বিদ্বেষ বিষে আপন-পর ভেদ ভুলিয়ে ছারখার

বিদ্বেষ বিষে আপন-পর ভেদ ভুলিয়ে ছারখার

ব্লগ/BLOG
Spread the love


গৌতম সরকার

কী দুঃসহ ঘৃণা!

মেইতেই জনগোষ্ঠীর স্বামী ক’দিন কুকি স্ত্রীর সঙ্গে থাকতে গিয়েছিলেন। জাতিঘৃণার (Politics of Hate) কাছে হেরে গেল দাম্পত্যের সেই বন্ধন, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা। স্ত্রীর ঘর থেকে মেইতেই স্বামীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল কুকি জঙ্গিরা। মণিপুরে জাতিঘৃণার বলি হলেন তরুণটি। তাঁর রক্তাক্ত দেহ পাওয়া গেল কয়েক ঘণ্টা পর। গুলির ক্ষতে ঝাঁঝরা দেহটি। স্বামীর প্রাণভিক্ষায় কুকি তরুণীর আকুল আর্তনাদের মূল্য ছিল না হিংসার কারবারিদের কাছে।

বরং কুকির ওই মহিলাকে গাড়ি থেকে ঠেলে ফেলে দিতে দ্বিধা হয়নি একই জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র জঙ্গিদের। মণিপুরে (Manipur Violence) তিনদিন আগের এই ঘটনাটি মনে করাল, ঘৃণা আপন-পর চেনে না। মালদার হরিশ্চন্দ্রপুর নামটার সঙ্গেও যেন ঘৃণা জড়িয়ে। যেখানে এলাকায় থাকেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ মন্ত্রী তজমুল হোসেন ও জেলা পরিষদ সদস্য বুলবুল খান। দুজনই তৃণমূলের নেতা। দুজনই মুসলিম। কিন্তু তাঁদের শত্রুতা যেন জাতিঘৃণাকেও হার মানায়।

হিন্দু-মুসলিম বৈরিতার তথাকথিত তত্ত্ব তো উসকে তোলা হয়। বাস্তবে ঘৃণার চাষে হিন্দু-হিন্দু, মুসলিম-মুসলিমে ভেদ নেই। তজমুল-বুলবুলের দ্বন্দ্বেও হিন্দু-মুসলিম নেই। বরং মুসলিম-মুসলিম আছে। তবে তাঁদের পারস্পরিক সংঘাত ধর্মীয় কারণে নয়। ঘৃণা উসকানোর পিছনে আছে শুধু ধান্দা, ব্যক্তিস্বার্থ। মণিপুরে কুকি তরুণীর স্বপ্ন, মুছে দেওয়া হলেও কুকি জনগোষ্ঠীর কেউ প্রতিবাদ পর্যন্ত করলেন না। মেইতেইদের প্রতি এত ঘৃণা যে, মেইতেই তরুণ ঘরের জামাই হলেও রক্ষা নেই।

মেইতেইয়ের স্পর্শ থাকায় একই জনগোষ্ঠীর তরুণীটির প্রতিও এত ঘৃণা যে, তাঁকে গাড়ি থেকে ঠেলে ফেলে দিতে হাত কাঁপল না কুকি জঙ্গিদের। মণিপুরে রোজ ঘৃণার নিত্যনতুন রক্তে ভেজা ছবি আঁকা হচ্ছে বটে। বাদ যাচ্ছে না দেশের অন্য প্রান্তও। বুলডোজাররাজের উত্তরপ্রদেশ ব্যতিক্রম নয়। ভালোবেসেছিলেন বলে এক মুসলিম তরুণকে সঙ্গে ঘরের মেয়েকেও খুন করে মাটিতে পুঁতে দিয়েছে মোরাদাবাদের হিন্দু পরিবার।

‘অনার কিলিং’ বলে এধরনের কীর্তিকে মহান করার চেষ্টা হয়। কিন্তু কার ‘অনার’, কীসের ‘অনার!’ পরিবারের অনার-এর কথা ভাবা হল। প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ যুগল, যাঁদের একমাত্র অপরাধ পরস্পরকে ভালোবাসা, তাঁদের কি সম্মান নেই! তাঁদের সেই সম্মানকেও খুন করা হল। কী দুঃসহ ঘৃণা বলুন তো! এই ঘৃণার চাষে ‘লাভ জেহাদে’র তত্ত্ব হাতিয়ার হবে। কিন্তু প্রকৃত ‘লাভ’-কে মর্যাদা দিতে শেখায় না ঘৃণা।

হরিশ্চন্দ্রপুরে যেমন কোনও ইমাম বা মোয়াজ্জিন দুই মুসলিমের লড়াই বন্ধ করতে পরামর্শ দেন না। ঘৃণার আগুন উসকে দেওয়া যে ক্ষমতার কারবারিদের আরেক কৌশল। যেখানে যেমন ছক কাজে লাগে, তার ব্যবহার করে। কোথাও জাতপাত, কোথাও ধর্ম, কোথাও পারিবারিক সম্মান, কোথাও গোষ্ঠীবাজি। ওডিশার ঢেঙ্কানলে খ্রিস্টান ধর্মযাজক বলে যাঁকে বেধড়ক মারধর করা হল, তিনি ওডিয়া। বজরং দলের নাম নিয়ে যাঁরা হামলা করলেন, তাঁরাও ওডিয়া।

মণিপুরের কুকি তরুণী যেমন নিজের জনগোষ্ঠীর ঘৃণার আগুনে সর্বস্ব খুইয়েছেন, ঢেঙ্কানলের ওডিয়া ধর্মযাজকও নিজের সম্প্রদায়ের বিদ্বেষে আক্রান্ত হয়েছেন। একইভাবে ঘৃণায় রোজ পুড়ে মরছে বাঙালি। বাংলা ভাষা বলার জন্য ভিনরাজ্যে বাঙালি নিগ্রহ আজকাল জলভাত। অথচ বাংলায় সব রাজনৈতিক দলের অন্যতম অস্ত্র এখন বাঙালি আবেগ উসকে দেওয়া। কিন্তু ভিনরাজ্যে খুন হলে বিজেপি প্রচার করে, বাঙালি বলে নয়, অপরাধ করেছেন বলে খুন হয়েছেন।

বাঙালির পিছনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালে যে ঘৃণার আগুন জ্বালানো যায় না! ধর্মীয় বিভেদে ঘৃণার বলি হয়েছে নদিয়ার কালীগঞ্জে ১১ বছরের যে তামান্না খাতুন, সে বাংলাভাষী। তাকে খুনে অভিযুক্তরাও তাই। তাহলে কীসের তথাকথিত বাঙালি অস্মিতা! কী করে আর মাইকেল মধুসূদনের ভাষায় উচ্চারণ করি, ‘হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন।’ ঘৃণার পিছনে আসলে ব্যক্তি, দল, ক্ষমতা, বাণিজ্যিক, ধর্মীয়, জাতপাতের স্বার্থ! যে আগুন নিত্য জ্বালাচ্ছেন নেতারা।

গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের দুই নেতা নগেন রায় ও বংশীবদন বর্মনের রাজবংশী স্বার্থ নিয়ে কতই না মাথাব্যথা। প্রথম জন বিজেপির সুবিধাভোগী, দ্বিতীয় জন তৃণমূলের। প্রথম জন আবার দুই নৌকায় ভেসে থাকার কৌশল নিয়ে চলতে সিদ্ধহস্ত। দুজনই আবার যে দলের আশ্রয়ে আছেন, তাদের মাঝে মাঝে হুমকি দেন। প্রশ্ন করা কি অন্যায় যে, দলগুলিকে রাজবংশী স্বার্থবিরোধী মনে হলে তাদের লেজ ধরে আছেন কেন আপনারা?

মাঝখান থেকে এসব মন্তব্যে সমাজে একধরনের বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া চলে। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এতে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় যাতে সামাজিক অস্থিরতা বাসা বাঁধে চারপাশে। ঘৃণা ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল এতটাই প্রভাব ফেলে যে, তার সামনে দল, জাত, ধর্ম ইত্যাদির বাঁধন আলগা হয়ে যায়। মতুয়াদের নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে টেনে আনা হয়েছিল। সেই টোপের কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হতে মতুয়াদের মধ্যে মারামারি পর্যন্ত হয়ে গেল।

মুখে বদলা নয়, বদল চাই স্লোগান দিলেও বিরোধীশূন্য বাংলা গড়ার নামে সার্বিক হিংসা, ঘৃণার পরিবেশ রাজ্যজুড়ে তৈরি করে রেখেছে তৃণমূল। শুধু অন্য দলের ওপর আক্রমণ নয়, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে সম্প্রতি কোচবিহার, বালুরঘাট, পুরাতন মালদা, ডালখোলায় পুরপ্রধান অপসারণ নিয়ে বিদ্বেষের ছবি বেআব্রু হল। সুকান্ত মজুমদারের মতো নেতারা আবার বিজেপি জিতলে থানায় থানায় বুলডোজার মোতায়েন থাকবে হুমকি দিয়ে আরেক ত্রাসের ভাষ্য তৈরি করে রাখছেন আগাম।

মগজে ঘৃণা, হিংসা আর ত্রাসের চাষ করার ব্যস্ততা চারদিকে। ক্ষমতার কারবারিদের এই তৎপরতায় ঘৃণার বিষে নীল হয়ে যাচ্ছে সমাজ।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *