলা করে যেত খুকিদির মুখজুড়ে। কোনও এক অনুভূতি প্রখর দুপুরে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা পড়ানোর সময় মুখটা গাঢ় সেপিয়া টোনে হালকা ব্রাউনিশ হাইলাইটিংয়ের মতো করে খুকিদি বলেছিল, ‘তুই বাড়ি যা বাবলু, কাল থেকে আর আসিস না।’ সেই খুকিদির বডিটা যখন শেষবারের মতো পাড়ায় এল, ফর্সা মুখে তখন ছোপ-ছোপ নীল। যেন লাইট বেসের ওপর আর্টিস্ট স্পঞ্জে করে উইনসর ব্লু রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে! হয়তো এরই ভালোর নাম নিঃসঙ্গতা। এই নিঃসঙ্গতার উপর মাদুর পেতে দীর্ঘদিন শুয়ে থেকেছে অনিমেষ খুকিদির ডেডবডির দিকে চেয়ে– একটা ভীষণ টাটকা বডি। আইভরি কালারের একটা ব্যাকলাইট এসে পড়েছে মুখটায়– যেন এক্ষুনি ডাকলেই উঠে বসবে! নিজের মন এবং অঙ্ক কষতে না-পারা জীবনের সবটুকু অভিজ্ঞতা ছেঁচে নিয়ে, সব স্বপ্নকে হিঁচড়ে নামিয়ে এনেছে অনিমেষ সেই অন্ধকার কুয়োটার ধারে, যেখান থেকে কেউ আত্মহননের পথ সহজেই বেছে নিতে পারে। ছোটবেলায় মা অনিমেষকে আঁকা শেখাতেন। মায়ের সেই ঢলঢলে মুখটা যেন খুব বেশি মনে পড়ে ইদানীং। মায়ের দুটো চোখে সে দেখতে পায়, দেখতে পাওয়াকে ছাড়িয়ে অসীমে। ঠিক যেখান দিয়ে চলে গেছে একটা ফাঁকা রাস্তা; যে রাস্তাটা দিয়ে কেউ কখনও হেঁটে আসেনি।

তবু ক্ষণজন্মা শিল্পীর মতো আলুথালু স্বপ্নের স্পাইরাল পথ বেয়ে, একবার ঠিক করে মুখটা এঁকে ফেলতে চায় অনিমেষ। ডার্ক ব্যাকগ্রাউন্ডে ফুটে ওঠা মুখটার নাকের কাছে রিগার ব্রাশটা ঘষে ঘষে নোজ ব্রিজটা সরু করতে থাকে, ওপরের ঠোঁটটাকে আরেকটু মোটা। চোখদুটো আরও সাদা হবে; তিরিশ বছর আগের দিনে ফুলশয্যায় পাতা চাদরের মতো সাদা– বেশ সতর্ক তুলির আঁচড়! আয়নার ওপার থেকে এক্ষুনি হয়তো উঁকি দেবে একগাদা লোক। অনেকটা একরকমের দেখতে! বসিয়ে দেবে গোল টেবিল। বলে উঠবে, ‘তোমার ছবি, তোমার তুলি এক্সপ্রেশনিজমের ধার দিয়েও যায় না। কিচ্ছু হয়নি! আবার নতুন করে শেখো। নন্দলাল, যামিনী রায়, হেমেন মজুমদার, যোগেন চৌধুরী দেখো। হেঁটে যাও নির্জন পথের সেই রাস্তা দিয়ে, যেখানে আশপাশে ছড়িয়ে আছে শুধু কয়েকটা ল্যাম্পপোস্ট আর গাছ। সেদিকে তাকিয়ে আপনমনেই বলে ওঠো তারপর– ফুল ধরেছে!’ ঠিক এরপরেই লোকটার মুখের ভাবভঙ্গি পালটে যাবে। মুখাবয়বে ধীরে ধীরে ফুটে উঠবে বিপন্নতা আর বিষণ্ণতার আখ্যান, বলে উঠবে, ‘মেয়েদের বুকে মাথা রেখেছ কোনওদিন? মেয়েদের শরীর আঁকতে শিখেছ?’ আয়নার ওপারের সারা শরীরজুড়ে তখন চিৎকার করতে চায় অনিমেষ! পৌরাণিক অভিশাপের মতো নিশ্চল কেউ তখন মন্ত্রের মতো বলে যায় ওকে, ‘শান্ত হ, শান্ত হ।’ মন্ত্রের ভেতর থেকেই যেন একটা তোলপাড় ফেনিয়ে ওঠে। খুব ইচ্ছে করে পালকবিহীন পাখিদের মুখ আঁকে, বদলে দেয় গোটা পৃথিবীর জ্যামিতি। ‘ইথানেশিয়া’, এই একটা শব্দ। তাকে ঘিরে যেন অনেকে এসে দাঁড়ায়। অনিমেষ ঠিক মাঝখানে, একেবারে একা! এই পালটে যাওয়া সময়টাতে নিজেই নিজের সাথে কথা বলে অনিমেষ।  কথা বলার যে আর কেউ নেই। অনিমেষ এখন নিজেই নিজের বন্ধু, নিজেই নিজের অভিভাবক, আবার কখনও নিজেই নিজের শত্রু! নিজেই একহাতে নিজের গায়ে চিমটি কাটে, অপর হাত দিয়ে শান্ত করে। ‘ডিসোসিয়েটিভ আইডেন্টিটি ডিসঅর্ডার’ রোগটার আগের নাম ছিল বোধহয় ‘মাল্টিপল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার’। আমার আমিটা আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়। এ রোগের যত বয়স বাড়ে তত মানুষ আরও বিবর্ণ, অস্পষ্ট ও অগভীর হয়ে যায়। শুধু তার মাথার মধ্যে সেঁদিয়ে থাকা লোকগুলো তখন বেরিয়ে আসে বেশি করে, চ্যাঁচামেচি করতে থাকে ব্যস্ত রাস্তায় যান্ত্রিক হর্ন দিতে থাকা গাড়িগুলোর মতো।

অনিমেষ পাশের টেবিলে রাখা বিষের শিশিটার দিকে হাত বাড়ায় ধীরে ধীরে। সেটার শরীরে তখন কচুরিপানার নীল। ঠিক যেমন একটা নীল প্রজাপতি বসেছিল সেদিন খুকিদির গালে, শরীরে যার অজস্র ক্ষত!



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *