(বিশ্বজুড়ে চলা যুদ্ধের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া শৈশব এবং আগামীর এক অপরাধবোধে ভরা নীরবতার দর্পণ।)
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কিম হাইসুন-এর একটা কবিতা আছে…‘…নিকষ কালো রাতে, রাতের পাখিও যখন ঘুমে কাদা/বাচ্চারা সব বেরিয়ে আসছে, সুটকেস টানতে টানতে।/সবাই ঘুমন্ত, শুধু বাচ্চারা বাদে।/পশ্চিমের জেটিঘাট থেকে চুপিচুপি একটা ফেরি ছাড়ল /সারা বছরের নামে, সেই একই বিদায়ী শিশুর দল,/এক ফেরি, একই মেঘ, এক আকাশ…’
প্রায়ই এক অদ্ভুত স্বপ্ন আমাদের সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে যায়। গভীর রাতে, যখন শহরের সব বাড়ি ঘুমে ডুবে থাকে, তখন সিঁড়ি বেয়ে, লিফট দিয়ে, দরজা খুলে বেরিয়ে আসে শিশুরা। তারা নিঃশব্দে ব্যাগ গুছিয়ে নেয়, সুটকেস টেনে টেনে এগিয়ে যায় রেলস্টেশন, ফেরিঘাট কিংবা বিমানবন্দরের দিকে। ঘুমন্ত পৃথিবীর ভেতর দিয়ে যেন একটি বিদায়ি মিছিল। পিচরাস্তায় চাকাওয়ালা ব্যাগের ঘরঘর শব্দ—আর তার সঙ্গে চলে যায় শৈশব। ভোর হলে শহর জেগে উঠবে, কিন্তু সেখানে থাকবে না একটিও শিশু। থাকবে শুধু বড়রা এবং তাদের নীরবতা।
দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কিম হাইসুন তাঁর কবিতায় এমনই এক দৃশ্য কল্পনা করেছিলেন। নিকষ কালো রাতে, যখন রাতের পাখিও ঘুমে কাদা, তখন বাচ্চারা সুটকেস টানতে টানতে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। পশ্চিমের জেটিঘাট থেকে চুপিচুপি একটি ফেরি ছাড়ে – সারা বছরের নামে। সেই ফেরিতে ওঠে বিদায়ি শিশুর দল। এক আকাশ, এক মেঘ, আর এক অদ্ভুত প্রস্থান। এই কবিতার দৃশ্য নিছক কল্পনা নয়; বরং আমাদের সময়ের নির্মম বাস্তবতার এক গভীর প্রতীক।
আজকের যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে শৈশব ক্রমশ বিপন্ন। গাজার ধ্বংসস্তূপ, সিরিয়ার ভাঙা শহর, আফগানিস্তানের পাহাড়ি উপত্যকা কিংবা কাশ্মীরের অস্থির ভূখণ্ড- সব জায়গাতেই শিশুরা ইতিহাসের ভার বইতে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন প্রথম ভেঙে পড়ে কেবল ঘরবাড়ি নয়; ভেঙে পড়ে শৈশবের নির্দোষিতা। খেলনা হয়ে ওঠে ধ্বংসাবশেষের ইট, আর স্কুলের মাঠ পরিণত হয় উদ্বাস্তু শিবিরে। ইরান–ইজরায়েলের যুদ্ধে ছোটদের কী পরিস্থিতি তা তো সবাই জানেন।
রাষ্ট্রের ভাষায় শিশুদের উপস্থিতি খুবই ক্ষীণ। যুদ্ধের পরিসংখ্যানে তারা কেবল সংখ্যা- কতজন নিহত, কতজন আহত, কতজন বাস্তুচ্যুত। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি অসমাপ্ত গল্প, একটি অর্ধেক লেখা খাতা, একটি অপূর্ণ আঁকা ছবি। তাই কবিতার কল্পনায় আমরা দেখি, রাতের অন্ধকারে শিশুরা শহর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে—যেন তারা পৃথিবী থেকে তাদের শৈশব উদ্ধার করতে চাইছে।
এই দৃশ্যের বিপরীতে আরেকটি কল্পনা দাঁড়ায়- যেখানে শিশুরাই সৈন্যদের তল্লাশি করছে। গ্রাফিতিশিল্পী ব্যাঙ্কসি-র রাজনৈতিক চিত্রভাষার মতোই এই কল্পনা ক্ষমতার সমীকরণ উলটে দেয়। সেখানে অস্ত্রধারীরা হাত তুলে দাঁড়ায়, আর শিশুরা বলে- অস্ত্র ফেলে তবেই শহরে ঢোকা যাবে।
এই দৃশ্য কেবল নৈতিক উলট-পালট নয়; এটি মানবতার এক গভীর দাবি। কারণ একটি সভ্যতার প্রকৃত পরিমাপ তার সামরিক শক্তি নয়, তার শিশুদের নিরাপত্তা। যে পৃথিবীতে বাচ্চারা রাতের অন্ধকারে সুটকেস টেনে পালায়, সেই পৃথিবী আসলে নিজের ভবিষ্যৎকেই নির্বাসনে পাঠায়।
আজকের প্রশ্ন তাই নির্মমভাবে স্পষ্ট : আমরা কি এমন এক পৃথিবী গড়ে তুলছি, যেখানে ভোরে শহর জেগে উঠবে শিশুদের হাসিতে? নাকি এমন এক ভোরের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে থাকবে শুধু বড়রা আর তাদের অপরাধবোধে ভরা এক শিশুহীন নীরবতা?
(লেখক ঔপন্যাসিক ও গল্পকার।)
